পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

গণতন্ত্রের গাণিতিক গোলকধাঁধা

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 204 view(s)
  • লিখেছেন : শুভজিৎ বসাক
২০২১ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে বিজেপি পেয়েছে ২ কোটি ৯২ লক্ষ ভোট (বৃদ্ধি ৬৫ লক্ষ), আর তৃণমূল পেয়েছে ২ কোটি ৬০ লক্ষ ভোট (হ্রাস ২৬ লক্ষ)। ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৩২ লক্ষ ভোট। বিজেপির ৬৫ লক্ষ ভোট বাড়ার উৎস কী? তৃণমূল থেকে আসা ২৬ লক্ষ ভোট বিজেপিতে গেলেও বাকি ৩৯ লক্ষ ভোট কোথা থেকে এল? বাম বা অন্য দল থেকে নাকি অন্য কোনো গাণিতিক রহস্য?

২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ‘মালদা সমবেত প্রয়াস’ বাদল সরকারের যুদ্ধবিরোধী নাটক ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ প্রথম মঞ্চস্থ করে। নাটকের মহড়া ঘরটি অতুল মার্কেটের চার তলায়, সিঁড়ির দেওয়ালে যুদ্ধবিরোধী হাতে লেখা পোস্টার লাগানো ছিল। গত ৭ মে ২০২৬ সন্ধ্যায় দেখা যায় পোস্টারগুলো ছেঁড়া, কয়েকটি মেঝেতে পড়ে আছে। ‘FREE FREE FREE PALESTINE’ পোস্টারের নিচে বলপেনে লেখা: ‘Why not Bangladesh?’ আট মাস ধরে অক্ষত থাকা পোস্টারগুলো এখন ভাঙচুর—এটাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী মনে করে নাট্যদল তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।



পশ্চিমবঙ্গে পটপরিবর্তন হয়েছে। তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে এসেছে বিজেপি সরকার, যারা চিরাচরিত ফ্যাসিস্ট রূপ দেখাতে বিলম্ব করেনি—বুলডোজার মিছিল থেকে মসজিদ ভাঙা। অন্ধ্রপ্রদেশ, চণ্ডীগড়, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, কর্নাটকে ভোটচুরির ঘটনা শোনা গেছে। এ রাজ্যের অবস্থা বুঝতে তথ্য আসতে সময় লাগবে। তবে ইতিমধ্যে বিশ্বভারতীর প্রাক্তন অধ্যাপক অশোক কুমার সরকার (অর্থনীতিবিদ ও পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞ) ‘৪র্থ পিলার- উই দ্য পিপল’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। সেই আলোচনার নির্যাসই এখানে তুলে ধরা হলো।

ভোটার সংখ্যা ও ভোটদানের হারে অসংগতি

২০২৬ সালের নির্বাচনে ‘অভূতপূর্ব’ ভোটদানের দাবির মধ্যে বড় গাণিতিক সমস্যা আছে। ২০২১ সালে ভোট পড়েছিল ৬ কোটি ৪ লক্ষ। ২০২৬ সালে ভোট পড়েছে ৬ কোটি ৯ লক্ষ—বৃদ্ধি মাত্র ৫ লক্ষ। এই সামান্য বৃদ্ধিকে ‘বিপুল জনজোয়ার’ বলা যায় কি না, তা বিচার্য।

নির্বাচন কমিশন দাবি করছে প্রায় ৯২% ভোট পড়েছে। ৬ কোটি ৯ লক্ষ ভোট যদি ৯২% হয়, তবে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৬ কোটি ৬২ লক্ষ। অথচ ২০২১ সালে মোট ভোটার ছিল ৭ কোটি ৩৪ লক্ষ। তার মানে, পাঁচ বছরে নতুন ভোটার আসার বদলে প্রায় ৭২ লক্ষ ভোটার নিখোঁজ। সংবাদমাধ্যমে ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ার কথা বলা হয়েছিল; তাহলে হলো ৬ কোটি ৪৩ লক্ষ ভোটার। কিন্তু বর্তমান সংখ্যা ৬ কোটি ৬২ লক্ষ, অর্থাৎ অতিরিক্ত ১৯ লক্ষ ভোটার কোথা থেকে এল, তার কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা নেই।

