পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

রাম, এক উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন রাজা

  • 05 February, 2024
  • 0 Comment(s)
  • 596 view(s)
  • লিখেছেন : দেবদত্ত পট্টনায়ক
রাম কে? রাম হলেন একজন তৃপ্ত রাজা - তপস্বী রাজা, যিনি খাওয়ার পরিবর্তে খাওয়ান, তথাপিও তার সবসময় যথেষ্ট সম্পদ থাকে। রামায়ণ উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন একজন রাজার গল্প। কোনো আত্মতৃপ্ত বা অলস রাজা নয়, একজন সহানুভূতিশীল রাজা – অন্য মানুষের ক্ষুধার প্রতি সংবেদনশীল এক রাজা। আজকে যাঁরা রামের নামে জয়ধ্বনি করছে, তাঁরা কি এই গল্পগুলো জানে?

মহাকাব্য রামায়ণে আছে, রাম বনবাসে থাকাকালীন, কবন্ধ নামে এক অদ্ভুত রাক্ষসের মুখোমুখি হয়েছিলেন। কবন্ধ তার লম্বা দুই হাত বাড়িয়ে  রাম ও তার ভাইকে দুই  মুঠোয় ধরে তাদের তার মুখের কাছে টেনে নিয়ে যায়। তখনই রাম লক্ষ্য করেন এই রাক্ষসটির আলাদা করে কোনো মাথা নেই, তার মাথা তার পেটের সাথে মিশে আছে । একটু অন্য কথায় বললে, তার দৃষ্টি, শ্রবন এবং চিন্তা ভাবনার প্রক্রিয়া একমাত্র তার পেটের জন্য। কেবল খাদ্য গ্রহণের জন্যেই তার অস্তিত্ব। অন্য আর কোন ভাবনা নেই। বেঁচে থাকার অন্য আর কোন উদ্দেশ্য নেই। পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্রের মতো বিশিষ্ট অর্থনৈতিক দর্শন যেগুলি আজ আমাদের আর্থসামাজিক রূপরেখা গঠন করে  থাকে -তাদের সাদৃশ্যে এই মহাকাব্যিক বর্ণনাটি একটি চমৎকার রূপক।

এবার বিশ্বের উচ্চাকাঙ্খী কোটিপতিদের দিকে একবার তাকান। বিশ্বের অন্য যে কারও চেয়ে তাদের কাছে সম্পদের পরিমাণ বেশী, কিন্তু তাদের চাহিদার অন্ত নেই, তাদের আরো আরো চাই, তারা নিরলস সম্পদ বৃদ্ধির পথ অনুসরণ করে চলেছে। তাদের কোনো সাক্ষাৎকার নিলে দেখা যায় তারা ক্রমাগত বৃদ্ধির লক্ষ্যে উদ্দীপিত, ক্ষুধার্ত ও টগবগে এবং তারা তাদের সন্তুষ্টিহীনতাকে জনপ্রিয় চটকদার মোড়কে মুড়ে ফেলতে চায়। এর কারণ হল আধুনিক সমাজ অন্তহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে, নিরলস সম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যকে একটি আর্থসামাজিক বিকারগ্রস্ততার পরিবর্তে, দক্ষতা হিসাবে দেখে।

যদি বিল পরিশোধ করার জন্য আপনার যথেষ্ট অর্থ না থাকে তাহলে আরো সম্পদ সংগ্রহের আকাঙ্খার একটা মানে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু যখন আপনার হাতে বিগত পূর্বপুরুষের সত্তর প্রজন্মের উদ্বৃত্ত সম্পদ থাকবে তখন এর কোনও স্বাভাবিক অর্থ হয়? এমন কোনো মুহূর্ত আছে যখন কেউ বলে – আমার যথেষ্ট আছে। আধুনিক সমাজ বলে সন্তুষ্টি একটি মানসিক বিকার -বিজনেস স্কুল এবং ব্যবসায়িক জগতে এই ভাবনাকে আত্মতুষ্টির সাথে সমান করে দেখা হয়। দরিদ্র অথবা ধনী প্রত্যেকের থেকে এটাই হলো প্রত্যাশিত চাহিদা যে - ক্রমাগত অর্থনৈতিক বৃদ্ধির লক্ষ্যে, কর্মক্ষেত্রে তাদের শুধু দৌড়তে হবে, সারাক্ষণ স্মার্টফোনে ব্যস্ত থাকতে হবে। এমনকি ছুটিতেও তারা সহজলব্ধ থাকবেন। পরবর্তী বাণিজ্যিক গন্তব্য ও বৃদ্ধির লক্ষ্যকে সামনে রেখে আগামীর ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির নীলনকশা রচনার লক্ষ্যে তারা শুধু দৌড়াতে থাকবেন। কর্মহীন ছুটি বলে কিছু নেই। শুধুমাত্র উৎপাদমক্ষম থাকার জন্যে প্রচুর সময় বরাদ্দ আছে।

