অফিসের দামী কাচের দেওয়ালের ওপারে তখন পড়ন্ত বিকেলের আদুরে রোদ। বিদেশের বিকেল—নির্মল, ঠান্ডা, হিসেবি। গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়েছে, রাস্তা ভরে গেছে কমলা রঙের কার্পেটে। সবকিছু সুন্দর, ছবির মতো।
তবু উজানের বুকের ভেতর আজ সারাদিন ধরে কেমন এক অকারণ হাওয়া বইছে। অফিসের উনিশ তলার জানলা দিয়ে নিচের শহরটা দেখছিল সে—ঝকঝকে রাস্তা, দ্রুতগামী গাড়ি, মানুষের ব্যস্ত মুখ। হঠাৎ মোবাইলে এক বন্ধুর পাঠানো ছবি খুলতেই সে থমকে গেল। গ্রামের নদীর ধারে কাশফুল ফুটেছে। সাদা, নরম, বাতাসে দুলছে। পেছনে নীল আকাশ, মেঘের ভেলা। ছবির নিচে লেখা—পুজো আসছে রে উজান। উজান অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হল, কাশফুলগুলো যেন দূরদেশের কাচ ভেদ করে তাকে ডাকছে—ফিরে আয়। তারপর আর কাজে মন বসল না।
উজান জার্মানিতে একটি বড় কোম্পানিতে মোটা বেতনের চাকরি করে। মিটিং, প্রেজেন্টেশন, ডলার, অ্যাপার্টমেন্ট, গাড়ি—সবই আছে। যে স্বপ্ন একদিন গ্রামের মাটির উঠোনে দাঁড়িয়ে দেখেছিল, তার অনেকটাই পূরণ হয়েছে। কিন্তু পুজোর আগের এই ক’টা দিন এলেই বুকের ভেতর অদ্ভুত ফাঁকা লাগে। যেন জীবনের সব সাফল্য একদিকে, আর গ্রামের মাটির গন্ধ আরেকদিকে।
রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে উজান ব্যালকনিতে দাঁড়াল। দূরে শহরের আলো ঝলমল করছে। কোথাও ঢাক বাজছে না। কেউ বলছে না—মণ্ডপে চল।কে উ নতুন জামা পরে দরজায় এসে দাঁড়াচ্ছে না। কোথাও ধূপের গন্ধ নেই। শিউলি নেই। কাশফুল নেই। শুধু মনে পড়ে যায় তার গ্রাম, সবুজডাঙা— মাথাভাঙা নদীর ধারে ছোট্ট সেই জনপদ, পালপাড়া, কুমোরদের ব্যস্ত হাত, দাদুর হাঁক, আদিলের হাসি, আর সেই ফ্রক পরা মেয়েটি। যার নাম ছিল মেঘলা। উজান তখন ক্লাস সিক্সে পড়ে। গ্রামের স্কুলে সে সবার আগে। মাস্টারমশাই বলতেন, “এই ছেলেটা দূর যাবে।” দাদু বলতেন, “দূর যাস, কিন্তু শেকড় ভুলিস না।” দাদুর কথাটা তখন উজান বুঝত না। শেকড় আবার মানুষ ভুলে কী করে? বাড়ি তো থাকবে, প্রিয় গ্রাম সবুজডাঙা তো থাকবে, মাথাভাঙা নদী তো থাকবে। কিন্তু বয়স বাড়লে মানুষ বুঝতে শেখে—ভুলে যাওয়া মানে সবসময় মুছে যাওয়া নয়। অনেক সময় খুব কাছে থাকা জিনিসও ধীরে ধীরে দূরে চলে যায়।
পুজোর আগে তাদের গ্রামে কী আনন্দই না হত! মাথাভাঙার ধারে কাশফুল ফুটলেই সবাই বুঝত—মা আসছেন। সকালের বাতাসে শিউলির গন্ধ। পালপাড়ায় তখন ঘুম নেই। কুমোর কাকার আঙুলে মাটি প্রাণ পেত। বাঁশ, খড়, মাটি দিয়ে ধীরে ধীরে দেবীর শরীর গড়ে উঠত। উজান, আদিল আর আরও কয়েকজন বন্ধু রোজ স্কুল শেষে পালপাড়ায় যেত। মাটির গন্ধ, ভিজে খড়, রঙের ডালা—সব মিলিয়ে যেন আলাদা এক জগৎ।
