পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

নির্বাচনী বন্ড প্রকল্প ও এডিআরের ভূমিকা

  • 04 May, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 665 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন কল্যাণ মণ্ডল
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচনের আগে ক্ষমতা জাহির করার প্রতিযোগিতায় নামে। পেশি শক্তি ও অর্থ শক্তির আস্ফালন— টাকা দিয়ে ভোটারকে প্রভাবিত করার মতো অনৈতিক কাজও এখন বেশ স্বাভাবিক। আর সরকার গড়ার জন্য বিপক্ষের বিধায়ক বা সাংসদ কেনার জন্য বিপুল অর্থ। তার যোগান আসে নির্বাচনী বন্ডের মতো একটা কালো টাকা সাদা করার রহস্য ঘোরা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে।

গণতন্ত্রের প্রধান ভিত্তি নির্বাচন। সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে সরকার গড়বে, প্রত্যাশিত সরকার কল্যাণকর কাজের মধ্য দিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পুরণ করবে। নির্বাচন প্রক্রিয়া সুসম্পন্ন করার জন্য সংবিধান মেনে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। কবে কোথায় কী নির্বাচন হবে তারা সময় মতো জানিয়ে দেয়। সেই মতো নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নেয়। বাস্তবে বর্তমান ভারতে এই সহজ সমীকরণ এখন আর অতটা সহজ নেই।

প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচনের প্রাক্কালে নিজেদের ক্ষমতা জাহির করার প্রতিযোগিতায় নামে। দেখা যায় তাদের পেশি শক্তি ও অর্থ শক্তির আস্ফালন। টাকা দিয়ে ভোটারকে প্রভাবিত করার মতো অনৈতিক কাজও এখন বেশ স্বাভাবিক। আর আছে সরকার গড়ার জন্য বিপক্ষের বিধায়ক বা সাংসদ কেনার জন্য রয়েছে ‘ঘোড়া কেনা-বেচা’র মতো ব্যাপার যেখান বিপুল অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু, সহজ প্রশ্ন— এত টাকা কোথা থেকে আসে?

১লা ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট বক্তৃতায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেছিলেন: ‘স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও, দেশ রাজনৈতিক দলগুলিকে অনুদান দেবার একটিও স্বচ্ছ পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে পারেনি যা অবাধ ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থার জন্য অত্যাবশ্যক। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বেশিরভাগ তহবিল বেনামী অনুদানের মাধ্যমে পেতে থাকে যা নগদে দেখানো হয়। তাই, ভারতে রাজনৈতিক তহবিলের ব্যবস্থাকে পরিষ্কার করার জন্য একটি প্রচেষ্টা দরকার।’ এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অর্থমন্ত্রী ভারতীয় নির্বাচনী ব্যবস্থায় কালো টাকাকে সাদা করে রাজনৈতিক দলগুলির আয়ের বিকল্প পথ তৈরি করার প্রস্তুতি নিলেন। যার পোশাকি নাম— নির্বাচনী বন্ড প্রকল্প।

নির্বাচনী বন্ড প্রকল্প, ২০১৮ (Electoral Bond Scheme, 2018) অনুসারে, নির্বাচনী বন্ড হল প্রতিশ্রুতিপত্র হিসাবে জারি করা একটি বন্ড যা চরিত্রগতভাবে ‘বেয়ারার’ বা বাহকী। বেয়ারার মাধ্যম এমন একটি ব্যবস্থা যাতে ক্রেতা বা প্রদানকারীর নাম থাকে না, মালিকানার কোনও তথ্য রেকর্ড করা হয় না এবং যার হাতে (অর্থাৎ, রাজনৈতিক দল) এই বন্ড থাকবে সেই এর মালিক।