উচ্চাকাঙ্ক্ষার চিয়ারলিডারস

রাম যখন কবন্ধকে হত্যা করে তার দেহকে জ্বালিয়ে দেয়, তখন সেই আগুন থেকে কবন্ধের আত্মা বেরিয়ে এসে শূন্যে দেখা দেয়, সে জানায় তার ক্ষুধার ফাঁদে বন্দী হয়ে থাকার অভিশাপ ছিল, এই অভিশাপ থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য রামকে সে ধন্যবাদ জানায়। আমাদের সমাজের বিত্তশালীরা এই ক্ষুধার ফাঁদে আটকা পড়ে থাকে, কারণ এমন কেউ নেই যে তাদের সন্তুষ্টি ও শান্তির পথে মুক্তি দিতে পারে। এই অভিশাপ মোচনের জন্যে কোনো রাম নেই।

গেরুয়াধারী ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসীরা এক্ষেত্রে অকার্যকর। তারা আজকের কবন্ধদের চিয়ারলিডারের ভূমিকা পালনের জন্য আত্মসমর্পিত। তাদের ধনী ক্লায়েন্টরা যাতে অপরাধ বোধহীন হয়ে আরও বেশি সম্পদের পেছনে ছুটতে, আরও বেশি সম্পদ দখল করতে, আরও আরও মজুত করতে, আরও বেশি খেতে সক্ষম হয়, সেই পথ কে তারা আরো মসৃণ করে তোলে। তাদের সবুজে সাজানো শান্ত নির্জন আশ্রম, স্পা, সৎসঙ্গ এবং তৃপ্তিদায়ক নিরামিষ আহার গৃহ চমৎকার সাময়িক বিরতি দেয় যাতে তাদের ক্লায়েন্টরা আবার পূর্ণ উদ্যোগে শিকারে  ফিরে যেতে পারে।

আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধ বলেছিলেন যে কামনাই দুঃখের কারণ। তিনি যে শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন তা ছিল আকাঙ্খা, কামনা নয়। যতক্ষণ আমরা কিছুর জন্য তৃষ্ণার্ত থাকবো, ততক্ষণ আমাদের দুঃখও থাকবে। এই আকাঙ্খা থেকেই সমস্ত রকম উদ্বেগ, হতাশা, রাগ এবং ঈর্ষার  জন্ম । আপনি যদি নিঃস্ব হন তবে আপনার কিছু চাওয়ার একটা অর্থ হয়। কিন্তু আপনার যদি সবকিছু থাকে এবং সবার থেকে বেশি থাকে, তাহলে এই অনিঃশেষ আকাঙ্খার মানে কি?

আপনি কি কমিউনিস্ট?

আপনি যদি সন্তুষ্টির কথা বলেন, তাহলে পুঁজিবাদ আপনাকে একজন সমাজবাদী, একজন কমিউনিস্ট, একজন বামপন্থী কর্মী হিসেবে অভিযুক্ত করবে। কিন্তু সমাজতন্ত্রও কবন্ধকে লালন করে। যেহেতু ধনীরা সব খাদ্য কুক্ষিগত করে রেখেছে, তাই এখানে অভিজাতরা শিকার, তাদের সমস্ত সুযোগসুবিধা দরিদ্রদের দখলে যেতে হবে। স্বভাবতই, সমাজতন্ত্রের ধারণা ধনী ও সফল ব্যক্তিদের আতঙ্কিত করে। তারা নিজেদের শাস্তিপ্রাপ্ত, অত্যাচারিত, শিকার বলে মনে  করে, কারণ রাষ্ট্র কর-শিকারী হয়ে ওঠে।

