পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কালো হাতের ছায়া

  • 11 October, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 329 view(s)
  • লিখেছেন : বাসবদত্তা কদম
চন্দ্রতালে তখন নীল আকাশের ছায়া, পাশে খাড়া দাঁড়িয়ে ধূ ধূ রুক্ষ পাহাড়। চন্দ্রতালের রঙ কখনো সবুজ, কখনো নীল। আমি বলি, সে এক অপূর্ব দৃশ্য। সুহৃদ ছোট্ট করে বলে হু।

বলি, তারপর তোমরা কোথায় গেলে? তৃষা…? কোনো উত্তর নেই। আবার চুপ।

এ ছেলে চুপ করে গেলে তাকে কথা বলানো যাবে না। মনে মনে প্রমাদ গণি। এর আগে তিনটে সিটিং ওকে কথা বলানোর অনেক চেষ্টা করেছি; আজ সে নিজে থেকেই কিছু কথা বলেছে। ওর কথারাই একমাত্র, আমাকে নিয়ে যেতে পারে ওর সমস্যার কাছে।

বলি, তারপর? উত্তর আসে না।

ওর বাবা মায়ের সঙ্গে বেশ কয়েকটা মিটিং হয়েছে আমার। ওদের কাছেই শুনেছি ইদানীং ওর অন্য ধরণের ছবি আঁকার কথা। দেখতে চেয়েছিলাম। বেশ কয়েকটা ওর আঁকা ছবি এনে দিয়েছেন ওনারা। দেখেছি। আশ্চর্যজনক ভাবে ওর আঁকা প্রত্যেকটা ছবিতে প্রকৃতি আছে কিন্তু কোথাও নির্বিষ নিশ্চিন্ত পৃথিবী বা প্রকৃতি কেউ নেই। প্রত্যেকটা ছবিতে প্রকৃতির উপর কোনো না কোনোভাবে নেমে এসেছে দানবীয় হাতের কালো ছায়া।  

ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে নিজেদের ব্যবসার হাল ধরে নেবে এটাই চেয়েছিলেন সোহাগরঞ্জন বসু আর তাঁর স্ত্রী প্রিয়ম্বদা বসু। দুবছর পড়ার পর সে ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছেড়ে আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার বায়না যখন সে শুরু করল, তাঁরা দুজনেই খুব বিরক্ত হয়েছিলেন। বিরক্তিটাই হয়ত স্বাভাবিক কিন্তু তাও মেনে নিয়েছিলেন কারণ একমাত্র সন্তানের ইচ্ছাকে জোর করে বলি দিতে ওঁদের ইচ্ছা হয়নি। চেয়েছিলেন ছেলে খুশি হোক, পরে বয়স বাড়লে ঠিকই ব্যবসায় মতিগতি হবে।  

এখন ওর সামনে যে ছবিটা আমি পেতে রেখেছি সেটা আমার চেনা চন্দ্রতালের একথা বলতে পারব না তবে সে ছবিতে চন্দ্রতালকে চিনতে আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। চন্দ্রতাল থেকে বেরিয়ে এসেছে যে নদী সেও আছে কিন্তু কোথাও একটা অন্য কিছুও আছে। আমি ছবি বিশেষজ্ঞ নই, তাই অনেক ভেবে ওর আঁকা ছবি টেবিলের উপর মেলে পেপারওয়েট দিয়ে চাপা দিয়ে ওর দিকেই ফিরিয়ে দিয়েছি, যদি কিছু বলে সুহৃদ সেই আশায়।

-প্রকৃতির সম্পদকে যারা দূষিত করতে চায় তারা ওর কাছে দেশদ্রোহী; তাদের ধ্বংস করতে তৃষা সবসময় থাকত খড়গহস্ত ।

হঠাৎ শুনতে পাই সুহৃদ কিছু বলে চলেছে আর ওর সামনে রাখা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে একদৃষ্টে। খুঁটিয়ে দেখছে, যেন এ ছবি আজই সে প্রথম দেখছে।

নীল, ঠিক এমনি নীল ছিল সেদিন চন্দ্রতাল…।

ওর কথার অপেক্ষা করতে করতে কখন যেন খানিক অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলাম। বলি, এ ছবি তো তোমারই আঁকা সুহৃদ। সুহৃদ মনে হল শুনতে পায়নি আমার সে কথা, সে তখন বলে চলেছে …।  

-চন্দ্রতালের পাশে দাঁড়িয়ে আমার হাতটা ওর হাতের মধ্যে নিয়ে সেদিন চুপ করে দাঁড়িয়েছিল তৃষা অনেকক্ষণ। বলল, দেখ সুহৃদ কী অপরূপ এই চন্দ্রতাল, এর থেকে বেরিয়েছে চন্দ্র নদী, তার সঙ্গে মিশেছে সূর্যতাল থেকে এসে ভাগা নদী। তৈরী হয়েছে চন্দ্রভাগা। বয়ে চলেছে হিমাচল থেকে জম্মু কাশ্মীর।

তৃষা মরে যায়নি। বিশ্বাস করুন ও মরে যেতেই পারে না…।

আমার দিকে একবারও না তাকিয়ে সুহৃদ বলে চলে, তৃষা নিশ্চয়ই ওদের ভয়ে কোথাও লুকিয়ে বসে আছে। নিঃশব্দে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন পর ঠিক বেরিয়ে আসবে। বলি, ওরা কারা? কাদের ভয় পাচ্ছে তৃষা?