সহজ কথায়, নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যম যে কেউ রাজনৈতিক দলকে অর্থ দান করতে পারে। এই ধরনের বন্ড, যা ১০০০ টাকা, ১০,০০০ টাকা, ১ লক্ষ টাকা, ১০ লক্ষ এবং ১ কোটি টাকার বন্ডপত্রে বিক্রি হয়। এবং শুধু মাত্র স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার অনুমোদিত শাখাগুলি থেকে কেনা যেতে পারে৷ এই হিসাবে, একজন দাতা উপরের উল্লেখিত যে কোন নির্দিষ্ট মূল্যের বন্ড কেনার জন্য একটি চেক বা কোন ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে (নগদ অনুমোদিত নয়) অনুমোদিত এসবিআই শাখায় পছন্দের রাজনৈতিক দলের নামে টাকা জমা করবে। বন্ড জমা হবার ১৫ দিনের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলিকে এই ধরনের বন্ড ভাঙিয়ে নিতে হবে। অবশ্যই এই প্রক্রিয়াটি বেনামী বা এতে দাতার নাম উল্লেখ থাকবে না। কোন একজন ব্যক্তি, কর্পোরেট এককভাবে বা অন্য কারো সঙ্গে যৌথভাবে বন্ডগুলো কিনতে পারে। সরকার একটি ঘোষণার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বন্ড বিক্রি করে। নির্বাচনী বন্ড কেনার কোন নির্দিষ্ট সীমা নেই, অর্থাৎ কোনও ব্যক্তি বা কর্পোরেট যতগুলো খুশী বন্ড কিনে পছন্দের রাজনৈতিক দলকে অর্থ সরবরাহ করতে পারে। ১৫ দিনের মেয়াদের মধ্যে বন্ডের টাকা না তুললে সেই টাকা প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে জমা হয়ে যাবে।

মার্চ ২০১৮ থেকে জানুয়ারী ২০২১ এর মধ্যে রাজনৈতিক দল ও তাদের শাখাগুলো যে বন্ড পেয়েছে তা টাকাতে ভাঙিয়ে নিয়েছে। সেই তথ্য অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস ১৫ ধাপে বিশ্লেষণ করেছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:

  • মার্চ ২০১৮ থেকে থেকে জানুয়ারী ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ ধাপে ১২, ৯২৪ টি নির্বাচনী বন্ড বিক্রি হয়েছে যার মূল্য ৬৫৩৪.৭৮ কোটি টাকা। যার মধ্যে ১২,৭৮০ বন্ড ভাঙিয়ে নেওয়া নিয়েছে, যার মূল্যমান ৬৫১৪.৫০ কোটি টাকা। নির্বাচনী বন্ডের মোট মুল্যের ৫৫.৪৩% বন্ড ২০১৯ সালের মার্চ এবং এপ্রিল এই দু’মাসের মধ্যে কেনা হয়েছিল।
  • নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে বিজেপির বার্ষিক অডিট প্রতিবেদন অনুসারে, দলটি নির্বাচনী বন্ডের থেকে ২১০ কোটি টাকা অনুদান পেয়েছে। এটা ছিল ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে কেনা সমস্ত নির্বাচনী বন্ডের পুরো ৯৫% ভাগ। ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে বিজেপি ১৪৫০ কোটি টাকার নির্বাচনী বন্ড পেয়েছে এবং জাতীয় কংগ্রেস পেয়েছে ৩৮৩ কোটি টাকা মূল্যের নির্বাচনী বন্ড।
  • লোকসভা নির্বাচন ২০১৯ এর সময়কালে— মার্চ ২০১৯ (অষ্টম পর্ব), এপ্রিল ২০১৯ (নবম পর্ব) এবং মে ২০১৯ (পঞ্চম পর্ব) এর মধ্যে নির্বাচনী বন্ডের মোট মূল্যের ৬৮.০৮% কেবল তিন মাসের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলি ভাঙিয়ে নিয়েছে।
  • নির্বাচনী বন্ড প্রকল্পের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলির দাতাদের নাম প্রকাশে বাধ্যবাধকতা না থাকায় রাজনৈতিক দলগুলির জন্য অনুদানের সর্বাধিক জনপ্রিয় পদ্ধতি হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস দ্বারা ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষ বিশ্লেষণে করে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলির মোট আয়ের ৫২% এবং আঞ্চলিক দলগুলির মোট আয়ের ৫৩.৮৩% টাকা এসেছে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে প্রাপ্ত অনুদান থেকে।
  • ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষের জন্য অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে বিজেপি, জাতীয় কংগ্রেস, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেস এই চারটি জাতীয় দল মিলে মোট ১৯৬০.৬৮ কোটি টাকা প্রাপ্তি ঘোষণা করেছে। এবং আরও সাতটি আঞ্চলিক দল— বিজু জনতা দল (বিজেডি), তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি (টিআরএস), ওয়াইএসআর-সি, শিবসেনা, তেলুগু দেশম পার্টি, জনতা দল সেকুলার (জেডিএস) এবং সিকিম ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (এসডিএফ) নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে অনুদান হিসাবে ৫৭৮.৪৯ কোটি টাকা পেয়েছে।
  • ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে জাতীয় দলগুলি সর্বাধিক ৮৮১.২৬ কোটি টাকা কর্পোরেট অনুদান পেয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে পেয়েছে ৫৬৩.১৯ কোটি টাকা ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষে পেয়েছে ৫৭৩.১৮ কোটি টাকা (এই সময়ে ১৬তম লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়)। ২০১২-১৩ অর্থবর্ষ থেকে ২০১৮-১৯ সালের মধ্যে জাতীয় দলগুলিতে কর্পোরেট অনুদান ৯৭৪% বৃদ্ধি পেয়েছে।