আদিল ছিল উজানের প্রাণের বন্ধু। ধর্মের নাম তারা জানত, কিন্তু দূরত্ব জানত না। ঈদের সেমাই উজান খেত আদিলদের বাড়িতে, পুজোর খিচুড়ি আদিল খেত উজানদের সঙ্গে বসে। দাদু বলতেন, “মানুষ আগে, বাকিটা পরে।”
আদিল হাসত খুব। নদীতে সাঁতার কাটত অসাধারণ। উজান ভয় পেত। আদিল বলত, “তুই এত পড়াশোনা করিস, কিন্তু জলের অক্ষর পড়তে শিখলি না।” উজান রাগ দেখাত, কিন্তু মনে মনে ভাবত—আদিলের মতো সাহসী সে কোনওদিন হতে পারবে না।
মেঘলাকে প্রথম ভালো লাগে এক অষ্টমীর সকালে। সে লাল ফ্রক পরে মণ্ডপে এসেছিল। হাতে শিউলি ফুল। কপালে ছোট্ট টিপ। হাসলে গালে টোল পড়ত। উজান তখন তাকিয়ে ছিল, কিন্তু চোখাচোখি হতেই মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আদিল পাশে দাঁড়িয়ে খিকখিক করে হেসেছিল।
“কী রে? বইয়ের বাইরে কিছু পড়ছিস নাকি?”
উজান কনুই মেরে বলেছিল, “চুপ কর।”
আদিল আর চুপ করেনি। বহুদিন তাকে খেপিয়েছে। “মেঘ দেখে মন কেমন করছে?” “ফ্রক দেখলে অঙ্ক ভুলে যাচ্ছিস?” উজান রাগ করত, কিন্তু সেই রাগের আড়ালে লজ্জা ছিল, ভালোও লাগত।
কিন্তু ভালো লাগার কথা বলা হয়নি। তখন মোবাইল ছিল না, সাহসও ছিল না। পুজোর ভিড়ে মেঘলাকে দূর থেকে দেখাই ছিল উৎসবের আরেক রকম আলো। বিসর্জনের দিন সে কেঁদেছিল কি না, উজান জানে না। সে নিজেই চোখ লুকিয়ে রেখেছিল।
তারপর জীবন দ্রুত বদলে গেল। উজান উচ্চ মাধ্যমিকে খুব ভালো ফল করল। কলকাতায় পড়তে গেল। দাদু দরজায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “বিদ্যে শিখবি, মানুষ হবি। শুধু মনে রাখিস, নদীর জল শুকিয়ে গেলে মাছ বাঁচে না। মানুষেরও তেমন মাটি লাগে।”
কলকাতার ভিড়ে উজান প্রথমে হারিয়ে গিয়েছিল। বড় রাস্তা, বাস, ট্রাম, কলেজ, লাইব্রেরি—সব নতুন। গ্রাম থেকে চিঠি আসত। দাদুর কাঁপা হাতের লেখা—“পুজোয় আসবি তো?” উজান আসত। প্রথম দু’বছর নিয়ম করে আসত। তারপর পরীক্ষা, কাজ, গবেষণা, বিদেশ যাওয়ার সুযোগ—সব মিলিয়ে পুজো আসা কমে গেল।
শেষবার পুজোয় গ্রামে গিয়েছিল সে প্রায় বারো বছর আগে। সেই বছরই আদিল মারা যায়। বর্ষার শেষে মাথাভাঙা তখন ফুলে আছে। গ্রামের এক ছোট ছেলে জলে নেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। বাঁচাতে নেমেছিল আদিল। ছেলেটি বেঁচে যায়, আদিল ডুবে যায়। খবরটা উজান পেয়েছিল কলকাতায়। ছুটে এসেছিল। মাথাভাঙার ঘাটে দাঁড়িয়ে সে দেখেছিল—যে জলের অক্ষর আদিল পড়তে জানত, সেই জলই তাকে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। সেদিন প্রথম উজান বুঝেছিল, কিছু মৃত্যু মানুষের জীবনে স্থায়ী নীরবতা বসিয়ে দেয়।
আদিলের মা উজানের হাত ধরে শুধু বলেছিলেন, “তুই এলি বাবা?”