আবার চুপ সে ছেলে।

শুনেছি আমার কাছে ওকে নিয়ে আসার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই কথা বলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে সে। সারাদিন ধরে হয় ঘুমায়, নাহলে ছবি আঁকে।

সুহৃদের আঁকা প্রায় সব ছবিতেই একটা নদী আছে। কোথাও পাহাড় আর নদী পাশাপাশি। থিম হিসেবে খুব কমন কিন্তু ওর আঁকা ছবিগুলো অতটাও কমন নয়। চোখে ধাক্কা দেয় সঙ্গে মস্তিস্কেও। নদী চওড়া বা সরু যাই হোক আশেপাশের পরিবেশ, শহর থেকে গ্রাম বা মফস্বল বিভিন্ন ভাবে বদলে যায় কিন্তু নদীটা থাকে আর সবকটা ছবিতেই ছড়িয়ে থাকে দূষণ। মরা জানোয়ার থেকে মানুষ, প্লাস্টিক থেকে মরা মাছ, কোথাও কোথাও কেমিকালে কালো হয়ে যাওয়া জল আর তাতেই স্নান করছে মানুষ কিংবা পশু।  ছবিগুলো এত বেশি জীবন্ত যে দেখতে দেখতে আমার নিজেরই কিরকম অস্বস্তি হয়।

ওর বাবা মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন এমন ছবি আঁকে আপনারা জানেন কিছু? উত্তর পাইনি কিছু কিন্তু ওর বাবার মুখটা হঠাৎ করে কালো হয়ে গিয়েছিল।

#

তৃষা মেয়েটি একজন পরিবেশবিদ; সে এবং তার কয়েকজন সঙ্গী পরিবেশ প্রকৃতির দূষণরোধে কাজ করছিল গত কয়েক বছর ধরে। শুধু আমাদের রাজ্য নয়, দেশের বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে সংগঠিত কাজ বলা যায়। টেক্সটাইল আর চামড়ার কারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা নিয়ে সে বেশ বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বেশ কয়েকটা রাজ্যে। প্রত্যন্ত এলাকায় আদিবাসীদের মধ্যে থেকে তাদের সচেতন করে নিজের কাজ চালিয়ে গেছে। এরকমই একদিন অবস্থান প্রতিরোধ চলছিল যেখানে, সেই জায়গার আশপাশ থেকেই সে নিখোঁজ হয়ে যায়, আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি।

অন্য অনেকের মত আমিও এই সমস্ত কথা জেনেছি সমাজ মাধ্যম থেকে। তার আগে এ বিষয়ে কিছুই জানতাম না। প্রবীণ পরিবেশবিদদের অনুমান ওকে মেরে ফেলা হয়েছে যদিও তার প্রমাণ কিছুই পাওয়া যায়নি। খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেল এ ব্যাপারে খুব একটা সোচ্চার হয়নি তবে সামাজিক মাধ্যমে মেয়েটির বন্ধুরা এবং অন্য পরিবেশবিদরা এই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করে চলেছেন। এসব গত কয়েকমাস ধরে চলছে।

#

সুহৃদের বাবা মায়ের কাছেই শুনেছি বেশ কয়েক জায়গায় ঘুরে, আমার এক সিনিয়রের রেফারেন্সেই ছেলেকে আমার কাছে ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। এখনো পর্যন্ত কিছুই করতে পারিনি। পারিনি ওর মা বাবাকে কোনো আশার বাণী শোনাতেও।

সমাজমাধ্যমের শিরোনামে থাকা হারিয়ে যাওয়া পরিবেশবিদ তৃষাই তাঁদের ছেলের বন্ধু, তাকেই তাঁদের ছেলে খুঁজে বেড়াচ্ছে একথা সুহৃদের মা’ই আমাকে বলেছিলেন একটি মিটিং এ এসে।

হঠাৎ এভাবে নিঁখোজ হয়ে যাবার পর সুহৃদ আর তার বন্ধুরা নাকি মেয়েটিকে খুঁজেছে পাগলের মত, কিন্তু সে মেয়ে কর্পূরের মত উবে গিয়েছে।

সুহৃদের বাবা মা একদিন বললেন, ওনাদের ধারণা ও মেয়ে নির্ঘাত কোনো সুযোগ্য এন আর আই পাত্রের গলায় মালা দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে আর তাদের ছেলে পাগলের মত সেই মেয়েকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। যে ইচ্ছাকৃত হারিয়ে যেতে চায় তাকে কেউ খুঁজে পায় না। তাঁদের ছেলে এতটাই বোকা যে সে এই সহজ সত্যিটুকু মেনে নিতে পারছে না।

নিজের সন্তানের সমবয়সী একটি মেয়ের হারিয়ে যাওয়ায় ওনাদের প্রতিক্রিয়া দেখে একটু অবাক হই বৈকি।    

বললাম, মেয়েটির সম্বন্ধে আপনার এ ধারণার কারণ?

