পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ঘাতক

  • 27 December, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 220 view(s)
  • লিখেছেন : দেবাশিস মজুমদার
এর মধ্যেই বয়সভিত্তিক বেশ কিছু প্রতিযোগিতায় দারুণ ফুটবল খেলার পরিচয় রাখতে শুরু করেছে প্রমিত। স্কুল পর্যায়ের এক প্রতিযোগিতায় হ্যাটট্রিক করায় কাগজেও নাম বেরল প্রমিতের। গর্বে ফুলে উঠল অসিতবাবুর বুক। ছেলে বড় ফুটবলার হবে।

ফুটবলটা বেশ ভালোই খেলে প্রমিত। তার বাবা অসিতও ফুটবল পাগল মানুষ। একসময় নাকি দ্বিতীয় ডিভিশন ক্লাবেও খেলেছেন। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের সন্তান অসিত দাস তার অপুষ্ট শরীর নিয়ে দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে তার ফুটবল খেলাকে টিকিয়ে রাখতে পারেননি। মাঠের চোট-আঘাত আর সংসারের চাপ তাকে খেলার মাঠ থেকে নিয়ে এসে ফেলেছিল কারখানার অন্ধকার ঘরে ভারী এক দৈত্য স্বরূপ মেশিনের সামনে। কিন্তু সেখান থেকেও যে জীবন যাপনের স্বচ্ছলতা অর্জন করতে পেরেছিলেন তা নয়। কিন্তু স্ত্রী আর দুই ছেলেকে নিয়ে কোনওমতে চলে যাচ্ছিল। বড় ছেলে প্রমিত খুব ছোট বয়স থেকেই সম্ভাবনা দেখিয়েছে বড় ফুটবলার হওয়ার। তাই ছেলের স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে নিজের সবটুকু নিঙড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন অসিত দাস। কিন্তু সেই স্বপ্নেও বড়সড় আঘাত নেমে আসল যখন মালিক ঘোষণা করল যে তার কোম্পানি আর্থিক ক্ষতিতে চলছে আর বেশ কিছু কারখানার ইউনিট বসিয়ে দেওয়া হবে সেইসঙ্গে বেশ কিছু কর্মীকে ছাঁটাই করা হবে। আসল গল্প কি সেটা কারও কাছেই অস্পষ্ট ছিল না, তাই মালিকের এই অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শুরু হল আন্দোলন। কারখানার ওই ইউনিটের সব কর্মীরাই নিজেদের ন্যায্য দাবী নিয়ে আন্দোলনে সামিল হলেন। মালিক নিজের আসল রূপ দেখালেন। কারখানার দেওয়ালে একটা আইনি নোটিশ ঝুলিয়ে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করে দিলেন কারখানার দরজা। সবরকম আর্থিক লেনদেন বন্ধ হয়ে গেল কারখানায়। কর্মীরা তাদের ন্যায্য মাইনে থেকে পর্যন্ত বঞ্চিত হলেন।

এর মধ্যেও প্রমিতের খেলা বন্ধ হয়নি। অসিতবাবু আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন বড় ছেলের খেলা যাতে টিকে থাকে। এই নিয়ে স্ত্রী রুমার সঙ্গে একাধিকবার ঝগড়া অশান্তি হয়েছে তার। প্রমিতের কাছেও ফুটবলই সব। পড়াশুনায় প্রমিতের একদম মন নেই। যে ক্লাবে সে প্র্যাকটিস করে সেখানকার খরচ চালাতে লোকের কাছে ধার পর্যন্ত করেছেন অসিতবাবু। পরে অবশ্য প্রমিতের ফুটবল প্রতিভা দেখে তার কোচিং ফি মকুব করেছে ক্লাব। এর পাশাপাশি ক্লাবের তরফে একজোড়া বুটও দেওয়া হয়েছে প্রমিতকে কিন্তু একজন ছেলেকে ভালো ফুটবলার তৈরি করার পক্ষে সেটা যথেষ্ঠ নয়। প্রমিত যাতে ভালো খাওয়া-দাওয়া পায় সেদিকে নজর দিতে গিয়ে নিজের একটু ভালোমন্দ খাওয়া ওষুধ সব বন্ধ করে দিয়েছেন অসিতবাবু। যতদিন না কারখানার সমস্যা মিটছে ততদিন নানারকমের ছোটখাটো কাজও করে যাচ্ছেন তিনি। স্ত্রী রুমাও সেলাইয়ের কাজ শুরু করেছেন। এরই ফাঁকে ছোট ছেলেটাকেও দেখতে হয়। সংসারের অন্যান্য কাজ তো আছেই। পাশাপাশি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর আর্থিক চিন্তা বয়সের চেয়েও অনেক বেশি বুড়িয়ে দিয়েছে দাস দম্পতিকে। তাদের চেহারার বাহ্যিক শ্রী-এর আর বিন্দুমাত্র কিছু অবশিষ্ট নেই। তাও ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়েই যতটা পারছেন ত্যাগ স্বীকার করে চালানোর চেষ্টা করছেন অসিতবাবু আর রুমাদেবী।