তথ্যটা পরিষ্কার: ভোটার তালিকা সঙ্কুচিত করা হয়েছে—লব (ভোটদাতা) বাড়েনি, হর (মোট ভোটার) কমানো হয়েছে, ফলে শতাংশ কৃত্রিমভাবে বেড়ে ‘অভূতপূর্ব’ মনে হচ্ছে। প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন এটি নাও হতে পারে।

গাণিতিক গভীরতা: বেনফোর্ডের সূত্র ও অনুপাত বিশ্লেষণ

পরিসংখ্যানের একটি পরিচিত পদ্ধতি হলো বেনফোর্ডের সূত্র (Benford's Law), যা স্বাভাবিকভাবে সংগৃহীত সংখ্যার প্রথম অঙ্কের বণ্টন পরীক্ষা করে। ২০২১ ও ২০২৬ সালের বুথ-স্তরের ভোটার সংখ্যা যদি এই সূত্রের অধীনে পরীক্ষা করা যেত, তাহলে কৃত্রিম কারসাজি ধরা পড়তে পারে। বাংলাদেশের মতো অনেক দেশে নির্বাচনী জালিয়াতি শনাক্তে এই সূত্র কাজে লাগে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন এ ধরনের কোনো পরীক্ষার তথ্য প্রকাশ করেনি। আরেকটি গাণিতিক পদ্ধতি হলো ‘ভোটার টার্নআউট ও নিবন্ধিত ভোটারের অনুপাতের স্থিতিস্থাপকতা’—অর্থাৎ, সাধারণত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে ভোটার সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু এখানে তা কমেছে। ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের ভোটার বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৭%, যা ২০২১-২০২৬-এ নেতিবাচক ১০%-এ দাঁড়িয়েছে। এই ঋণাত্মক প্রবণতা বিশ্বের যে কোনো লৌকিক গণতন্ত্রে অকল্পনীয়।

দলীয় ভোটের গাণিতিক রহস্য

২০২১ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে বিজেপি পেয়েছে ২ কোটি ৯২ লক্ষ ভোট (বৃদ্ধি ৬৫ লক্ষ), আর তৃণমূল পেয়েছে ২ কোটি ৬০ লক্ষ ভোট (হ্রাস ২৬ লক্ষ)। ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৩২ লক্ষ ভোট। বিজেপির ৬৫ লক্ষ ভোট বাড়ার উৎস কী? তৃণমূল থেকে আসা ২৬ লক্ষ ভোট বিজেপিতে গেলেও বাকি ৩৯ লক্ষ ভোট কোথা থেকে এল? বাম বা অন্য দল থেকে নাকি অন্য কোনো গাণিতিক রহস্য? প্রশ্নটি অযৌক্তিক নয়।

প্রফেসর সরকার এই ঘটনাকে ভোটার তালিকার গাণিতিক অসংগতি পর্যালোচনার (Statistical Integrity Review - SIR) সবচেয়ে বিতর্কিত উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটি নিছক যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, বরং ফলাফল বদলে দেওয়ার কারিগরি হাতিয়ার হতে পারে।

‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৪৭টি বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ের ব্যবধান ওই কেন্দ্রগুলোতে SIR-এর মাধ্যমে বাদ দেওয়া ভোটার সংখ্যার চেয়েও কম। অর্থাৎ, ওই ভোটারদের নাম না কাটলে ফলাফল অন্যরকম হতে পারত।

‘দ্য হিন্দু’র পরিসংখ্যানিক মডেল দেখাচ্ছে, যেসব কেন্দ্রে ভোটার বাদ পড়ার হার বেশি (১০-২০% বা তার বেশি), সেখানে তৃণমূল ও বিজেপির ভোটের ব্যবধান অনেক কমে এসেছে। যেখানে মাত্র ৫% ভোটার বাদ, সেখানে বিজেপি ৪১টি সিটেঅনেক ব্যবধানে জিতেছে; কিন্তু যেখানে ২০%-এর বেশি ভোটার বাদ, সেখানে ব্যবধান কমে মাত্র ১৮টি সিট। এটি ইঙ্গিত দেয় যে নির্দিষ্ট কিছু পকেটে বড় সংখ্যক ভোটার বাদ দেওয়া হয়েছে, যাতে স্থানীয় সমীকরণ বদলে যায়।