বললেন, অত্যন্ত ধড়িবাজ মেয়ে। দেখলে বুঝতেন। এরা পরিবেশকর্মী সেজে ঘুরে বেড়ায় বড়লোকের ছেলেদের ফাঁসাবে বলে। এবার মন্তব্য করলেন শ্রীমতি বসু।

জিজ্ঞেস করলাম, মেয়েটির পরিবারে কে কে আছেন?

-সেসব আমরা কীকরে জানব? দেখতেই তো পাচ্ছেন ছেলেকে নিয়ে আমাদের অবস্থা।

বললাম, হুম, তা ঠিক।    

হাতজোড় করে বললেন, আপনি যেভাবেই হোক ওকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে দিন আমাদের কাছে।

-চেষ্টা করব। এটুকু বলা ছাড়া আর কিছু বলারও ছিল না আমার।

-জানেন ওই মেয়ে হারিয়ে যাওয়ার পর থেকেই সুহৃদের আঁকা এরকম হয়ে গেল। এর আগে সে অন্য শিল্পীদের মত স্বাভাবিক ছবিই আঁকত।

বলি, তাই নাকি?

-হ্যাঁ। ওর দুটো প্রদর্শনীও হয়েছে এবং তাতে শহরের শিল্পী মহলের বেশ কয়েকজন এসেছিলেন ওর বাবার আমন্ত্রণে। তাঁরা সকলেই ওর অঙ্কনশৈলীর খুব প্রশংসা করে গেছেন।

সেদিন ওঁরা ফিরে যাওয়ার পর সুহৃদের এখনকার আঁকা ছবিগুলো আবার দেখি। মনে হয় সুহৃদ খুব স্পষ্ট করেই বলতে চাইছে তার বক্তব্য কিন্তু আমরা তা বুঝতে পারছি না।

এরপর মাঝেমাঝেই চলতে থাকে রোগীর সঙ্গে আমার কথোপকথন যাকে কাউন্সিলিং বলে সেই আর কী-  

-তৃষার সঙ্গে তোমার বন্ধুত্ব কি স্কুল থেকে?

-না। না। আমরা একটা ট্রেকে গিয়েছিলাম। গঙ্গোত্রী, গোমুখ ওরাও ওই রুটেই গিয়েছিল।

আমি কথার পিছনে কথা লাগাতে থাকি শিকলের মতো। জানি না সুহৃদ আমার কথার শিকলে ধরা পড়বে কি না কিন্তু আমার চেষ্টা সেটাই। পুরোটা হয়ত হয় না কিন্তু খানিকটা পুরনো সুহৃদকে যদি ফিরিয়ে দিতে পারি ওর বাবা মায়ের কাছে তাহলেই যেন নিজেকে খানিকটা ভরসা করতে পারব আমি।   

-বাঃ! তুমি ট্রেকিং এ যেতে। সে তো শুনেছি দারুণ এক্সাইটিং। আমার সামনে বসা ছেলেটা একটু হাসে। আবার কথা খুঁজতে হয় আমাকে।

বলি, তুমি আগেরদিন বলেছিলে তৃষা নদী দূষণের ওপর কাজ করে, আজ আবার বলছ ট্রেকিং!

উত্তেজনায় ওর ঠোঁটদুটো কাঁপতে থাকে। ঘরের টেবিল ল্যাম্পের স্নিগ্ধ আলোতেও বুঝতে পারি ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে যাচ্ছে। এবার থামি। বুঝতে পারি, ওকে কথা বলতে দিতে হবে এবার।

ঠান্ডা কাটা কাটা গলায় উত্তর আসে, কেন? দূষণ নিয়ে যারা কাজ করে তাদের ট্রেকিং এ যাওয়া মানা বুঝি? এটা কোন আইনের বইয়ে লেখা আছে? দূষণের বিরুদ্ধেই যাদের প্রতিবাদ দূষণহীন প্রকৃতিকে দেখায় তাদের অধিকার কারোর চাইতে কম তো হওয়ার কথা নয়।

টেবিলের উপর রাখা ওর হাতের আঙুলগুলো তখন উত্তেজনায় কাঁপছে থরথর করে। বুঝতে পারি, তৃষা অনেকদিন ধরে নিঁখোঁজ হয়ে গেলেও, তৃষার জন্য ওর ভালোবাসা কিংবা বিশ্বাস কোথাও এতটুকু চিড় ধরেনি বরং সে বোধহয় আরো বেশি করে বেড়েই চলেছে। তৃষার জীবনের খোঁজ নিতে পৃথিবীকে এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলতে এতটুকুও পিছপা নয় সে।

নদী দূষণের বিরুদ্ধে ওদের কাজ কী, কেমন করে বিভিন্ন জায়গায় মাফিয়াদের মুখোমুখি হতে হয়েছে ওদের, এইসব ব্যাপারগুলো সুহৃদের কাছ থেকে গত বেশ কয়েকটা সিটিং এ শুনতে শুনতে অনেকবার মনে মনে শিউরে উঠেছি আমি।

একদিন কথার মাঝখানেই হঠাৎ বলল, ও সেদিন উধাও হয়ে যাবার পর পুরো চব্বিশ ঘন্টা ওর ফোনে রিং যাচ্ছিল কিন্তু কেউ ওঠাচ্ছিল না। তারপর ফোনটা হঠাৎ সুইচড অফ হয়ে গেল।

বলি, পুলিশকে জানিয়েছিলে তোমরা?