নির্বাচনী বন্ড প্রকল্প, ২০১৮ অসাংবিধানিক, অস্বচ্ছ ও ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প

  • অর্থ বিল আইন ২০১৭, যা নির্বাচনী তহবিল বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নির্বাচনী বন্ড ব্যবস্থা চালু করেছিল, তা মানি বিল হিসাবে পাস হয়। এই সংবিধান সংশোধনীতে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে দায়ের করা বার্ষিক প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলগুলিকে এই বন্ডের মাধ্যমে প্রাপ্য অনুদানের দাতার নাম এবং ঠিকানা উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। এর ফলে রাজনৈতিক দলের আর্থিক স্বচ্ছতার উপর একটি বৃহৎ প্রভাব ফেলে এবং এই অস্বছতার কারণে রাজনৈতিক অনুদানের ধারণাটি কার্যত বদলে যায়।
  • দাতা বেনামী থাকায় নির্বাচনী বন্ড নাগরিকের মৌলিক ‘জানার অধিকার’ লঙ্ঘন করে।
  • কেবলমাত্র সরকার এই নির্বাচনী বন্ড দাতার নাম আবেদনের মাধ্যমে স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার (এসবিআই) কাছ থেকে পেতে পারে। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, কেবলমাত্র করদাতারা এই অনুদানের উত্স সম্পর্কে অন্ধকারে থাকবে।
  • নির্বাচনী বন্ডগুলি অবশ্যই অনুদানের সমর্থন এবং অস্বচ্ছতা ও রহস্যময় উত্স। এই পদ্ধতিতে নির্বাচনী ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ৬৫০০ কোটি টাকার অবৈধ অর্থকে বৈধতা দিয়েছে।
  • বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থা যেমন রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই), ভারতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই), এমনকি আইন মন্ত্রক এবং রাজ্যসভার বিভিন্ন সংসদ সদস্য নির্বাচনী বন্ডের পদ্ধতির তীব্র বিরোধিতা করে কেবল তাদের আশঙ্কা প্রকাশ করেনি, বরং নির্বাচনী বন্ড প্রকল্পের বিরুদ্ধে সরকারকে বারবার সতর্ক করে এই বলে যে, এতে কালো টাকার সঞ্চালন, অর্থ পাচার, আন্তঃসীমান্ত জালিয়াতি এবং জালিয়াতি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। কেবল আপত্তিকেই উপেক্ষা করা হয়নি, এমনকি এই প্রকল্পটি জালিয়াতির প্রতি কম ঝুঁকিপূর্ণ করার পরামর্শগুলিও সরকার এড়িয়ে গেছে।
  • রাজ্যসভায় সরকার মিথ্যা বলেছিল যে, অর্থদানের স্বচ্ছ পদ্ধতি ব্যবহার করা হলে দাতারা রাজনৈতিক প্রতিশোধের ভয় পাবে।
  • আইন মন্ত্রনালয় বারবার অর্থ মন্ত্রকের এই বিধানের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছিল যে, এই প্রকল্পের জন্য যোগ্য হতে গেলে রাজনৈতিক দলগুলিকে লোকসভা বা রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ১% ভোট অবশ্যই পেতে হবে। আইন মন্ত্রক ইঙ্গিত দিয়েছিল যে এই প্রকল্পটি জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১-এর সাথে একত্রিত হওয়া উচিত।
  • বাস্তবে নির্বাচনের সময় বেশিরভাগ বন্ড একটি রাজনৈতিক দল গ্রহণ করে ভাঙিয়ে নেয় যা কেন্দ্রীয় স্তরে সুষম নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।
  • রাজনৈতিক দলগুলি জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১ এর বিধান লঙ্ঘন করে কোন সরকারী সংস্থা বা বিদেশী উত্স থেকে অনুদান নিয়েছে কি না তা এক্ষেত্রে কখনই নিশ্চিত করা যায় না।

অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মসের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৫ই মার্চ ২০১৮ তারিখে, সুপ্রিম কোর্ট ১২ই এপ্রিল, ২০১৯ এর অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের সাথে সিল করা কভারে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে প্রাপ্ত অনুদানের বিবরণ ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে ৩০ই মে ২০১৯এর আগে জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী আদেশের সাথে নির্বাচন কমিশনের কাছে সিল করা কভারে বিশদ জমা দেওয়া রাজনৈতিক দলগুলির যোগ্যতা অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস পরীক্ষা করে দেখেছিল, বিশ্লেষণের ফলাফলগুলি এই প্রকল্পটির বাস্তবায়নে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন তুলে ধরেছে:

  • নির্বাচন কমিশনের কাছে মোট ৬৯টি নিবন্ধিত অপরিচিত দল সিল করা কভারে বিশদ বিবরণ জমা দিয়েছে। নির্বাচন বন্ড পাবার জন্য তাদের যোগ্যতা যাচাই করার জন্য কেবল ৪৩টি দলের ভোট ভাগের বিবরণ তাতে দেওয়া ছিল।
  • নির্বাচনী বন্ড প্রকল্প ২০১৮ সালে বর্ণিত যোগ্যতার মানদণ্ড অনুসারে বিশ্লেষণ করা ৪৩টি দলের মধ্যে কেবল ১টি নিবন্ধিত অপরিচিত দলই নির্বাচনী বন্ড গ্রহণের জন্য যোগ্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
  • নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পে বর্ণিত যোগ্যতার মান অনুসারে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে অনুদান গ্রহণের যোগ্য রাজনৈতিক দলগুলির কোনও তালিকা নেই। ১০ই অক্টোবর, ২০১৯ তারিখে অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মসের আরটিআই আবেদনের উত্তরে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে যে তারা এমন কোনও তালিকা সংকলন করেনি।
  • স্পষ্টতই, নির্বাচনী বন্ড প্রকল্প, ২০১৮-এর অধীনে রাজনৈতিক দলগুলি দ্বারা নির্বাচনী বন্ডগুলি ভাঙানোর আগে কোনও পর্যায়ে কোনও কর্তৃপক্ষের দ্বারা তদন্ত হবে বলে মনে হচ্ছে না।

নতুন দলগুলির এই অপরিচ্ছন্নতার কারণটি অবশ্যই সরকারের বিতর্কিত নির্বাচনী বন্ড এবং সীমাহীন ও বেনামে কর্পোরেট অনুদানের দিকে সন্দেহের দিক নির্দেশ করে। এই রাজনৈতিক দলগুলির বেশীরভাগ কখনই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে না। এই দলগুলি মানি লন্ডারিংয়ের ক্রিয়াকলাপে জড়িত থাকতে পারে বা কালো টাকা সাদা করার জন্য কেবল তাদের স্ট্যাটাস ব্যবহার করছে।