কার ভোট বাদ পড়েছে, কেন অস্বচ্ছতা?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে মুসলিম ও মহিলা ভোটারের আধিক্য—তাঁরা ঐতিহাসিকভাবে তৃণমূল সমর্থক। NPCI বা আধার লিংকিংয়ের জটিলতা দেখিয়ে প্রায় ৩৪ লক্ষ নাগরিক ভোট দিতে পারেননি। সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারক বলেছেন, এবার না পারলেই বা কী, পরের বার দেবেন। (সংবিধানের কোন ধারা ভঙ্গ হচ্ছে, তা বিচারকরাই বলবেন।)

SIR-এর প্রথম দফায় নাম বাদ যাওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় (Adjudication) কতজন নাম ফিরে পেয়েছেন—তার কোনো জেলাভিত্তিক বা কেন্দ্রভিত্তিক তথ্য কমিশন জনসম্মুখে আনছে না। আপিলেট ট্রাইব্যুনালের প্রধান বিচারপতি ইস্তফা দিয়ে বলেছেন, ৩৪ লক্ষ নামের স্ক্রুটিনি করতে কমপক্ষে ৪ বছর লাগবে।এবং অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল থেকে যত নাম ক্লিয়ারকরা হয়েছে তার মধ্যে মাত্র ১৩৬জন ভোট দিতে পেড়েছেন।বাকি প্রায় ১৬০০ নাম দ্বিতীয়বারের লিস্টে তোলায় হয়নি বলে অভিযোগ। ১০ইমে সুপ্রিমকোর্টের শুনানিতে আর কিছু বিষয় পরিস্কার হবে আশা করি। কিন্তু ৭০০-র বেশি বিচারক কীভাবে এত অল্পদিনে ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ থেকে ৩৩ লক্ষ মামলার নিষ্পত্তি করলেন—সেটা সুপ্রিম কোর্টই জানতে পারে এবং জানাতে পারেন।

প্রফেসর সরকারের মতে, SIR একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক সংস্কার ছিল না, বরং একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া—নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে ফলাফল নির্দিষ্ট দিকে চালিত করা হয়েছে।

মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: ভীতি ও আত্ম-নির্বাচনী আচরণ

SIR শুধু নাম বাদ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি একটি ব্যাপক মানসিক সন্ত্রাস তৈরি করেছিল। সাধারণ ভোটারের মনে গেঁথে যায়—‘যদি আমি বিরোধী দলকে ভোট দিই, তাহলে আমার নামও পরবর্তী তালিকা থেকে উঠে যেতে পারে।’ এই ভীতিতে অনেক ভোটার আত্ম-নির্বাচনী আচরণ করেছেন, অর্থাৎ নির্বাচনে না গিয়ে বা বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ‘অন্নপূর্ণার ভান্ডার’-এর মতো প্রকল্পে ফর্ম আগাম ফিলাপ করানোর অভিযোগ উঠেছে, যা মহিলা ভোটারদের ঋণী করে তোলার কৌশল বলে অনেকে মনে করেন।সেই ফর্ম আবার কোথাও কোথাও রাস্তায় পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বুথ-স্তরের অনুমানিত বিশ্লেষণ: সন্দেহের বীজ

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরা যাক, মালদহ জেলার একটি বুথে ২০২১ সালে ভোটার ছিল ১২০০ জন, ভোট পড়েছিল ৮৪০ (৭০%)। ২০২৬ সালে SIR-এর মাধ্যমে ওই বুথ থেকে বাদ পড়ল ৩০০ জন ভোটার—তাদের মধ্যে ২৫০ জন ছিলেন সংখ্যালঘু ও নারী। নতুন ভোটার যুক্ত হলো মাত্র ৫০ জন। তাহলে নতুন ভোটার সংখ্যা দাঁড়াল ৯৫০ জন। এবার ওই বুথে ভোট পড়ল ৮৭৫ জন, যা শতাংশে ৯২.১%। প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা আগে ৮৪০ ছিল, এখন ৮৭৫—বৃদ্ধি মাত্র ৩৫। অথচ শতাংশের লাফ ৭০% থেকে ৯২%! গাণিতিকভাবে এটা সম্ভব, কিন্তু প্রশ্ন হলো: বাদ পড়া ৩০০ জনের মধ্যে কে ছিলেন? তাদের ভোটাধিকার কে হরণ করল? কোনআইনেহরণকরলো? এই বুথের ফলাফল যদি ৫০ ভোটের ব্যবধানে কোনো দল জেতে, তবে বাদ পড়া ৩০০ ভোটার যদি বিরোধীদলের সমর্থক হন, তাহলে ফলাফল সম্পূর্ণ উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নির্বাচন কমিশন এই বুথ-স্তরের তথ্য না দিলে সত্য চাপা থাকবে।