বলে, হ্যাঁ। তারা তো প্রথমে কেসই নিতে চাইছিল না। পরে আমাদের চাপে নিতে বাধ্য হয়।

বলি, আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি?

মাথাটা নাড়ে।

#

বুঝতে পারছি এই কেসটা আমাকেও প্রকৃতি দূষণের বিরুদ্ধে খানিক সচেতন করে দিচ্ছে। অবসরে বসে অনেকসময় এই ধরণের ভিডিও আর রিল দেখছি। মনে মনে ভাবতে থাকি পরেরবার সুহৃদের সঙ্গে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে।  

এভাবেই একদিন ভিডিও ঘাঁটতে ঘাঁটতে সামনে এল ইকুয়েডরের আমাজন অঞ্চলের ইয়াশুনি ন্যাশনাল পার্কের কথা। সেখানকার সরকার এই অঞ্চল থেকে ভূগর্ভস্থ তেল তোলার সিদ্ধান্ত নেয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে; কিন্তু তা ছিল ওই অঞ্চলের জঙ্গল আর প্রাণীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ওই অঞ্চলের বিভিন্ন জনজাতি এবং পরিবেশবিদরা জঙ্গল এবং প্রাণীদের বাঁচাতে এক শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলেন সরকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। তাদের আন্দোলনে সম্ভমত পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবার গনভোটের রায়ে এই অঞ্চলে সরকারকে তেল উত্তোলন বন্ধ করতে হয়।

এভাবেই সামনে এল কোব্রে পানামা আন্দোলনের কথা।

এসব নাহয় ভৌগলিক সীমানায় অনেক দূরের দেশ, নিজেদের দেশ বা প্রতিবেশী বাংলাদেশ সর্বত্র দেখি একই ব্যাপার। সব জায়গাতেই প্রকৃতিকে ধ্বংস করে একদল মানুষের মত চেহারার মাফিয়া পকেট ভরতে চাইছে আর অন্য একদল তাদের সেই অসৎ উদ্দেশ্যগুলোকে ধরে ফেলে একের পর এক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ, অতি সাধারণ মানুষ প্রকৃতিকে নিজের মায়ের মত ভালোবেসে, রক্ষা করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ‘বুড়িগঙ্গা বাঁচাও’ কী ‘ছত্তিশগড়ের হাসদেও অরণ্য বাঁচাও’ অথবা পশ্চিমবাংলার বীরভূমের ‘দেওচা পচামি’ সবই।

গত বেশ কিছুদিন ধরে এসব জানার আগ্রহে নিজের অজান্তেই সংসারে খানিক অবহেলা হয়ত হয়েছে আর স্বাভাবিক ভাবেই তার পুরস্কারও পেয়েছি আমার অতি উচ্চশিক্ষিত সঙ্গীর কাছ থেকে।

-কী ব্যাপার, টোস্ট পুড়ে যাচ্ছে। কফির বদলে গরমজল খাচ্ছি মনে হচ্ছে। হয়েছে কী তোমার আজকাল? দিনরাত কী দেখে চলেছ, পড়ছ? পরিবেশকর্মী হচ্ছ নাকি নিজের পেশা ছেড়ে?

ভাবলাম বলি, যদি হই চলবে কী? বললাম না। চিমটি দিলে খামচি খেতে হবে সে আমি জানি। একটু হাসলাম।

তিনি যদিও থামলেন না। ল্যাপটপ থেকে মুখ ঘুরিয়ে বোঝালেন, কেন পাহাড় কেটে খনিজ তোলা ভালো, কেন অরণ্য ধ্বংস করে সেনাপোত বানানো দরকার, কখনো কখনো হয় এবং তা করতে হয়।

ভাবলাম বলি, প্রকৃতিকে ধ্বংস করার আগে আমরা কজন ভাবি? অবাধে ধ্বংস করে সভ্যতার কথা বলি আর সমুদ্রের নীচে একটা প্লেটের বদলে হাজার সভ্যতা মুহূর্তে ধ্বংস হতে পারে তা ভাবি কী? অযথা প্রশ্ন, অকারণ অশান্তি আনবে। নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় আমরা অনেকেই মনে মনে মাফিয়া হয়ে উঠেছি এটা সুহৃদের কেস আমাকে বেশ ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে।     

