পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সমগ্র ‘বন্দেমাতরম্’ গাওয়ার কেন্দ্রীয় নির্দেশ আসলে হিন্দুরাষ্ট্রের সোচ্চার ঘোষণা

  • 02 March, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 312 view(s)
  • লিখেছেন : শংকর
বন্দে মাতরম গানটির যে অংশে দেশকে দেবীরূপে বা দুর্গারূপে কল্পনা আছে সেই অংশটি স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলবে না। দেশকে মাতা হিসাবে কল্পনায় অসুবিধা নেই। কিন্তু একেবারে দেবীদুর্গা হিসাবে কল্পনা একেবারেই হিন্দু সমাজের নিজস্ব বিশ্বাসের প্রশ্ন। সেখানে অহিন্দুরা তাতে গলা মেলাবেন কেমন করে? তাই রবীন্দ্রনাথ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন যে, গানটির প্রথম দুটি স্তবকই যথেষ্ট। পুরো গানটির প্রয়োজন নেই।

ভারত অলিখিত হলেও যে আসলে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গেছে পুরো বন্দেমাতরম্ গাওয়ার বাধ্যবাধকতা জারি করে কেন্দ্রের ফ্যাসিবাদী বিজেপি সরকার তা আরও একবার জানিয়ে দিল। বিজেপির বন্দেমাতরম্ প্রেমে ‘বন্দে’ও নেই, মা-ও নেই। দেশের প্রতি ভালোবাসাও নেই, ভক্তিও নেই। থাকলে এমন সিদ্ধান্ত হত না।

১৯৩৭ সাল। কলকাতায় বসেছে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভা। সেই সভাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা যে, বন্দেমাতরম - এর পুরোটাই গাওয়া উচিত নাকি প্রথম দুটো স্তবকই ঠিক আছে। এই নিয়ে একটা সমস্যা তৈরি হচ্ছিল কারণ কংগ্রেসের বিভিন্ন সভায় এবং কংগ্রেস পরিষদীয় দল বিধানসভায় যখন পুরো গানটি গাইছিলেন তখন তা মুসলমান সদস্যদের মধ্যে সমস্যা তৈরি করছিল। গানটির যে অংশে দেশকে দেবীরূপে বা দুর্গারূপে কল্পনা আছে সেই অংশটি স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলবে না। দেশকে মাতা হিসাবে কল্পনায় অসুবিধা নেই। কিন্তু একেবারে দেবীদুর্গা হিসাবে কল্পনা একেবারেই হিন্দু সমাজের নিজস্ব বিশ্বাসের প্রশ্ন। সেখানে অহিন্দুরা তাতে গলা মেলাবেন কেমন করে? এই প্রশ্ন কংগ্রেসের কাছে সেই সময়ে স্বাভাবিকভাবেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইংরেজ বিরোধী লড়াইটা যেভাবেই হোক তাঁদের তো লড়তে হচ্ছিল। আর মুসলমানরাও তো এই লড়াইয়েরই সৈনিক ছিলেন, কমরেড ছিলেন। সুতরাং কংগ্রেসকে ভাবতেই হল বিষয়টা নিয়ে। আমরা সবাই জানি যে, এই ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য নেহেরু রবীন্দ্রনাথের দ্বারস্থ হন। সুভাষ চন্দ্র বসুও আলাদা করে রবীন্দ্রনাথকে চিঠি দিয়ে করণীয় কী তা জানতে চান। রবীন্দ্রনাথ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন যে, গানটির প্রথম দুটি স্তবকই যথেষ্ট। পুরো গানটির প্রয়োজন নেই।

 

রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে নেহেরু, সুভাষ সবাই সেদিন এই একই সিদ্ধান্তেই এসেছিলেন। কংগ্রেসের গোটা ওয়ার্কিং কমিটিও এই সিদ্ধান্তেই সিলমোহর দিয়েছিল কারণ স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় ঐক্য অক্ষুন্ন রাখার গুরুদায়িত্ব তাঁদের কাঁধে ছিল। হিন্দু এবং মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ লড়াই ছাড়া ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব ছিল না। ভারতের হিন্দুত্ববাদী শক্তির কখনই সেই দায় বা দায়িত্ব ছিল না। তারা বরং মুসলমানদের টার্গেট করে আক্রমণ শানাতেই ব্যস্ত ছিল। এখনও তাই আছে। সাভারকার জেল থেকে মুচলেকা দিয়ে ব্রিটিশদের পরিষ্কারই বলেছিলেন যে, ছাড়া পেলে তিনি সারাজীবন তাদের সেবা করবেন। করলেনও তাই। হিন্দু জনতাকে উপদেশ দিলেন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে নয়, মুসলমানদের বিরুদ্ধেই নাকি লড়তে হবে। একই কথা গোলওয়ালকার, হেডগেওয়াররাও বলেছেন। ফলে হিন্দু জাতীয়তাবাদের পঙ্কিল পথে তারা যেমন একদিকে গড়ে তুললেন সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতি তেমনই নির্মাণ করলেন দ্বিজাতিতত্ত্বের আত্মঘাতী ব্যাখ্যান। ভারত শুধু হিন্দুদের। অন্য কারুর নয়। এই ছিল তাদের বক্তব্য। আজও তাই আছে।

