পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মাদ্রাসা: সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর নাকি ইসলামোফোবিয়ার বিষবাষ্প?

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 204 view(s)
  • লিখেছেন : মির্জা মোসারফ হোসেন
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রভাব বিস্তারের কৌশলের একটি বড় অস্ত্র হল হিন্দু-মুসলিম বিভাজনকে তীক্ষ্ণ ও প্রাত্যহিক করে তোলা। এর জন্য প্রয়োজন একটি ‘অন্যের’ বা ‘শত্রুর’ ছবি তৈরি, যাকে ভয় ও ঘৃণা দেখিয়ে একটি নির্বাচনী ব্লক গঠন করা যায়। মুসলিম সম্প্রদায় ও তাদের প্রতিষ্ঠান, যেমন মাদ্রাসা, সেই লক্ষ্যবস্তুতেই পরিণত হয়েছে। মাদ্রাসা নিয়ে ভুল তথ্য ও ভীতি ছড়ানো সরাসরি ইসলামোফোবিয়ার বীজ বপনের কাজ করে, যা বিজেপির ভোটব্যাংক রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

রাজনীতির ময়দানে যখন যুক্তি ও তথ্যের জায়গা দখল করে কুযুক্তি ও বিভ্রান্তির বিষবাষ্প, তখন জনগণের সচেতন বিবেচনা বোধই শেষ ভরসা। সম্প্রতি এক বিজেপি নেত্রী পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা শিক্ষা এবং মুসলিম শিশুদের সম্পর্কে অগভীর, বিভ্রান্তিকর ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মন্তব্য করেছেন। এই ধরণের মন্তব্য কেবল রাজনৈতিক ফায়দা লোটার প্রচেষ্টা নয়। একটি সুপরিকল্পিত ইসলামোফোবিয়ার বহিঃপ্রকাশ, যার লক্ষ্য শিক্ষা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কৌশলগতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো। প্রসঙ্গত, ‘মাদ্রাসা থেকে সব জঙ্গি বেরোচ্ছে” মন্তব্যও রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মুখেও আগে শোনা গেছে।  কিন্তু কেন এই ধারণা এবং এই ইসলামোফোবিক বিদ্বেষের চাষ এখনো বাংলার মাটিতে হচ্ছে ? উক্ত নিবন্ধে এই ধারণার একটু শিকড়ে গিয়ে আলোচনার ও বোঝার চেষ্টা করা হবে ।  


মাদ্রাসা সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর - ঐতিহাসিক সূত্র


