৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি মহানাদ থেকে পদচ্যুত হন। একসময় এই সকল অঞ্চল ছিল বজ্রযান বৌদ্ধ তন্ত্রের স্থান। পরে, শৈব ও শাক্ত সম্প্রদায়ের নির্দেশে বৌদ্ধ প্রভাব এখানে ধ্বংস হয়। উত্থান ঘটে নাথ ধর্মের। তাদের উপাধি ছিল নাথ।
নাথ ধর্মের গোরক্ষনাথ মহানাদে একটি শৈবমঠ স্থাপন করেন। নাথ ধর্মে যোগীরা হলেন শৈব। মহানাদে মঠের সীমায় একটি পুষ্করিণীর নাম বশিষ্ঠ গঙ্গা। সেখান থেকেই উদ্ধার হয় একপদ ভৈরবের মূর্তি। যা বঙ্গে বিরল।
বাংলায় বৌদ্ধ প্রভাব ধ্বংস শুরু হয় ৬০০ খ্রিস্টাব্দে। বৌদ্ধ ধর্মের বিলুপ্ত সাধন চলতে থাকে। এরপর শৈব শাসক শশাঙ্কর সময় বাংলায় একরকম বৌদ্ধ ধর্মসংকট শুরু হয়।
বহুজন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এদিক ওদিক ছড়িয়ে যান। নেপালে গিয়ে আশ্রয় নেয় অনেকে। তাই প্রাচীন বাংলা ভাষার এক নিদর্শন চর্যাপদ নেপালে পাওয়া যায়। আমরা সকলেই জানি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় নেপালের রাজদরবার থেকে চর্যাপদ পুঁথি আবিষ্কার করে এনেছিলেন।
মহানাদের বৃহৎ জটেশ্বর শৈব মন্দিরটি নবম শতাব্দীতে তৈরি। এই পাল যুগেই এখানকার শিব ও আরো কয়েকটি মন্দির নির্মিত হয়। পরে একাধিকবার সংস্কার হয়েছে। মহানাদের মঠে শিব মন্দিরের স্থানে ধর্মঠাকুর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। ঐতিহাসিকরা দাবি করেন বৌদ্ধযুগ অবসানের পর বৌদ্ধ দেবতা রাঢ় অঞ্চলের লোকদেবতা ধর্মঠাকুরে রূপান্তরিত হয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও সুধীরকুমার মিত্র এই ধারণাটি ঠিক মনে করেছেন।
বৌদ্ধ দর্শনের বিবর্তনে মৎস্যেন্দ্রনাথ বা মীননাথ যোগীর থেকে নাথ ধর্মের উদ্ভব। জনশ্রুতি, বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ও কবি লুইপাদ ও কানুপা এই অঞ্চলেই একসময় কিছুকাল বসবাস করেন। গোরক্ষনাথের সঙ্গে লুইপার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি দোহা ও চারখানি বজ্রযান গ্রন্থ রচনা করেন। তিব্বতি সাহিত্যেও এনাদের নাম পাওয়া যায়। তাই দুই ধর্মের মধ্যে অনেকে মিল খুঁজে পান। যদিও বৌদ্ধ ধর্ম ও নাথ ধর্ম দুটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধর্ম।

(প্রথম চিত্র) মহানাদ থেকে প্রাপ্ত গঙ্গা মূর্তি। (দ্বিতীয় চিত্র) পাল যুগের বিষ্ণু মূর্তি। (তৃতীয় চিত্র) নন্দীর মূর্তি।
পুরাতত্ত্ব চর্চায় ‘তীর্থরাজ’ ত্রিবেণী, সপ্তগ্রাম ও মহানাদ গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। সরস্বতী নদীর পাড় ঘেঁষে সপ্তগ্রাম ছিল বাংলার প্রধান নৌবন্দর ছিল। সপ্তগ্রামের পাশেই যুক্তবেণী ত্রিবেনী। আর মহানাদে দেবদেবীর মন্দির নির্মাণ হয়।
জলের ধারার পাশে সূক্ষ্ম কাজে নদীমাতৃক সভ্যতার ধারক গঙ্গা দেবীর প্রশান্ত ভঙ্গিমায় এক পাথরের মূর্তি মহানাদ থেকে পাওয়া যায়। এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি দিল্লীর ন্যাশনাল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।
১৯৩৪ ও ১৯৩৫ সালে মহানাদে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে খোঁড়াখুঁড়ি চলে। খননের পর তিন চারটি প্রাচীন স্তরের হদিস পাওয়া গেছে। মিলেছে পাল যুগের চতুর্ভুজ বিষ্ণু মূর্তি, গঙ্গা মূর্তি, নানা প্রস্তর মূর্তি, গুপ্ত যুগের পাত্র, কুষাণ যুগের মুদ্রা, রাজা শশাঙ্কের আমলের মুদ্রা, আকবরের স্বর্ণমুদ্রা, মুসলমান যুগের ইঁট প্রভৃতি নানা ধরনের প্রাচীন প্রত্ন নিদর্শন। এগুলো প্রাচীন বাংলার ধূসর সময়ের স্মৃতি বহন করছে।
তথ্যসূত্র:
ডঃ সুকুমার সেন
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
সুধীরকুমার মিত্র