তাও একদিন বললাম, তুমি জান কি আপাতভাবে যে সমস্ত কারখানাগুলোকে ভীষণ নির্দোষ মনে হয় তারাই অবলীলায় ভয়ংকর বিষাক্ত বর্জ্য নদীতে ফেলে কারণ ওটাই সব থেকে সহজ রাস্তা আর বাধা পেলে, হয় টাকা নাহলে হুমকি ধমকি কিংবা গুন্ডা পাঠিয়ে শাসন কোনো কিছুতেই এই নদী মাফিয়ারা থামে না কাজ হাসিল না হওয়া পর্যন্ত। নদীর জল বিষাক্ত থেকে বিষাক্ত হয়। ফেনায় ভরে যায়। মাছ মরা আর পাখি মরা তো অতি সাধারণ ঘটনা। বহু জায়গায় মানুষের চর্ম রোগ, শ্বাসকষ্ট বেড়েই চলেছে। প্রতিকার আর প্রতিরোধ শব্দগুলো ক্রমেই হাস্যকর হয়ে উঠছে।

কোনো উত্তর পাই না। শুনি একটা জরুরি কল আছে এখন পরে কথা হবে। জানি কোনোদিনই হবে না এ ব্যাপারে কোনো কথা। বুঝতে পারি আমি বদলে যাচ্ছি।

#

এর মধ্যে একদিন সুহৃদ বলে, জানেন তৃষা ছিল অসম্ভব জেদী, একরোখা; যে কাজটা ওর মনের মধ্যে ঢুকত সেই কাজটা না করে ও থামত না। কোথায় কোথায় যে দৌড়াত, আমি অনেকবার যেতে চাইতাম ওদের সঙ্গে, বেশিরভাগ সময় রাজী হত না। ওদের কলেজের একটা গ্রুপ ছিল, জনা পনেরোর। মিটিং করে একেবারে নির্দিষ্ট দায়িত্ব নিয়ে তবে ওরা এগোত।

-সেখানে তোমাকে কেন নিত না ওরা? তুমি কী বিরোধিতা করতে?

খুব আস্তে বলে, হয়ত আমার পরিচয় ও জেনে ফেলেছিল তাই।

বলি, কী পরিচয় তোমার?

অনেকক্ষণ মাথাটা নীচু করে থাকে, একটাও শব্দ বেরোয় না ওর মুখ থেকে। ওর এই হঠাৎ হঠাৎ চুপ করে যাওয়ায় আমি এখন এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে কিছুই বলি না।

মুখটা যখন তোলে দেখি ওর চোখ জলে ভরে আছে। বুঝতে পারি ছেলেটাকে সময় দিতে হবে।   

-বিরোধিতা করতাম না বলা যায় না আবার করতাম তাও বলা যাবে না। আমার ভয় করত অনেকসময় মারাত্মক মাফিয়াদের কথা ওর মুখ থেকে শুনে। আমি জানতাম বিপদ ওর আশেপাশেই ঘুরছে। তৃষা তোয়াক্কা পর্যন্ত করত না।

-ওদের কাজের পদ্ধতি কী ছিল? জানো?

-হ্যাঁ। বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে বাচ্চাদের ওরা শেখাত কিভাবে পরিবেশ দূষণ রুখবে। কিভাবে নিজেদের এলাকার ছোট ছোট প্রতিরোধ গড়ে নদীগুলোকে নালা হওয়ার হাত থেকে বাঁচাবে।

গত বেশ কয়েকটা সিটিং পেরিয়ে এসে এটা আমিও বুঝতে পারছিলাম, তৃষার ব্যাপারে এসপার, ওসপার কিছু একটা বুঝতে না পারলে সুহৃদের মনের নাগাল পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই আমার।

বলি, তৃষা এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কিভাবে সেটা কি তুমি জান?

মাথাটা নাড়ায় ও। বুঝতে পারি জানে না। তারপর একটু থেমে বলে, হয়ত ওর মা বাবার কাছ থেকেই এই ইন্সপিরেশন পেয়েছিল তৃষা।

আবার চুপ করে যায়। আবার পরেরদিনের অপেক্ষা আমার। কেসটা এখন শুধুমাত্র চ্যালেঞ্জ নেই আমার কাছে এটা বুঝতে পারি। সুহৃদ নামক রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে একটা সম্পূর্ণ নতুন প্রজন্মকে জানছি আমি, যাদের আপাত সুখী আর সব ব্যাপারে বিমুখ বলে ভাবতাম।

পরেরদিন আবার ওঠাই তৃষার বাবা মায়ের প্রসঙ্গ। বুঝতে পারি সে বেশি কিছু না জানলেও কিছু জানে।

বলি, তৃষার মা বাবা কী ধরণের কাজ করতেন ওঁরা? তুমি দেখেছ ওনাদের?

খানিকক্ষণের জন্য একেবারে চুপ হয়ে যায় সুহৃদ। তারপর বলে, ওর মা ছিলেন পরিবেশ কর্মী আর বাবা ছিলেন সাংবাদিক। তৃষার কাছেই শুনেছি পরিবেশ বিরোধী কাজ আটকাতে গিয়েই খুন হতে হয় ওর বাবাকে।

-ছিলেন মানে?