উজান কোনও উত্তর দিতে পারেনি।
মেঘলাকে সেদিনও দেখেছিল সে। সাদা শাড়ি নয়, সাধারণ নীল সালোয়ার। দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখে জল। অনেকদিন পরে চোখাচোখি হয়েছিল। কেউ কিছু বলেনি। বলার মতো ভাষা ছিল না। তারপর শুনেছিল মেঘলার বিয়ে হয়ে গেছে অন্য জেলায়। নিশ্চয় সুখে আছে। উজান নিজেকে তাই বলত। মানুষের জীবনে কত নদী বয়ে যায়, সব নদীর খবর কি রাখা যায়?
তবুও পুজো এলেই মেঘলার কথা মনে পড়ে। যে ভালো লাগা বলা হয়নি, সে কি মরে যায়? নাকি কাশফুলের মতো প্রতি শরতে ফিরে আসে? বিদেশে বসে উজান এসব ভাবছিল। টেবিলে ল্যাপটপ খোলা। ইনবক্সে মিটিংয়ের মেইল। কিন্তু তার চোখে ভাসছে পালপাড়ার কাদামাটি। দেবীর চোখ আঁকার আগে কুমোর কাকা কী মন দিয়ে তুলির ডগা ঠিক করতেন। দাদু বলতেন, “চোখ দান মানে প্রাণ দান।” উজান তখন ভাবত, মূর্তির চোখে সত্যিই কি প্রাণ আসে? এখন বুঝতে পারে—প্রাণ আসে মানুষের বিশ্বাসে।
সেই রাতে উজান ঘুমোতে পারল না। অনেকদিন পর পুরোনো ট্রাঙ্ক খুলল। কিছু চিঠি, পুরোনো ছবি, স্কুলের সার্টিফিকেট। এক কোণে দাদুর লেখা শেষ চিঠি। দাদু তখন খুব অসুস্থ। লিখেছিলেন— “তুই বড় হবি, তা জানতাম। কিন্তু বড় হওয়া মানে যেন একা হয়ে যাওয়া না হয়। পুজোর ঢাক যখন বাজে, মনে করিস তোর দাদু উঠোনে বসে আছে।” চিঠিটা পড়তে পড়তে উজানের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
পরদিন অফিসে গিয়ে সে ছুটি চাইল। বস অবাক। “হঠাৎ?”
উজান শুধু বলল, “আমি বাড়ি যেতে চাই।”
বাড়ি। শব্দটা বলতে গিয়ে তার গলা কেঁপে উঠেছিল।
দুই দিন পরে সে বিমানে উঠল। দীর্ঘ যাত্রা শেষে কলকাতা। বিমানবন্দরের বাইরে নামতেই গরম, ভিড়, হর্ন, ধোঁয়া—সব একসঙ্গে তাকে ঘিরে ধরল। অদ্ভুতভাবে ভালো লাগল। তারপর গাড়ি ধরে গ্রামের পথে। শহর পেরিয়ে রাস্তা সরু হল। ধানক্ষেত দেখা গেল। পুকুর, তালগাছ, টিনের বাড়ি। দূরে আকাশে সাদা মেঘ। উজান জানলার কাচ নামিয়ে দিল। বাতাসে মাটির গন্ধ। কোথাও যেন ঢাকের ক্ষীণ আওয়াজ। গ্রামে ঢুকতেই সে দেখল, অনেক কিছু বদলে গেছে। কাঁচা রাস্তা পাকা হয়েছে। মোবাইল টাওয়ার উঠেছে। কিছু পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন দোতলা। কিন্তু মাথাভাঙা আছে। আকাশ আছে। কাশফুল আছে। আছে পালপাড়া। আর আছে দুর্গামন্দির।
উজান গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে লাগল। পালপাড়ায় এখন কুমোর কাকার ছেলে মূর্তি গড়ছে। তাকে দেখে প্রথমে চিনতে পারেনি। তারপর বলল, “আপনি উজানদা? বাইরে থাকেন?”
উজান মৃদু হাসল। “হ্যাঁ। আর তুমি ছোট্ট পল্টু?”