এর মধ্যেই বয়সভিত্তিক বেশ কিছু প্রতিযোগিতায় দারুণ ফুটবল খেলার পরিচয় রাখতে শুরু করেছে প্রমিত। স্কুল পর্যায়ের এক প্রতিযোগিতায় হ্যাটট্রিক করায় কাগজেও নাম বেরল প্রমিতের। গর্বে ফুলে উঠল অসিতবাবুর বুক। ছেলে বড় ফুটবলার হবে। খেলে অনেক টাকা রোজগার করবে। সব দুঃখ কষ্ট মুছে যাবে, স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন অসিতবাবু। প্রতিদিন রাতেই বিছানায় শোয়ার পর রুমাদেবীকে তিনি বলেন, ‘দেখ আমাদের বড়খোকা একদিন অনেক বড় ফুটবলার হবে। আমাদের দুঃখের দিন আর থাকবে না’।

রুমাদেবী চিন্তামগ্ন কন্ঠে বলেন, ‘সে তো পরের কথা। এখন এই অবস্থায় চলে কি করে? ছেলেদুটোর পড়াশুনাও তো আছে। তোমারও তো শরীর ভালো না। কত করে বলি একটু ডাক্তার দেখাও, তা তুমি কথা কানে তুললে তো। খালি ফুটবল আর ফুটবল। এদিকে সংসার চলে কি করে সেটাও তো একটু দেখ’।

অসিতবাবু উত্তর দেন, ‘ভোলাদার দোকানে কিছু মাল এনে দিতে হবে বড়বাজার থেকে। হাজারখানেক টাকা দেবে বলেছে। ওদিকে ঘুনুদার বাড়িতে অনুষ্ঠান আছে। লিটনকে বলে রেখছি। ডেকরেটার্সের কাজের জন্য লোক লাগলে আমাকে যেন বলে। ওখান থেকেও আরও কিছু টাকা পেতে পারি। শুধু একটাই চিন্তা, অনেকের কাছেই বেশ কিছু টাকা ধার হয়েছে। কেউ কেউ তো তাগাদা দিতেও শুরু করেছে। এইসময় কারখানাটা যদি খুলত তাহলে আর চিন্তা থাকত না’।

রুমাদেবী স্বামীর বুকে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন, ‘আমি তো দিনরাত ঠাকুরকে ডাকছি। দেখ সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে আমার চিন্তা হয় তোমাকে নিয়ে। আয়না দেখা তো ছেড়েই দিয়েছ। গাধা খাটুনি খাটতে খাটতে চেহারার যা হাল করেছ, আমি আর চোখে দেখতে পারি না’।

এইসব কথোপকথনের মধ্যেই দুজনের ক্লান্ত শরীর কখন যেন ঘুমের গ্রাসে চলে যায়।

সকাল হতেই শুরু হয় জীবন সংগ্রামের নতুন অধ্যায়। একদিন-প্রতিদিন এভাবেই চলে।

এরই মাঝে দুটো সুখবর এল। প্রমিত বয়সভিত্তিক বাংলা স্কুল দলের ট্রায়ালে দলের ট্রায়ালে ডাক পেয়েছে। ক্লাবে এই নিয়ে সবাই খুব আশাবাদী। স্কুলের কর্তৃপক্ষও খুব খুশি। হেডমাষ্টারমশাই নিজে ডেকে অভিনন্দন জানালেন অসিতবাবুকে। প্রমিত ট্রায়ালে নিজেকে প্রমাণ করে বাংলার স্কুল দলে জায়গা করতে পারলে স্কুলের তরফ থেকে একটা আর্থিক সাহায্যও তাকে দেওয়া হবে বলে স্কুলের হেডমাষ্টারমশাই আর পরিচালন সমিতির সভাপতি জানালেন। ক্লাবও জানালো প্রমিত এক্ষেত্রে সাফল্য পেলেই তারাও কিছু আর্থিক সাহায্য দেবে।