মাদ্রসাগুলি কিভাবে সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর হল-এই প্রশ্নের উত্তর বিংশশতকের পাঁচ দশক থেকে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে চলতে থাকা ঠাণ্ডা যুদ্ধের মধ্যে লুকিয়ে, বিশেষকরে ১৯৭৯ সালের আফগান যুদ্ধে, যার ফলস্বরুপ একদশকের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। যদিও যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ছিল আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে, বিশ্বের দুই মহাশক্তির করাতলে এই লড়াই আন্তর্জাতিক পর্যায়ের লড়াই হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল।
১৯৭৯ সালের আগে অবধি আমেরিকা-রাশিয়ার ঠাণ্ডা যুদ্ধ ছিল মুলত কম্যুনিস্ট-অ-কম্যুনিস্ট বিবাদের জেরে, যেমন ভিয়েতনামের যুদ্ধ যা কম্যুনিস্ট উত্তর ভিয়েতনামের কাছে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নামেই উপস্থাপিত হয়েছিল। ১৯৭৯ এর আফগান যুদ্ধ কিন্তু ছিল সম্পূর্ণ অন্য আঙ্গিকে–‘মুসলিম উম্মা’ বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। আর পৃথিবীজুড়ে মুসলিমদের ধর্মীয় ভাবাবেগের সুড়সুড়ি দিয়ে একত্রিত করার কাজটি করেছিল আমেরিকা এবং তার সাথে সাথে আফগানিস্থানের ‘মুজাহিদদের’ অর্থনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক সহায়তা দান করেছিল।
 আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জিম্ম্যি কার্টারের শাসনকালে আমেরিকার  সাথে আফগানিস্থানের কোন সরাসরি যোগাযোগ ছিলনা। আমেরিকা পাকিস্থানের মাধ্যমে গোপনে অর্থনৈতিক, সামরিক,ও নতুন নতুন অস্ত্রের সরবরাহ করতো। কিন্তু ১৯৮১ সালে কার্টারের পর রেগান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলে আমেরিকার ভুমিকা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। রেগান এই যুদ্ধকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবেই পরিগণিত করেন এবং প্রকৃত অর্থেই এই আফগান জিহাদ আদতে আমেরিকান জিহাদে পরিণত হয়। একটি হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র ১৯৮৭ অর্থবছরেই মুজাহিদীনদের গোপনে আমেরিকান সামরিক সহায়তার পরিমাণ ছিল ৬৬০ মিলিয়ন ডলার।প্রসঙ্গত, রেগান আফগান মুজাহিদ্দিনদের হোয়াইট হাউসে দেখিয়ে আমেরিকার ভিত্তিপত্তনকারি পূর্বপুরুষদের সঙ্গে নৈতিকভাবে সমতুল্য হিসেবে তুলনা করেছিলেন এবং এই সময়েই ওসামা বিন লাদেনের উত্থান ঘটে।     সোভিয়েত ইউনিয়নকে আফগানিস্থানের মাটি থেকে তাড়াতে, আফগান সশস্ত্র বাহিনী তৈরি করতে, তাদের প্রশিক্ষণ দিতে পাকিস্তানের আইএসআই-এর সাথে  সিআইএ হাত মিলিয়ে পাকিস্থান-আফগানিস্থান বর্ডারস্থিত মাদ্রাসাগুলিকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। তবে প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং কিছু উচ্চস্তরের মুজাহিদীন নিয়োগের জন্য প্রশিক্ষণ, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্পগুলোতে সিআইএ পরিচালিত হতো। লক্ষ্য ছিল ইসলামের শিক্ষার সাথে গেরিলা প্রশিক্ষণকে একীভূত করে "ইসলামী গেরিলা" সৃষ্টি করা। ওইসব মাদ্রাসার ছাত্র যাদের অস্তিত্ব পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতিকে হাওয়া যোগানোর কাজ করে।  আমেরিকা এই তালিবানদেরই পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক শত্রু, তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর এবং  ৯/১১ এর পর   এদেরকেই জঙ্গি তকমা দেয়। প্রসঙ্গত, উক্ত ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিবর্গের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষা লাভ যৎসামান্য, বরং পশ্চিমী বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেই তথ্যও Peter Bergen and Swati Pandey লিখিত ‘ দ্য মাদ্রাসা স্কেপগোট’ রিপোর্টে স্পষ্ট।
আমেরিকার পক্ষে ধর্মীয় ভাবাবেগকে সুড়সুড়ি দিয়ে, মুসলিম ভাতৃত্ববোধকে অস্ত্র করে এই যুদ্ধকে ইসলামের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধ হিসেবে দেখানোর মাধ্যমে আপামর বিশ্বের মুসলিমদের একত্রিত করা কঠিন কাজ ছিল না। অপরপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত জিহাদী কার্যক্রম ইসলামী মুক্তির অবকাঠামো গড়ার দাবি করলেও বাস্তবে এটি একটি "সন্ত্রাসের অবকাঠামো" তৈরি করেছিল, যা ইসলামী নেটওয়ার্ক ও সম্প্রদায়ে প্রবেশের জন্য ইসলামী প্রতীককে ব্যবহার করে।
শেষমেশ, যুদ্ধে প্রতিহত হওয়ার দরুন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্থান ছাড়তে বাধ্য হয় এবং এর মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। এবং ঠাণ্ডাযুদ্ধেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। এদের এহেন পরাজয়ে, মূলত আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকেই এবং পশ্চিমী মিডিয়ার করাতলেই হইত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী উক্ত মন্তব্য করেছিলেন। কারণস্বরুপ বলা যেতে পারে, এই রাজ্যের মাদ্রাসাগুলো নিয়ে একটা গবেষণা। ২০০৯ সালে প্রকাশিত  নীলাঞ্জনা সেনগুপ্তার "রিডিং উইথ আল্লাহ" বইটির সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান ও আর্কাইভাল তথ্যের উপর ভিত্তি করে রচিত। বইটি মূলত পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে মাদ্রাসাগুলোর উদ্ভব ও বিকাশ এবং স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর তাদের নানাবিধ প্রভাবের ইতিহাস অনুসরণ করে। বইটি এই প্রসঙ্গে পরিচয়, 'ধর্মনিরপেক্ষ' শিক্ষা এবং লিঙ্গ-বিষয়ক প্রশ্নগুলি তুলে ধরে, পাশাপাশি মাদ্রাসাকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রচলিত ধারণাগুলো (মিথ) নিয়ে আলোচনা করে। কেন মুসলিম পরিবারগুলো তাদের ছেলেদের ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার জন্য সরকারি স্কুলে পাঠায়, অন্যদিকে মেয়েদেরকে মাদ্রাসায় প্রেরণ করে- এই তথ্যও উঠে আসে।