-বারো বছরের তৃষার সামনেই, বড় রাস্তার ওপরে ওর বাবাকে গুলি করে মারে ওরা। তৃষা তখন ওর বাবার স্কুটারে বসা। স্কুল থেকে ফিরছিল। যেভাবেই হোক ‘ও’ বেঁচে যায়।

-তৃষার মা?

-এই ঘটনার মাত্র কয়েকমাস আগে ওর মা মারা যান ওদের বাড়ির মধ্যেই গ্যাস লিক করে। ওর মায়ের মৃত্যু অনেকের মতে আত্মহত্যা, তবে ওর বাবা সেটা মেনে নেননি, তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তৃষা বলেছিল দুটোই খুন।

-তারপর?

-যে শহরে ওরা থাকত সেখান থেকে ওর মামারা ওকে নিয়ে রাতারাতি পালিয়ে আসেন আমাদের শহরে, নাহলে হয়ত…।

বাইরে তখন বিকেলের আলো মরে আসছে। কিন্তু সেই আলোকে আলো বলা কঠিন; ধূসর রঙের এক বিষাক্ত ধোঁয়াশা পুরো শহরটাকে একটা ঢাকনার মতো চেপে ধরেছে। ঘরের কাঁচের জানালার ওপরেও যেন বাতাস ভারী হয়ে ঝুলে আছে।

​আমি সুহৃদের দিকে তাকালাম। ও চেয়ারে বসে আঙুল মটকাচ্ছে। ওর চোখমুখ ভীষণ ক্লান্ত। যদিও আমার কাছে সে এখন অনেক সহজ সাবলীল তবুও ও কিরকম এক দ্বিধায় ভুগছে বলেই মনে হয় আমার।

বুঝতে পারি, কথা একমাত্র কথাই এই ভারী আবহাওয়া থেকে মুক্তি দিতে পারে এই সময়টাকে। সুহৃদ এখন বাইরের জগতের অনেক খবরই রাখে না। সেটা রাখা ওর পক্ষে সম্ভব নয় আজকের পরিস্থিতিতে। সময় এগোচ্ছে নতুন সূর্যোদয়ের পথে সেটা সুহৃদকে জানাতেই হবে। তাড়াহুড়ো করে কোনো লাভ হবে না। খুব ধীরে ধীরে কথার পিঠে কথা সাজিয়ে এগোতে থাকি, তুমি আর তৃষা, তোমরা কি একসঙ্গে ট্রেকিং এ যেতে?

-না। আমাদের গ্রুপদুটো আলাদা ছিল।

আবার খানিকক্ষণের নিস্তব্ধতা।

বলি, একসঙ্গে প্ল্যান করে ট্রেকিং হত না?

-না।

সঠিক পয়েন্ট সহ পেশ করতে পারলে হয়ত উত্তর পাব এই আশায় আমাকে আবার কথা খুঁজতে হয়।  

আমাকে খানিক অবাক করে হঠাৎ হেসে ওঠে সুহৃদ। যে ছেলেকে শত মজার কথা মজার স্মৃতি মনে করিয়েও হাসাতে পারিনি সে নিজে হাসছে।

বলি, আমার সঙ্গে কী শেয়ার করা যায় হাসির কারণটা?

-আপনি বললেন না একসঙ্গে ট্রেক, না তা হত না, তবে দেখা হয়ে যেত বার বার। এভাবেই গোমুখ থেকে শুরু করে, মহাবালেশ্বর, স্পিতি চামোলি কত জায়গায় যে তৃষাদের গ্রুপটার সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে আমাদের। বন্ধুরা খুব পেছনে লাগত আমার।

আমার জানা নেই এর কী উত্তর দেব। চুপ থাকি কয়েক মূহুর্ত তারপর বলি, নিয়তি তোমাদের বার বার মিলিয়ে দিচ্ছিল।

-হয়ত তাই।

বলি, তৃষার বাড়িতে আর কে আছেন?

-কেউ নেই।   

কথা বলতেই যেন বলি, হ্যাঁ। ঠিকই বলেছিল তৃষা। নদীগুলো আমাদের ইচ্ছাতেই নিজেদের স্বাভাবিক গতি হারায়, তাতে এসে জমে আবর্জনার স্তুপ।

-আপনি এইসব খবর রাখেন? অবাক হয়ে তাকায় আমার দিকে।

সেদিনের মত ওর ক্লাস শেষ হয়ে গেলেও ফিরে যাওয়ার গরজ দেখি না আমি। মনে হয় যেন কিছু বলতে চায় আমাকে। বলি, কিছু বলবে সুহৃদ? মাথা ঝাঁকায়। বলি, বল। ফিসফিস করে বলে, ওকে ওরা মারতে পারবে না যতই চেষ্টা করুক। এই একটা কথা বলেই পিছন ফেরে সে। আমি বুঝতে পারি না ওর কথার মানে।

এর পরের সিটিংএ সুহৃদ আসতে পারে না। তার পরেরটাতেও না। ওর বাবা একটার পর একটা ডেট বদলান। অন্য একটা সোর্স থেকে খবর পাই ছেলেকে ওঁরা অন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন আজকাল। খারাপ লাগে…কিন্তু…।

# 

হঠাৎ সেদিন পেসেন্ট লিস্টে সুহৃদের নাম দেখে খনিকটা অবাক হই।

তাকে দেখামাত্র বলি, তারপর? অনেকদিন বাদে যে আবার? প্রেসক্রিপশনের প্যাডে কলমটা আলতো করে ঠুকতে থাকি। কথায় হয়ত খানিকটা বিরক্তি মিশেছিল। নিজের অপমান পৃথিবীতে একটি শিশুও মেনে নিতে পারে না বিশেষত আমি যখন প্রায় সুস্থ করে এনেছিলাম ছেলেটাকে।

-প্রেসক্রিপশন লেখার দরকার নেই ম্যাডাম।

অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। অবাক অথবা বিরক্ত!