আন্তর্জাতিক তুলনা: নিবন্ধিত ভোটার কমার ঘটনা বিরল

যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জার্মানি, ভারতের অন্যান্য রাজ্য—কোথাও পাঁচ বছরের ব্যবধানে মোট ভোটার সংখ্যা ১০% হারে কমেছে বলে রেকর্ড নেই। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া নতুন ভোটারদের কারণে ভোটার সংখ্যা সাধারণত বেড়েই থাকে। পশ্চিমবঙ্গের বিপরীত চিত্রটি তাই আন্তর্জাতিক আদর্শেও ব্যতিক্রম। ২০২১ সালের তুলনায় ৭২ লক্ষ ভোটার নিখোঁজ—এই সংখ্যা অনেক দেশের মোট ভোটার সংখ্যার চেয়েও বড়। এত বড় পরিসংখ্যানগত অনিয়মকে ‘প্রশাসনিক ভুল’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আইনি চ্যালেঞ্জ ও নির্বাচনী পিটিশনের সম্ভাবনা

সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ নির্বাচন কমিশনকে সুপারিন্টেন্ডেন্স, ডিরেকশন ও কন্ট্রোলের ক্ষমতা দেয়, কিন্তু এটি নিরঙ্কুশ নয়। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায় (যেমন, ১৯৭৫ সালের ইন্দিরা গান্ধী বনাম রাজ নারায়ণ মামলা) বলেছে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও বিচারব্যবস্থার হস্তক্ষেপ সম্ভব। ২০২৬ সালের ফলাফলের বিরুদ্ধে নির্বাচনী পিটিশন দায়েরের প্রধান ভিত্তি হতে পারে ‘ভোটার তালিকা থেকে পরিকল্পিত বাদ দেওয়া’। যদি কোনো প্রার্থী প্রমাণ করতে পারেন যে ৪৭টি কেন্দ্রের মধ্যে তার কেন্দ্রে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি, তাহলে আদালত ওই কেন্দ্রের ফলাফল বাতিল করতে পারে। কিন্তু এর জন্য বুথ-স্তরের তথ্য চাই। কমিশন তা না দেওয়া পর্যন্ত আইনি লড়াই অসম্পূর্ণ থাকবে।

সংখ্যালঘু ও নারী ভোটারদের উপর লক্ষ্যস্থিরকরণের প্রমাণের অভাব

বাদ পড়া ভোটারদের ধর্ম, লিঙ্গ ও সামাজিক অবস্থানের তথ্য সর্বজনীন না করার ফলে ঠিক কারা ‘অসংগতি’র শিকার হয়েছেন, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে স্বাধীন সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলির ফিল্ড রিপোর্টে একই চিত্র উঠে এসেছে: মুসলিমপ্রধান এলাকা ও নারী সমষ্টির কেন্দ্রগুলোতে ভোটার ছাঁটাই বেশি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তর দিনাজপুর, মালদা ও মুর্শিদাবাদের কিছু ব্লকে ভোটার সংখ্যা ১৫-২০% কমেছে, যেখানে বিজেপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় ভোটার সংখ্যা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। এই অসম বণ্টন ইঙ্গিত দেয় যে ছাঁটাই ভৌগোলিকভাবে নিরপেক্ষ ছিল না।

উপসংহারের দিকে: গ্রানুলার ডেটা কী ধাঁধা সমাধান করবে?

২০২১ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে ভোটার তালিকায় প্রায় ৭২ লক্ষ মানুষের ভৌগোলিক অবস্থান নিখোঁজ। এই ঘাটতি কি পুরো রাজ্যে সুষম, নাকি নির্দিষ্ট জেলা বা বিধানসভা কেন্দ্রে (যেমন সীমান্ত বা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের আধিক্য) বেশি? বুথ-স্তরের তথ্য ছাড়া বোঝা যাবে না যে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পকেটকে লক্ষ্য করে ছাঁটাই হয়েছে কি না।