ইসলামোফোবিয়া বনাম যুক্তিপূর্ণ সমালোচনা


একটি গণতান্ত্রিক সমাজে যে কোনও শিক্ষা ব্যবস্থা, মাদ্রাসা হোক বা অন্য কোনও ধর্মীয় ঐতিহ্য-ভিত্তিক শিক্ষা হোক, তার গুণগত মান, আধুনিকতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা জরুরি। এই আলোচনার লক্ষ্য হওয়া উচিত ঐ শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা ও তাকে সময়ের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। কিন্তু ওই নেত্রী ও তাঁর মতাদর্শের লোকজনের বক্তব্যে সেই যুক্তিপূর্ণ সমালোচনার ছিটেফোঁটাও নেই। তাদের বক্তব্যে রয়েছে কেবল ইসলামোফোবিয়ার বিষ, ভিত্তিহীন সন্ত্রাসবাদের দোহাই এবং পুরো একটি শিক্ষা ব্যবস্থা ও তার লক্ষাধিক শিক্ষার্থী-শিক্ষককে সন্দেহের চোখে দেখার প্রচারণা। তাদের ‘সমালোচনা’ একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ভয় ও বিদ্বেষ ছড়ানোর রাজনৈতিক হাতিয়ার। ভারতের বহুসংস্কৃতির সমন্বয়ের ইতিহাসের মতোই, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের তালিকাতেও রয়েছে বহুত্বের চিত্র। বহু খ্যাতনামা হিন্দু ব্যক্তিত্ব মাদ্রাসা বা এই ধাঁচের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে জ্ঞানার্জন করেছিলেন। রাজা রামমোহন রায়, যিনি ভারতীয় নবজাগরণের পুরোধা, ইসলামিক দর্শন, সুফিবাদ ও ফারসি সাহিত্যে তাঁর গভীর জ্ঞান মাদ্রাসা-ধাঁচের শিক্ষারই ফল ছিল। কিন্তু এই ধরনের বক্তব্য এই ঐতিহাসিক সত্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এক ঝাঁক মিথ্যা ও কুসংস্কারে ভরা ইসলামোফোবিক বয়ান চাপিয়ে দিতে চায়।
পরিসংখ্যানের আলোকে বাস্তবতা: ইসলামোফোবিয়ার মিথ্যাচার উন্মোচন
 ইসলামোফোবিক প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দু এই ধারণা যে মুসলিম পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের শুধু মাদ্রাসায়ই ভর্তি করায়। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। পশ্চিমবঙ্গে সরকারি মাদ্রাসাগুলো পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনস্থ। রাজ্য সরকারেরই পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন স্বাধীন শিক্ষা সমীক্ষায় বারবার দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম শিশুদের একটি বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই সাধারণ স্কুলে পড়াশোনা করে। মোট মুসলিম শিক্ষার্থীর মধ্যে মাদ্রাসায় ভর্তির হার আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি নয়। অর্থাৎ, ৮৫ শতাংশেরও বেশি মুসলিম শিশু রাজ্যের সাধারণ বাংলা, ইংরেজি মাধ্যম বা হিন্দি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষাগ্রহণ করছে। তাহলে, এই সামান্য শতাংশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে এমন অতিরঞ্জিত ও বিভীষিকাময় ইসলামোফোবিক প্রচারণার অর্থ কী? এর একটাই অর্থ – ইসলামোফোবিয়ার মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়কে ‘অন্য’, ‘সন্দেহের চোখে দেখার যোগ্য’ এবং ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার রাজনৈতিক প্রজেক্ট। যেখানে মুসলিম অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা বানানোর স্বপ্ন দেখেন এবং সেই লক্ষ্যেই সাধারণ স্কুলে ভর্তি করান, সেখানে তাদের সম্প্রদায়গত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উপর এই আক্রমণ মূলত ইসলামোফোবিয়ার কারণে তাদের নাগরিক অধিকার ও সংস্কৃতির উপরই আক্রমণ।
ইসলামোফোবিক বয়ানটি দাবি করে মাদ্রাসায় শুধু কুরআন-হাদিস কিংবা ধর্মীয় শিক্ষাই দেওয়া হয়। এই ধারণা পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ইসলামোফোবিয়ার উসকানি মাত্র। পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনস্থ মাদ্রাসাগুলোর পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞান (পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিদ্যা), গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, সমাজবিজ্ঞান, কম্পিউটার শিক্ষা – সবই রয়েছে। এই বিষয়গুলো মাধ্যমিক (মাধ্যমিক মাদ্রাসা পরীক্ষা) এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সাধারণ স্কুলের সিলেবাসেরই সমান্তরাল। এখান থেকে পাস করে একজন ছাত্র-ছাত্রী সরাসরি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করতে পারে, প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসতে পারে, বা সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। তাহলে, ‘মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন’ করার ইসলামোফোবিক অভিযোগটাই মিথ্যে। বরং, মাদ্রাসাগুলো একটি বিশেষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে থেকেও শিক্ষার্থীদের আধুনিক শিক্ষায় সম্পূর্ণ সক্ষম করে গড়ে তুলছে। উল্টোদিকে, যে শিশুটি অর্থনৈতিক বা সামাজিক কারণে হয়তো দূরবর্তী কোন সাধারণ স্কুলে যেতে পারছে না, তার জন্য স্থানীয় মাদ্রাসাটিই হয়ে উঠছে শিক্ষার আলো পাওয়ার প্রধান কেন্দ্র। এটাকে বিচ্ছিন্নতা বলা নয়, এটা তো ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যম!
 রাজ্যের মাদ্রাসায় হিন্দু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ইসলামোফোবিয়ার মুখোশ উন্মোচন করে । যে প্রতিষ্ঠানকে ‘সাম্প্রদায়িক’ ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে,  পশ্চিমবঙ্গের সরকারি মাদ্রাসাগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু শিক্ষক-শিক্ষিকা কর্মরত রয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদন ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি দশ জন মাদ্রাসা শিক্ষকের মধ্যে দুই থেকে তিন জন হিন্দু সম্প্রদায়ের। তারা বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, বিজ্ঞান, গণিত ইত্যাদি বিষয় পড়ান। তারা শুধু পড়ানই না, সেই পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন। আরও অবাক করার বিষয় হল শিক্ষার্থী তালিকা। বেশ কিছু মাদ্রাসায়, বিশেষ করে যেগুলো প্রত্যন্ত বা গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত, সেখানে দরিদ্র হিন্দু পরিবারগুলিও তাদের সন্তানদের ভর্তি করান। কারণ, এই মাদ্রাসাগুলো অনেকক্ষেত্রেই সেই এলাকার অন্যতম সুশৃঙ্খল ও বৃত্তি/আর্থিক সহায়তার সুযোগসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে, এই মাদ্রাসাগুলোতে হিন্দু শিক্ষার্থীর হারও নগন্য নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে তা ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, বর্ধমানের ওড়গ্রাম চতুষ্পল্লী হাই মাদ্রাসার ৬৫ শতাংশ পড়ুরায় অমুসলিম। তারা সেখানে বহাল তবিয়তে পড়াশোনা করছে। এই চিত্রটি কি ইসলামোফোবিক প্রচারণার ‘সন্ত্রাসের আখড়া’ বা ‘সম্প্রদায়গত বিচ্ছিন্নতা’র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?