এডিআর-এর সুপারিশ

১. অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস প্রস্তাব দিয়েছে যে নির্বাচনী বন্ড প্রকল্প, ২০১৮ সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা উচিত।

২. প্রকল্পটির ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে, নির্বাচনী বন্ড প্রকল্পের অধীনে বন্ড দাতার নাম প্রকাশের নীতিটি অবশ্যই মেনে চলতে হবে। নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে অনুদান প্রাপ্ত সমস্ত রাজনৈতিক দলকে তাদের প্রতিবেদনে প্রদত্ত আর্থিক বছরে প্রাপ্ত অনুদানের মোট পরিমাণ এবং প্রতিটি বন্ডের বিপরীতে দাতাদের বিশদ বিবরণী ঘোষণা করতে হবে।

৩. নির্বাচনী বন্ড প্রকল্প ২০১৮তে উল্লিখিত যোগ্যতার মানদণ্ড অনুযায়ী নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে অনুদান গ্রহণের জন্য যোগ্য সমস্ত রাজনৈতিক দলের একটি তালিকা সুরক্ষিত ভোট ভাগের ভিত্তিতে সংকলিত এবং নিয়মিতভাবে নির্বাচন কমিশন ও এসবিআইয়ের ওয়েবসাইটের আপডেট করা উচিত।

৪. নিয়ম লঙ্ঘন করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলিকে কর ছাড়ের সুযোগ না দেওয়া ছাড়াও প্রকাশ্য জরিমানা আরোপ করা উচিত।

৫. দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা রাজনৈতিক দলগুলি যারা কোনও নির্বাচনে অংশ নেয় না এবং নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে নিয়মিত অনুদান নিতে থাকে, এ ধরনের দলগুলিকে সময়ে সময়ে নির্বাচন কমিশনের তালিকা থেকে বাতিল করা উচিত, যাতে এরা নির্বাচনী বন্ড প্রকল্প, ২০১৮এর সুবিধা না নিতে পারে।

৬. নির্বাচন কমিশনকে তদারকি করার দায়িত্ব অর্পণ করা উচিত যে নির্বাচনী বন্ড স্কিম, ২০১৮ অনুযায়ী নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে অনুদান গ্রহণে অযোগ্য কোনও রাজনৈতিক দল এই বন্ডগুলিকে ভাঙাতে সক্ষম হবে না।

৭. সকল জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলকে তথ্যের অধিকার (আরটিআই) আইনের অধীনে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে প্রাপ্ত তহবিলের সমস্ত তথ্য সরবরাহ করতে হবে। আরটিআইয়ের আওতায় সকল দাতাদের বিশদ তদন্তের জন্য উপলব্ধ করতে হবে।

৮. কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেল (CAG) এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত একটি সংস্থা কর্তৃক রাজনৈতিক দলগুলির জমা দেওয়া বার্ষিক আর্থিক বিবরণ যাচাই করবে।

৯. ৩রা জুন, ২০১৩ তারিখে কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনের আদেশ মেনে রাজনৈতিক দলগুলিকে আরটিআই আইন, ২০০৫ এর আওতায় আনতে হবে।

আশার কথা, ৫ই এপ্রিল, ২০২২ তারিখে সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচনী বন্ড সংক্রান্ত মামলায় প্রধান বিচারপতি সম্মতি জানিয়েছেন, এই মামলাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি ভিত্তিতে সুনানি হওয়া দরকার। সুতরাং আমরা আশা করছি যে নির্বাচনী বন্ড সংক্রান্ত উপযুক্ত নির্দেশিকা পাব এবং এর মধ্যে যেসব অস্বচ্ছতা আছে তা দূর হবে।

লেখক - ওয়েস্ট বেঙ্গল ইলেকশন ওয়াচের সদস্য

0 Comments

Post Comment