 

এই প্রেক্ষাপটেই আজ বিজেপি নতুন করে বন্দেমাতরম্ বিতর্ককে খুঁচিয়ে তুলেছে। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রের সরকারি দপ্তরকে ব্যবহার করে নির্দেশও দিয়ে ফেলেছে যে, পুরো বন্দেমাতরম্-ই গাইতে হবে। এতদিন মুসলমানদের জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর চেষ্টায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এখন হয়ত আমরা দেখব জোর করে বন্দেমাতরম্ গাওয়াবার অছিলায় মুসলমানদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। দেশবাসীর একাংশের রক্ত বন্দেমাতরমের গায়েও হয়ত লাগতে চলেছে আগামীদিনে।

 

ভাবতে আশ্চর্য লাগে গোটা দেশটাকে কোথায় টেনে নামাচ্ছে এরা। যে বন্দেমাতরম্-কে নিয়ে বিজেপি এই কুৎসিত রাজনীতি করতে দ্বিধা করছে না সেই বন্দেমাতরম্ স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিযুগে প্রায় হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক অভিব্যক্তি। ভাবুন, ১৯০৫ সালের কথা। ইংরেজ ধর্মীয় বিভাজন উস্কে দিয়ে বাংলা ভাগ করতে চাইছে। তার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে বাংলার মানুষ। মিটিং মিছিল চলছে সর্বত্র। উত্তাল সেই সময়ে জায়গায় জায়গায় ইংরাজ সরকার বন্দেমাতরম্ গাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা লাগাচ্ছে। ধরপাকড় করছে, লাঠিচার্জ করছে। তাকে উপেক্ষা করেই মানুষ গাইছে, লড়ছে। সেই ছিল সময় যখন ইংরেজ বন্দেমাতরম্ গাইতে দেবে না। আর মানুষ গাইবে। তাতে প্রাণ গেলে যাক। সেই সময়ে সারা দুনিয়ায় ব্রিটিশের উপনিবেশ, ব্রিটিশ রাজত্বের একদিকে সূর্য ডুবলেও অন্যদিকে সূর্য জেগে থাকে —- এহেন দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী বিশ্বশাসক ভারতের মাটিতে একটা গান শুনলেই এমন আতঙ্কিত হয়ে পড়ত যে তা নিষিদ্ধ করতে হল। আর অন্যদিকে স্বাধীনতাকামী জনতা প্রাণের বিনিময়েও সেই গান গাইছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটা গান নিয়ে এমন অসম যুদ্ধ পৃথিবী কি দেখেছে আর কখনও?

এটা কি সম্ভব হত রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী, নেহেরু কিংবা সুভাষ বোসের মত বিবেচক লোকেরা সেই সময়ে না থাকলে? এদের প্রত্যেকের সাথে আমাদের বিভিন্ন মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু আজকের আমাদের শাসকদের তুলনায় এরা যে মহামানব বলে চিহ্নিত হতে পারেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। ১৮৯৬ সালে কলকাতায় কংগ্রেসের অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ যখন প্রথম এই গানটি গাইলেন তার তিনবছর আগে গানের রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র প্রয়াত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু গানটির প্রথম অংশটুকুই গেয়েছিলেন। সুরও দিয়েছিলেন তিনিই। সুতরাং, ১৯৩৭ সালে এসে খুব স্বাভাবিকভাবেই রবীন্দ্রনাথই ছিলেন গানটির একপ্রকার অভিভাবক। সুতারাং নেহেরু বা সুভাষ যে তাঁরই মতামত চাইবেন সেটা খুবই স্বাভাবিক।

নেতাজী সুভাষের কাছে জবাবী চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ গানটির প্রথম দুটি স্তবক রাখার  পক্ষে মতামত রাখতে গিয়ে বলছেন —-

 

 “To me the spirit of tenderness and devotion expressed in its first portion, the emphasis it gave to beautiful and beneficient aspects of our motherland made special appeal so much so that I found no difficulty in dissociating it from the rest of the poem and from those portions of the book of which it is a part,”

 

(উক্ত চিঠির পুরোটা পাওয়া যাবে ‘সহমন’-এ পূর্বে প্রকাশিত বন্দেমাতরম নিয়ে সৌভিক ঘোষালের রচনার পরিশিষ্টে। আগ্রহী পাঠকরা দেখে নিতে পারেন।)