তাহলে প্রশ্ন জাগে, এই সকল সহজলভ্য ও পরিষ্কার বাস্তবতা এবং পরিসংখ্যান উপেক্ষা করে কেন এমন মিথ্যা ও বিদ্বেষপূর্ণ ইসলামোফোবিক প্রচারণা? এর উত্তর রাজনীতির অন্ধকূপে নিহিত। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রভাব বিস্তারের কৌশলের একটি বড় অস্ত্র হল হিন্দু-মুসলিম বিভাজনকে তীক্ষ্ণ ও প্রাত্যহিক করে তোলা। এর জন্য প্রয়োজন একটি ‘অন্যের’ বা ‘শত্রুর’ ছবি তৈরি, যাকে ভয় ও ঘৃণা দেখিয়ে একটি নির্বাচনী ব্লক গঠন করা যায়। মুসলিম সম্প্রদায় ও তাদের প্রতিষ্ঠান, যেমন মাদ্রাসা, সেই লক্ষ্যবস্তুতেই পরিণত হয়েছে। মাদ্রাসা নিয়ে ভুল তথ্য ও ভীতি ছড়ানো সরাসরি ইসলামোফোবিয়ার বীজ বপনের কাজ করে, যা বিজেপির ভোটব্যাংক রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সম্পূর্ণভাবে ইসলামোফোবিয়ার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বিভাজনমূলক রাজনীতির একটি অশুভ খেলা। ওই নেত্রীর   বক্তব্য সেই খেলারই একটি চাল মাত্র।