-আজকের আপনার আমার সাক্ষাৎ সম্ভবত আমাদের শেষ সাক্ষাৎ। আপনি নিশ্চিত জানেন না আমার ডাক্তার বদল করা হয়ে গেছে। আপনার এখানকার ডেটগুলো নিশ্চয় বার বার বদলানো হত।

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি কারণ ঘটনা ঠিক সেটাই।

​-অনেক বড় ব্যবসাদার বাবার একমাত্র ছেলে আমি... বুঝতেই পারছেন, টাকা থাকলে সত্যিটা ধামাচাপা দেওয়া কঠিন নয়।

​-সত্যিটা কী সুহৃদ?

​-তৃষা আর ওর টিম এক রাতে নদীর পাড়ে যে কারখানার বর্জ্য ফেলার ভিডিও করেছিল সেই কারখানাটা মিঃ সোহাগরঞ্জন বসুর।

সুহৃদের এই কথায় চমকে উঠি আমি। সে কিন্তু বলেই চলে, তারপর থেকেই তৃষার বিরুদ্ধে ওদের অভিযান এক দিনের জন্য থামেনি। এদের আমি খুব ভালো করে চিনি। এরা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে, অর্থবল কাজে লাগিয়ে সব কিছু করতে পারে নিজেদের স্বার্থে। তৃষাদের টিমের বিরুদ্ধে নেমে পড়েছিল সেভাবেই কিন্তু সেটা বুঝতে পেরে যাই আমি। দরকারে আমাকে 'মানসিক ভারসাম্যহীন' বানিয়ে ঘরে বন্দী করে রাখা হতে পারে এটা বুঝে উঠতে পারিনি তখনো।

আমার নিঃশব্দ ভীত চাউনি দেখে সে একটু হাসে।

বলে, এখন এইসব বুঝতে আমার একটুও অসুবিধা হয় না। অনেকদিনের জন্য আমাকে একটা পাঁচতারা রিহ্যাবে রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। তৃষা যদি ফিরে আসতে পারে তার কিংবা আমার বন্ধুদের সাধ্য হবে না ওখানে আমার সঙ্গে দেখা করার। বহু চেষ্টায় আপনার সঙ্গে দেখা করার একটা অনুমতি যোগাড় করতে পেরেছি।

আমি তাকিয়ে আছি দেখে বলে, আপনার কাছে অন্তত সত্যি কথাগুলো থাক যদি কখনো কাউকে বলেন, এভাবেই হয়ত সত্যিটা ছড়িয়ে যাবে। আমি পারি কিংবা না পারি, অন্য কেউ পারবে—সুহৃদ বিষাদের হাসি হাসে।

​আমি কিছু সময় চুপ করে রইলাম। এই শহরেও এখন রাস্তা আর বাসস্থানের নামে বলি হচ্ছে অজস্র বৃদ্ধ বনস্পতি, যাদের দেখেছি ছোট থেকে সেইসব গাছের শবদেহ যায় ট্রাকে চড়ে মিছিল করে। তিরিশ, চল্লিশ তলা বাড়িগুলো অবাধে শহরের এখানে ওখানে গজিয়ে উঠছে আর নিঃশব্দে নেচে চলেছে প্রায় প্রাগতৈহাসিক একমাত্র জীবিত শব্দ ‘টঙ্কা’।

-কিন্তু সুহৃদ, তুমি এত ঝুঁকি নিতে গিয়েছিলে কেন? ওই আন্দোলনের পেছনের মানুষদের তো প্রশাসন সহজভাবে নেবে না তা তুমি জানতে।

-জানতাম। তবে তৃষাদের একাত্মতা দেখে, আমি একা নই আমার মত আরো অনেকে জুড়ে গিয়েছিল ওদের আন্দোলনের সঙ্গে। ওর ক্ষমতা ছিল মানুষকে টেনে আনবার। এভাবেই আন্দোলনটা ছড়িয়ে পড়ছিল।

​-তুমি কি নদীকে ভালোবাসতে? পাহাড়কে? প্রকৃতিকে? এগুলোকে ভালোবেসেই কি ওদের সঙ্গে যেতে চাইতে?

​-না। সেভাবে নয় তবে…

-তবে কী?