পুঁজিবাদে ধনীরা কবন্ধ, গরীবের শ্রমে খায় । সমাজতন্ত্রে গরিবরা কবন্ধ হয়ে যায়, তারা ধনীদের সম্পদে খাদ্যের অধিকার দাবি করে। পুঁজিবাদের নির্যাতিতরা এখানে নিপীড়ক হতে চায়, এমনকি যুক্তিযুক্ত বিতর্কের মাধ্যমে এটিকে সঠিক প্রতিপন্ন করতে চায় । সবাই খেতে চায়, কেউ খাদ্য হতে চায় না। সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদীদের শিকার মনে করে। পুঁজিবাদ সমাজতন্ত্রীদের শিকার মনে করে। প্রত্যেকেই নিজেকে ব্যবস্থার শিকার বলে মনে করে। 

ক্ষুধার অভিশাপ

আর ভয় পেলে আপনি কি করবেন? আপনি আরো মজুদ করবেন, আরো ক্রয় করবেন। এটা আপনি উপলব্ধি করবেন যখন আপনি  ধনী,বিখ্যাত এবং ক্ষমতাশালী লোকদের মুখোমুখি হবেন। তাদের ক্ষুধা স্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান।  তাদের লোলুপ দৃষ্টি, তাদের লকলকে জিহ্বা, মুখ থেকে গড়িয়ে পড়া লোভাতুর লালা - উৎপাদনশীলতা, পরবর্তী সাফল্য, পরবর্তী বিলিয়ন, পরবর্তী তুরুপের তাসের সন্ধানরত। ভয় দেখিয়ে কিংবা অনুকম্পা প্রদর্শন করে তাদের এই  অভিশাপ থেকে মুক্ত করার পরিবর্তে, আমাদের বলা হচ্ছে  তাদের জন্যে খাদ্যের ব্যবস্থা করো, তারা আমাদের যে খাদ্য রূপে দেখতে চায়  তা হলো - তাদের উদ্যোগের প্রতি  আরও উৎপাদনশীল হওয়া, তাদের গ্ল্যামারের প্রতি আরও আকৃষ্ট হওয়া, তাদের দেয়া পণ্য ও পরিষেবার প্রতি আরও বেশি বেশি নিজেকে নিংড়ে দেয়া। কিন্তু ধনীরাও আতঙ্কিত। তারা দেখে যে পৃথিবী যেন কবন্ধময় - যেন কেউ তাদের সম্পদ, তাদের খ্যাতি, সৌন্দর্য, ভাগ্য, কেউ বা তাদের ক্ষমতা কেড়ে নিতে উদ্যত। তাদের কেউ একটু শান্তিতে গ্রাস করতে দেয় না। এরা শুধু রাক্ষুসে খিদের তাগিদে গিলতে থাকে এবং তাদের এই ভয়ঙ্কর করাল গ্রাসের তারা অধিকার দাবি করে। তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ, নিয়ন্ত্রিত এবং সংযত হওয়া দরকার।

পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র সবই পেটের  কথা বলে, মগজের কথা নয়। সুতরাং একটি সাধারণ ধারণা এর প্রবক্তাদের ভাবনা থেকে হারিয়ে যায় - যে আরও খাদ্য  কেবল ক্ষুধাকে বাড়িয়ে তোলে। রাম অভিশাপ থেকে মুক্তি না দিলে কবন্ধ কখনও তৃপ্ত হবে না।

রাম কে? রাম হলেন একজন তৃপ্ত রাজা - তপস্বী রাজা, যিনি খাওয়ার পরিবর্তে খাওয়ান, তথাপিও তার সবসময় যথেষ্ট  সম্পদ থাকে। রামায়ণ উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন একজন রাজার গল্প। কোনো আত্মতৃপ্ত বা অলস রাজা নয়, একজন সহানুভূতিশীল রাজা – অন্য মানুষের ক্ষুধার প্রতি সংবেদনশীল এক রাজা । কবন্ধের মতো কেউ কেউ চান অভিশাপের অবসান হোক। অন্যরা রাবণের মতো সোনার শহরে বসবাস করে, হৃদয়াবেগের সাথে যুক্তি দেয় – একজন বেদ জ্ঞানীর মতো  বলে – উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা অত্যন্ত জরুরি এবং তা পূরণের লক্ষ্যে দরকার হলে ধংসাত্বক যুদ্ধও জায়েজ।   

 

ইকোনমিক টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার অনুবাদ। অনুবাদ করেছেন মৃণাল চট্টোপাধ্যায়। 

 

0 Comments

Post Comment