বাস্তবতার অন্য চিত্র


এই প্রেক্ষাপটেই আরেকটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, যা মাদ্রাসা আধুনিকীকরণের নামে চলছে ইসলামোফোবিয়ার আরেকটি সুপরিকল্পিত প্রকাশ। পূর্বতন সরকার সাচার কমিটির সুপারিশ মোতাবেক মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকিকরণের উদ্দেশ্যে ইংরেজি মিডিয়াম মাদ্রাসা স্থাপনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। বর্তমান সরকারও সেই উদ্দেশ্যে সম্মতি দিয়ে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করে। কিন্তু এই নিয়োগে একটি বিভৎস বৈষম্যের চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২০ সালে Public Service Commission-এর নিয়োগে কাঙ্ক্ষিত ইসলামিক সংস্কৃতি সম্পর্কিত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও ভূগোল বিষয়ে ১২টি আসনের মধ্যে একটিতেও মুসলমান প্রার্থী চাকরি পাননি, অথচ ১৪ জন মুসলমান প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষায় সম্মুখীন হয়েছিলেন। ইংরেজি বিষয়ে ১২টি আসনের মধ্যে মাত্র ৫ জন মুসলমান তালিকাভুক্ত হন। আরবি বিষয়ে নিয়োগ পদ্ধতি আরও বেশি শোচনীয় ও সন্দেহজনক। ৬০০ থেকে ৮০০ জন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষা দিলে মাত্র ১২ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয় এবং চূড়ান্ত মেধাতালিকায় মাত্র একজনের নাম আসে। এই একমাত্র নির্বাচিত প্রার্থীকেও নিয়োগপত্র সরাসরি ওয়েবসাইটে না দেখিয়ে ব্যক্তিগত মেইলের মাধ্যমে পাঠানো হয় এবং তাড়াহুড়ো করে দস্তাবেজ জমা দিতে বলা হয়, যা কোনো স্বচ্ছ ও নিয়মমাফিক প্রক্রিয়া নয়। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এতগুলো যোগ্য প্রার্থীর মধ্য থেকে কেন এভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে পিছনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে? আধুনিকীকরণের নামে কি আসলে মাদ্রাসার বহুত্ববাদী ও স্বতন্ত্র চরিত্রকে ইসলামোফোবিয়ার মাধ্যমে ধ্বংস করে তাকে আরেকটি সরকারি দপ্তরে পরিণত করার ষড়যন্ত্র চলছে? শিক্ষক নিয়োগের এই বিভৎস বৈষম্য প্রমাণ করে যে, মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি অঙ্গ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ ও ইসলামোফোবিয়ার মাধ্যমে অন্তর্ঘাতের চেষ্টা চলছে।
পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসাগুলোর ইতিহাস ও অবদানকে ইসলামোফোবিয়ার আড়ালে খাটো করে দেখারও কোন উপায় নেই। এ রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা নবজাগরণের যুগ থেকেই আধুনিক চেতনার সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয়ের চেষ্টা করেছে। স্যার সৈয়দ আহমদ খান, নবাব আব্দুল লতিফের মত যারা আধুনিক শিক্ষার পক্ষপাতী ছিলেন, তাদের চিন্তাধারারও প্রভাব রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে, মাদ্রাসাগুলোকে আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে, কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করেছে, বিজ্ঞান শিক্ষার উপর জোর দিয়েছে। মাদ্রাসা থেকে পাস করে বহু শিক্ষার্থী আজ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, সাহিত্যিক ও শিল্পী হিসেবে দেশ ও রাজ্যে অবদান রাখছেন। তাদের এই সাফল্যকে অস্বীকার করা বা ইসলামোফোবিয়ার কারণে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বদনাম করা, রাজ্যের শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের স্বার্থের পরিপন্থী।
রাজ্য ও দেশের কর্তব্য হওয়া উচিত সকল ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী, আরও আধুনিক ও আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা। মাদ্রাসাগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আরও বেশি করে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একইসাথে, শিক্ষক নিয়োগে যে সুস্পষ্ট ইসলামোফোবিক বৈষম্য ও অস্বচ্ছতা চলছে, তার তদন্ত করে দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বরং, মাদ্রাসাগুলোকে ইসলামোফোবিয়ার হাতিয়ার দিয়ে পিছিয়ে দেওয়া বা তাদের উপর কুৎসা রটনা করে রাজনৈতিক পয়সা কামানো যাবে না। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, যারা দীর্ঘদিন ধরে ‘সহাবস্থান’-এর সংস্কৃতি লালন করে এসেছেন, তাদের এই ইসলামোফোবিয়ার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিভাজনের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করতেই হবে।

 

0 Comments

Post Comment