-ওদের সঙ্গে মিশে আমিও কিরকম নদী, গাছ, পাহাড়কে ভালোবাসতে শুরু করে দিয়েছিলাম। সেটা কবে কিভাবে হয়েছিল বলতে পারব না। ওই যে আপনাকে বললাম তৃষার একটা জাদুকরী শক্তি ছিল মানুষকে বোঝানোর।

​#

সুহৃদ জানে না পরিস্থিতি বদলাচ্ছে দ্রুত। পরিবেশের বিষ আর মানুষের মনের বিষ রুখতে তৃষাদের মত অল্প বয়সী যুবক যুবতীরাই শুধু নয়, পরিবেশবিদদের সঙ্গে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কবি সাহিত্যিক থেকে অতি অতি সাধারণ মানুষ যারা দিন আনে, দিন খায় তারাও বেরিয়ে এসেছে পথে। তৃষার হারিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ‘প্রশাসন সজাগ হও’ নামে সাধারণ মানুষের এক মঞ্চ তার আবেদন নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে আজ দেশের কোনায় কোনায়। হাজার ছাড়িয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ এগিয়ে আসছে রোজ। প্রশাসনের জল কামান থেকে কাঁদানে গ্যাস কিছু দিয়েই থামানো যাচ্ছে না জনতার এই আন্দোলনকে।  

​সুহৃদ চুপ করে বসে আছে। ওর চুপ করে যাওয়া আমি দেখছি।

​সেই নীরবতার মধ্যে আমি শুনতে পাচ্ছি বাইরের শহরের কোলাহল। খবর ছড়িয়ে পড়েছে—কালো ধোঁয়াশা আর বিষাক্ত যমুনার ফেনা পরিষ্কারের দাবিতে হাজার হাজার ছাত্র-যুবক রাজপথে নেমেছে।

ওড়িষার আদিবাসীরা ‘নিয়মগিরি-রায়গড়া, ডোংরিয়া কোন্ধ অঞ্চলের ভূগর্বস্থ বক্সাইট তোলার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে চলেছেন।

বলি, দেখ সুহৃদ, এদের কারুর কাছে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পতাকা নেই; এদের একটাই দাবি—'আমাদের মুক্ত বাতাস, আমাদের নদী, জঙ্গল, পাহাড় আমাদের ফিরিয়ে দাও'।

​ভাবি, সর্বকালে, সর্বদেশে প্রশাসন চেষ্টা করেছে আন্দোলনকে উগ্রপন্থীদের আর দিগভ্রষ্টদের আন্দোলন হিসেবে দাগিয়ে দিতে কিন্তু রোজ যেখানে এগিয়ে আসছে অজস্র নতুন মুখ, তরুণ, তরুণীদের চোখে যে আগুন, তা যেন শুধু বিশুদ্ধ বাতাস আর জলের জন্য নয়। শহরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া অবক্ষয়, দুর্নীতি আর কণ্ঠরোধের বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত হুঙ্কার হয়ে উঠছে না কি দিনে দিনে?

আমি বলি, তুমি আর একা নও সুহৃদ, তৃষার সমর্থনে দেশজুড়ে নেমেছে জন জোয়ার- কান পাতো শুনতে পাবে দিন বদলের ডাক। নতুন সূর্য উঠবেই। তোমাদের এত চেষ্টা বিফলে যেতে পারে না। মানুষ জাগছে। জনস্রোত মিশছে জনস্রোতে; নদী হয়ে তা বয়ে চলেছে দেশের প্রতিটি কোণে। তোমরা জিতছ সুহৃদ। তুমি রিহ্যাব থেকে ফিরে এসে নতুন খবর পাবেই।

​সুহৃদ জানালার দিকে তাকাল। জানালার ওপারে ধোঁয়াশার নদী আর রাজপথের যুবসমাজ এক হয়ে গেছে। তৃষা হয়তো ওই মিছিলেই কোথাও আছে, প্ল্যাকার্ড হাতে ধোঁয়াশার বিরুদ্ধে চিৎকার করছে। আর সুহৃদ, যে কেবল ভালোবাসার টানে এসেছিল, সে-ও আজ বুঝতে পেরেছে—এই শহরকে বাঁচাতে হলে আগে বিষাক্ত ধোঁয়াশার আড়ালের সত্যিগুলোকে মুক্ত করতে হবে।

আমার চোখ ভিজে ওঠে। মনে হয় এরাই পারবে।

দেখতে পাই হাসছে সুহৃদ। সে এক অপূর্ব নির্মল হাসি। উঠে দাঁড়ায়, ওর ছোট্ট স্যাক থেকে একটা রোল পাকানো কাগজ আমার হাতে দেয়।

বলে, আমাকে রিহ্যাবে বন্দী করলেও এ আন্দোলন থামানো যাবে না। দেখে নেবেন, এরা জয় করবেই।

ও বেরিয়ে গেছে, আমি রোলটা খুলে দেখি, একটি মেয়ে হাত তুলে রয়েছে আকাশে। মুখে তার আলোর হাসি তার পিছনের জঙ্গলে এক স্বচ্ছতোয়া নদী, সেখানে ছায়া পড়েছে সে মেয়ের। নদীর জল, জঙ্গল সবাই যেন খুশি সে মেয়েকে ফিরে পেয়ে।  

 

0 Comments

Post Comment