পল্টু হেসে বলল, “এখন আমার ছেলেও মাটি মাখে।”
সময় সত্যিই কারও জন্য অপেক্ষা করে না।
মণ্ডপে গিয়ে উজান থমকে দাঁড়াল। দেবীর মুখে রং লাগছে। ধূপের গন্ধ। বাঁশের কাঠামো। কিশোরেরা আলো লাগাচ্ছে। তাদের দেখে উজানের নিজের ছোটবেলা মনে পড়ল। কোথাও যেন আদিল দৌড়ে এসে বলবে, “এই উজান, চল নদীতে।”
কিন্তু কেউ এল না।
সন্ধেবেলা উজান নদীর ঘাটে গেল। কাশফুল বাতাসে দুলছে। নদীর জল শান্ত। ঘাটের সিঁড়িতে বসে সে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। মনে হল, আদিল পাশে বসে আছে। ভিজে চুল, হাসি মুখ।
“তুই ফিরেছিস অবশেষে?”
উজান খুব আস্তে বলল, “দেরি হয়ে গেল রে।”
বাতাস কাশফুল নড়িয়ে দিল। যেন কেউ উত্তর দিল—“তবু এলি তো।”
সেদিন রাতে দুর্গামন্দিরে ঢাকের শব্দে চারিদিক ভরে উঠল। উজানের বুকের ভেতর জমে থাকা বরফ যেন একটু একটু করে গলতে লাগল। গ্রামের লোকেরা তাকে ঘিরে ধরল—“কী রে, চিনতে পারছিস?” “বিদেশে কী খাস?” “বিয়ে করলি না এখনও?” সে হাসল, উত্তর দিল, আবার চুপ করল।
ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ এক কিশোরীকে দেখে তার বুক ধক করে উঠল। লাল ফ্রক নয়, লাল কুর্তি। মুখে মেঘলার ছায়া। পাশে এক মধ্যবয়স্কা মহিলা। উজান তাকিয়ে রইল। মহিলা চোখ তুলে তাকাতেই সে বুঝল—মেঘলা। সময়ের রেখা মুখে এসেছে, কিন্তু চোখ একই। শান্ত, গভীর।
মেঘলা এগিয়ে এল। “উজান ?”
“হ্যাঁ,” সে বলল, “তুই?”
মেঘলা হাসল। “আমি তো এখানেই এসেছি বাপের বাড়ি। পুজোয় আসি মাঝে মাঝে।”
দু’জনের মধ্যে অনেক বছরের নীরবতা দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মেঘলা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, “এ আমার মেয়ে, ঋতিকা।”
উজান মৃদু হাসল। “তোমার মতোই।”
মেঘলা একটু চুপ করে বলল, “তুই একদম বদলাসনি।”
উজান জানত, এটা সত্যি নয়। সে বদলেছে। অনেকটাই। শুধু ভেতরের কোথাও এক কিশোর এখনও মণ্ডপের কোণে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে প্রসাদ, চোখে লজ্জা।
মেঘলা বলল, “আদিলের কথা মনে পড়ে?”
উজান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “প্রতিটা পুজোয়।”
মেঘলা বলল, “ও থাকলে আজ তোকে খুব খেপাত।”
দু’জনেই হেসে উঠল। হাসির শব্দ বাতাসে মিশে গেল। সেই রাতে তারা অনেক কথা বলল। মেঘলার সংসার। স্বামী স্কুলশিক্ষক। মেয়ে কলেজে পড়ে। জীবন তার নিজের পথে গেছে। উজান শুনল। কোনও আফসোস নেই, তবু এক ধরনের কোমল ব্যথা আছে। না-বলা কথা কখনও কখনও ফুলের মতো থাকে—তোলা হয় না, শুকিয়েও যায় না, শুধু স্মৃতির ভেতর গন্ধ রেখে যায়।
মেঘলা বলল, “তুই সুখে আছিস?”
প্রশ্নটা সহজ। উত্তরটা কঠিন। উজান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “বিদেশে অনেক সুবিধে আছে। সুখ আছে কি না জানি না।”
মেঘলা বলল, “সুখ অনেক সময় জায়গায় থাকে না, মানুষের মনে থাকে।”
উজান নদীর দিকে তাকাল। “কিন্তু মনেরও তো একটা মাটি লাগে।”
মেঘলা আর কিছু বলল না।