প্রদত্ত ভোট বেড়েছে মাত্র ৫ লক্ষ, কিন্তু শতাংশেরহিসেবে৮২% থেকে ৯২% দেখাচ্ছে।প্রতিটি বুথে কাদের নাম কাটা হয়েছে—তাদের বয়স, লিঙ্গ, সামাজিক গোষ্ঠী—এই গ্রানুলার তথ্য পেলে বোঝা যেত কোনো বিশেষ ভোট ব্যাংককে দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে কি না। বিজেপির ৬৫ লক্ষ ভোট বৃদ্ধি ও তৃণমূলের ২৬ লক্ষ ভোট হ্রাসের অঙ্ক মেলাতেও গ্রানুলার ডেটা দরকার। বামফ্রন্ট বা কংগ্রেস আগের শতাংশ ধরে রাখলেও, বিজেপির বাড়তি ৩৯ লক্ষ ভোটের উৎস বুথ-স্তরের হিসাব ছাড়া অজানা।

নির্বাচন কমিশন যদি বুথ-ভিত্তিক ভোটার তালিকা ও ফলাফলের বিস্তারিত ব্রেকআপ জনসম্মুখে না আনে, তবে এই নির্বাচনের গাণিতিক স্বচ্ছতা চিরকাল প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে। বড় সংখ্যার আড়ালে কারচুপি গ্রানুলার তথ্যে ধরা পড়ে যায়।

নতুন সংযোজন: প্রশাসনিক গোপনীয়তা, আইনি ফাঁক ও গ্রানুলার ডেটার অনুপস্থিতি

নির্বাচন কমিশনের নীরবতা ও প্রশ্নের উত্তরহীনতা

নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত কোনো বুথ-স্তরের ভোটার ছাঁটাইয়ের জেলা বা কেন্দ্রভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। স্বাধীন সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস’-এর দাবি, কমিশন কেবল সামগ্রিক সংখ্যা দিয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাচ্ছে। ৭২ লক্ষ ভোটার নিখোঁজের বিষয়টিকে কমিশন ‘প্রশাসনিক আপডেটেশন’ বলে উড়িয়ে দিলেও, আপডেটেশনের সময় সাধারণত ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, এই বিপরীত চিত্রের ব্যাখ্যা নেই। প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ পড়ার খবরে কমিশন বলে, ‘এসবই যৌক্তিক অসংগতি দূরীকরণ’, কিন্তু ‘অসংগতি’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে—অনুপস্থিত ঠিকানা, মৃত ব্যক্তি, নাকি দ্বৈত নিবন্ধন—তা স্পষ্ট করেনি। দ্বৈত নিবন্ধন থাকলে সেই সংখ্যা সাধারণত মোট ভোটারের ১-২%-এর বেশি হয় না। ১০% হারে ভোটার ছাঁটাই পুরোপুরিই ব্যতিক্রমী।

ভোটার ভেরিফায়েড পেপার ট্রেইল (VVPAT) ও মিলানের অমীমাংসিত হিসাব

২০২৬ সালের নির্বাচনে দাবি করা হয়, সর্বত্র ভিভিপিএটি ব্যবহার হয়েছে। প্রশ্ন হলো: কত শতাংশ বুথে ভিভিপিএটি-র কাগজের রশিদের সাথে ইভিএমের ফলাফল মিলানো হয়েছে? ইভিএম-এ ভোট গণনা দ্রুত হয়, কিন্তু ভিভিপিএটি স্লিপ মিলানো সময়সাপেক্ষ। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, সর্বনিম্ন ৫% বুথে (বা প্রতি বিধানসভায় কমপক্ষে একটি বুথ) স্লিপ মিলানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কত শতাংশ বুথে সেটা হয়েছে? কমিশন সেই তথ্য এড়িয়ে গেছে। কলকাতার কিছু কেন্দ্রে ভিভিপিএটি মিলাতে গিয়ে ৪-৫% অসঙ্গতি পাওয়া গেলেওযেতেপারে কিন্তু তা কখনো আনুষ্ঠানিক স্বীকার করেনি কমিশন। যদি মিলানোর হার নগণ্য হয়, তবে ইভিএম কারসাজির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে ৬৫ লক্ষ ভোটের লাফ ও ২৬ লক্ষ ভোটের পতনের মতো অস্বাভাবিক প্রবণতা যাচাইয়ে ভিভিপিএটি ডেটা গ্রানুলার লেভেলে পর্যালোচনা জরুরি।