 

 অর্থাৎ, গানটির প্রথম অংশে কমনীয়তা এবং আত্মনিবেদনের যে ভাব প্রকাশিত হয়েছে, আমাদের মাতৃভূমির সৌন্দর্য এবং তাৎপর্যকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তাতে এর একটা বিশেষ আবেদন এমনভাবেই প্রকটিত যে এই অংশটিকে আলাদা করতে রবীন্দ্রনাথকে  বিশেষ বেগ পেতে হয় নি, ইত্যাদি।

 

বিজেপির সাথে বাঙলা, বাঙালী, রবীন্দ্রনাথ, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বন্দেমাতরম্ —- এসবের কোনো সম্পর্ক কোনোকালেই ছিল না। এই সবকিছুই মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে যার সাথে বিজেপির শুধু কোনো সম্পর্ক নেই তাই নয়, দ্বন্দ্বাত্মক সম্পর্ক রয়েছে। এসবের প্রতি বিজেপির প্রেম আসলে নকল প্রেম। তারা অন্য মেরুর বাসিন্দা। কিছুকাল আগে বঙ্গে নির্বাচনের প্রাক্কালে নরেন্দ্র মোদি রবীন্দ্রনাথকে “গুরুবোর” বলে উল্লেখ করে তাঁর একটি গানের দু একটি কলি বাংলায় উচ্চারণ করার চেষ্টা করেছিলেন। সেই যে, “চোলাই চোলাই..!” সকলেরই তা মনে থাকার কথা। মোদি দেখাতে চাইছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথকে তিনি কত মানেন, কত শ্রদ্ধা করেন, ইত্যাদি। কিন্তু বন্দেমাতরম্ প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ কানে নেওয়ার প্রয়োজন তিনি বা তার দল কেউই বোধ করেন নি। সেটাই স্বাভাবিক।

 

ভাবতে আশ্চর্য লাগে যে, যে বন্দেমাতরমের পুরোটা গাওয়া মোদি সরকার বাধ্যতামূলক করল তার অনেকটাই অংশই কিন্তু বাংলায় রচিত। যেমন —-

সপ্তকোটি কন্ঠ কলকল নিনাদ করালে

দ্বিসপ্তকোটি ভুজৈ ধৃর্ত খর-করবালে

অবলা কেন মা এত বলে।।

কিংবা,

তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম্ম

তুমি হৃদি তুমি মর্ম্ম

 

অথবা,

বাহুতে তুমি মা শক্তি

হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি

তোমারই প্র‍তিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে।

 

অথচ, আমরা ভুলে যেতে পারি না এই মুহুর্তে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলায় কথা বলার জন্য খুন হয়ে যাচ্ছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। বাংলাভাষী মানুষকে জবরদস্তি, কখনও বা পে লোডার দিয়ে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে সীমানা পার করে বাংলাদেশে। দিল্লি পুলিস মোদিদের ট্রেনিং এমন পেয়েছে যে, বাংলাকে বাংলাদেশী ভাষা বলে উল্লেখ করছে। বিজেপি প্রকৃত অর্থেই একটা বাঙালী বিদ্বেষী শক্তি। বন্দেমাতরমের প্রতি তাদের প্রেম আসলে নকল প্রেম। বন্দেমাতরম্ তাদের একটা হাতিয়ার। তাদের আসল প্রেম আদানির সাথে, আম্বানির সাথে, আর রাজক্ষমতার সাথে। হিন্দু সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতি তাদের কাছে আজীবন রাজত্ব করার একটা রাস্তা। সেই রাস্তায় এগোনোর অসংখ্য ছোটবড় সরাইখানার মধ্যে একটা হল বন্দেমাতরমের প্রতি তাদের লোক দেখানো প্রেম। মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন চালানোর একটা পন্থা। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকের মনে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিয়ে, মুসলমানদের সাধারণ শত্রুতে পরিণত করার একটা খেলা মাত্র।

 

ইংরেজের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধুমাত্র ইংরেজের কবল থেকে মুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৩৭ সালের কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্ত ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এটি দেখায় যে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু ব্রিটিশবিরোধী লড়াই নয়; বরং বহুধর্মীয় সমাজে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয় নির্মাণের রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও ছিল।

আর বিজেপি যেটা বানাচ্ছে সেটা একটা ফ্যাসিবাদী হিন্দুরাষ্ট্র। ১৯৩৭ সালের তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে গেছি। বিজেপির হাতে বন্দেমাতরম্ এই বিরাট পশ্চাদপসরণের একটা ছুতো মাত্র। তার বেশি কিছু নয়।

0 Comments

Post Comment