ওদিকে অসিতবাবুর এক সহকর্মী জানালেন আদালতে কেস তাদের পক্ষে মোড় নিয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই হয়ত মালিক বাধ্য হবেন ব্যাঙ্কের ঋণ মেটাতে আবার কারখানা খুলতে। আর কারও যাতে কাজ না যায় সেইজন্য তাদের কর্মী ইউনিয়ন মরিয়া চেষ্টা করছে। তাই কারখানার সামনে রোজ তারা জড় হবেন একটা সময় যাতে মালিক বাধ্য হয় তাদের দাবি মেনে নিতে।

এরই মধ্যে ক্লাবের তরফ থেকে একটা রাজ্যভিত্তিক বয়সভিত্তিক ফুটবল প্রতিযোগিতা খেলতে শিলিগুড়ি গেল প্রমিত। খরচ সব ক্লাবই দেবে। যাবার আগে প্রমিত শুধু বলল, ‘বাবা জিতে আসতে পারলে তুমি কিন্তু আমাকে একটা ভালো বুট কিনে দেবে’।

একগাল হেসে অসিতবাবু বললেন, ‘যদি তোর গোলে দল যেতে তবে অবশ্যই দেবো। আমাদের কারখানা খুলতে আর বেশি দেরি নেই। মালিক বাধ্য হবে আমাদের বকেয়া সব পাওনা মেটাতে। আমাদের আর কোনও দুঃখ থাকবে না’।

শিলিগুড়িতে অসাধারণ ফুটবল খেলল প্রমিত। ফাইনালে তার করা জোড়া গোলেই স্থানীয় ক্লাবকে হারিয়ে ট্রফি জিতল তার দল। হইহই করে আনন্দ করতে করতে বাড়ি ফিরে এল প্রমিত। কিন্তু বাড়ির গেটের কাছে এসেই যে পরিবেশ দেখল তাতে সব আনন্দ মুহুর্তে উড়ে গেল প্রমিতের। তাদের ছোট্ট বাড়ির অপোক্ত গেট দিয়ে ঢুকে যে দৃশ্য দেখল প্রমিত তাতে তার বুকের ভেতর থেকে কে যেন তার প্রাণসত্ত্বাকে কেড়ে নিল বলে মনে হল। তাদের ছোট উঠোন পাড়ার লোকে ভরতি আর উঠোনের ঠিক মাঝখানে মাথায় চন্দন লাগানো অবস্থায় চোখ বুঁজে শুয়ে আছেন তার বাবা অসিত। শরীরে যে প্রাণ নেই সেটা আর বলে দিতে হয় না। বাবার বুকের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ে কাঁদছেন মা রুমাদেবী। একটু দূরে ছোটভাই সুমিত ভ্যাবাচ্যাকা মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

পাথরের মত দাঁড়িয়ে গেল প্রমিত। পাশের বাড়ির বলাইকাকা এগিয়ে এসে বললেন, ‘সকাল থেকে খুব খুশি ছিলেন তোমার বাবা। আজকেই নাকি কারখানা খোলার কথা ছিল। কিন্তু কারখানার গেটে গিয়ে জানতে পারেন ব্যাঙ্কের থেকে মোটা টাকা ঋণ নিয়ে ঋণ খেলাপি মালিক দেশ ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। কারখানা খোলার আর কোনও আশা নেই। এই কথা শোনার পর স্পটেই হার্ট এটাক হয়ে যায় অসিতদার। আর সময় দেননি। সবাই হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে। আমরা ভাবছিলাম স্টেশনে লোক পাঠাবো তা তোমাদের ক্লাবের একজন বললেন কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমরা ফিরছ তাই তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম বাবা। তুমি বড় ছেলে, যা করার এখন তোমাকেই করতে হবে’।

সবকথা শুনে হাতের বল আর কাঁধের কিট-ব্যাগটা ঠাস করে মাটিতে পড়ে গেল প্রমিতের।

বিষণ্ণ গোধূলির রাঙা পশ্চিম আকাশকে পেছনে রেখে বাবার চিতায় আগুন দিতে দিতে প্রমিত সেই অদৃশ্য ঘাতকের একটা কাল্পনিক মুখমন্ডল মনে মনে ভাবার চেষ্টা করল যে তার আর তার বাবার যাবতীয় স্বপ্নকে তার বাবার এই নশ্বর দেহটার সাথে সাথেই এই একই চিতার আগুনে ছাই করে ফেলল।

0 Comments

Post Comment