সোশ্যাল মিডিয়া, গুজব ও ভোটার মনোবিজ্ঞানে ভীতি প্রয়োগ

SIR প্রক্রিয়া চলাকালে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয় যে ‘ইনঅ্যাকটিভ’ বা ‘ডুবিয়াস’ ভোটারদের নাম তুলে দেওয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপে হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজ ছড়ানো হয়: “আপনার আধার না লিঙ্ক করলে ভোট যাবে, আর বিরোধী দলকে ভোট দিলেও যেতে পারে।” পরবর্তীকালে দেখা যায়, মুসলিম ও দলিত অধ্যুষিত এলাকায় ভোটার উপস্থিতি পূর্বের তুলনায় কমেথাকলেওথাকতেপারে। মনোবিদ পিটার সিঙ্গার-এর ‘ফিয়ার ভোটিং’ তত্ত্ব এখানে প্রাসঙ্গিক—যখন ভোটার মনে করেন তাঁদের নাগরিক অধিকার হরণ হতে পারে, তখন তাঁরা হয় ভোট দেন না, অথবা ক্ষমতাসীন দলকেই সমর্থন করেন আত্মরক্ষার্থে। এই ভীতি-প্রয়োগের কোনো গাণিতিক পরিমাপ নেই, তবে বিদ্যমান ভোটার পতনের পরিসংখ্যান এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থার অনুপস্থিতি

অবশ্যই ভারত একটি সার্বভৌম দেশ, তবে বড় নির্বাচনে সাধারণত কমনওয়েলথ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক থাকে। ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। স্বদেশী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো যেমন অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস ও সিটিজেনস ভেরিফিকেশন ফোরাম মাঠে ছিল, কিন্তু তাদের কাজ সীমিত—তাঁরা বুথের বাইরে থেকে শুধু উপস্থিতি রেকর্ড করতে পেরেছিলেন, ভোটার তালিকার গাণিতিক ছাঁটাই যাচাইয়ের কোনো সুযোগ তাঁদের ছিল না। আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া একটি সরকারি সংস্থা (নির্বাচন কমিশন) নিজেই যখন তথ্য গোপন করে, তখন গণস্বচ্ছতা ফাঁকি দেয়।

গাণিতিক মরীচিকা না পরিকল্পিত কারসাজি?

এই বিশ্লেষণ কি ২০২৬-এর ফলাফলকে গাণিতিক মরীচিকা প্রমাণ করে? কেন ভোটার কমেও ভোটদানের হারকে ঐতিহাসিক তকমা দেওয়া হচ্ছে? এগুলো কি শুধু পাটিগণিতের ভুল, নাকি পরিকল্পিত ‘ইলেক্টোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং’? তৃণমূল সূত্রে অভিযোগ, বিজেপি সরকার প্রশাসনিক যন্ত্র ব্যবহার করে ভোটার তালিকা ‘পরিষ্কার’-এর নামে বিরোধী ভোট ব্যাংক কেটেছে। অন্যদিকে, বিজেপি দাবি করে, ভুয়া ও মৃত ভোটার বাদ দেওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ৭২ লক্ষ ‘ভুয়া ভোটার’ কিভাবে হাজির হলো, তার কোনো জবাব নেই।

শেষ পর্যন্ত ধাঁধার সমাধানের পথ: বুথ-স্তরের সব তথ্য জনসমক্ষে আনা, নির্দলীয় পর্যবেক্ষক কমিটি গঠন, এবং ফিরিয়ে দেওয়া ৩৪ লক্ষ ভোটারের প্রকৃত স্ক্রুটিনি। ততদিন পর্যন্ত লেখক অশোক কুমার সরকারের পর্যবেক্ষণই সত্য—এটি স্বচ্ছ নির্বাচন নয়, কাগজে-কলমে ইলেক্টোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং। আদালতে একাধিক নির্বাচনী পিটিশন প্রক্রিয়াধীন আছে। এই পিটিশন নিষ্পত্তির আগে পশ্চিমবঙ্গের জনগণ জানবে না, তাদের ৭২ লক্ষ সহ-নাগরিক ভোটার কোথায় উধাও হয়ে গেলেন।

উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের স্বচ্ছতা ইতিহাসের অমীমাংসিত অধ্যায় থেকে যাবে—আর তাতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না, থাকতে পারে না। শেষ প্রশ্নটি অর্থনীতিবিদ অশোক কুমার সরকারের কণ্ঠে: ‘যে গণতন্ত্রে ভোটার তালিকাই সন্দেহের আঙুল দেখায়, সেই গণতন্ত্র আদৌ গণতন্ত্র থাকে?

 

0 Comments

Post Comment