পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কর ছাড় নিয়ে মানুষকে ভুল বোঝানো কেন?

  • 02 February, 2023
  • 0 Comment(s)
  • 1123 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন সেনগুপ্ত
ভারতের ক্ষেত্রে বেশীরভাগ মানুষেরই স্বাস্থ্য বীমা নেই, যাঁদের আছে, তা অপর্যাপ্ত, কিন্তু তাও বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, আয়কর ছাড়ের সুবিধা পেতেই বহু মানুষ স্বাস্থ্য বীমা করান। সামাজিক সুরক্ষা না থাকার ফলে, একজন আয়করদাতার নিজস্ব দায়িত্বও হয়ে দাঁড়ায় এই বিষয়গুলো। সুতরাং সরকারের কখনোই কি এই স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্প, বা, গৃহ নির্মাণের ঋণের সুদে ছাড় বা স্বাস্থ্য বীমাতে আয়কার ছাড়ের সুযোগ থেকে নাগরিকদের বঞ্চিত করা উচিৎ ? আসলে বিতর্কটা শুধু পাঁচ লক্ষ থেকে সাত লক্ষের আয়কর ছাড় নিয়ে নয়, বিতর্কটা সরকার আদৌ চাইছে কি, তাঁর দেশের আয়করদাতারা ভবিষ্যতের কথা ভেবে কিছু সঞ্চয় করুক?

দেশের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন, বাজেট পেশ করেছেন। সমস্ত ছোটখাট সংবাদমাধ্যমের সঞ্চালক থেকে শুরু করে, শাসকদলের বড় ছোট মেজো সমর্থকেরা সামাজিকমাধ্যমে ধন্য ধন্য করা শুরু করেছেন- কি অসাধারণ বাজেট, মধ্যবিত্তের কথা ভেবে এতোদিন পরে একটা বাজেট হলো। সরাসরি এবার কর ছাড় দেওয়া হবে। যাঁরা এতোদিন পাঁচ লক্ষ টাকা অবধি, আয়করে ছাড় পেতেন, তাঁরা এরপরের থেকে সাত লক্ষ টাকা অবধি এই ছাড় পাবেন। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, যাঁরা নতুন এই করছাড় নীতি গ্রহণ করতে চান, তাঁদের স্বাগত।

এখন জানা জরুরী, আগের নিয়ম কি ছিল? এতোদিন অবধি পাঁচ লক্ষ টাকা অবধি সরাসরি কর ছাড় দেওয়া হতো, তারপরে ১.৫ লক্ষ টাকা অবধি ৮০ সি ধারায় সঞ্চয়ের ওপর ছাড় পাওয়া যেত, বাকি ৫০ হাজার জাতীয় পেনশন প্রকল্পে যদি কেউ সঞ্চয় করেন, তাহলে সেখানে ছাড় পাওয়া যেত। তারপরে ছিল নিজের এবং পরিবারের মানুষদের স্বাস্থ্য বীমার জন্য ছাড় এবং গৃহ ঋণের সুদেও ছাড় পাওয়া যেত। তারমানে সাত লক্ষ নয়, হিসেবমতো প্রায় আট লক্ষ টাকাতে ছাড় দেওয়া হতো, এবং ভবিষ্যতের জন্য মানুষের হাতে কিছু অর্থও সঞ্চিত হতো। একটা সময় ছিল, যখন সরকার চাইতো, সাধারণ চাকুরীজীবি মানুষ ভবিষ্যতের কথা ভেবে কিছু সঞ্চয় করেন, তাতে করের ছাড়ও দেওয়া হয়। এই যে সরকারি স্বল্পসঞ্চয় প্রকল্পের টাকা, তার একটা অংশ সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় নানা কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতো। এই সরকারের সঙ্গে আগের সরকারের একটাই পার্থক্য, এই সরকার বেশীরভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বেশীরভাগ অংশটাই বিক্রি করে দিয়েছেন, বেশ কিছু বৃহৎ পুঁজিপতিদের কাছে। তাঁরা নাকি এই সমস্ত ‘অলাভজনক’ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কিনে নিয়ে সেই সংস্থাদের উন্নতি করবেন। সেই জন্য সরকারও আর চাইছেন না, জনগণের টাকা স্বল্পসঞ্চয় প্রকল্পে আর নিয়োগ হোক।

 

আমাদের মতো দেশে একজন সাধারণ নাগরিকের কেন সঞ্চয় করা উচিৎ, সেই কথাটাও ভাবা দরকার। যে দেশে সামাজিক সুরক্ষা বলে কিছু নেই, অবসর নেওয়ার পরে বার্ধক্য জনিত পেনশন ও প্রায় নেই বললেই চলে। একজন মানুষ অসুস্থ হলে, তিনি কীভাবে বা কোন জায়গায় তাঁর চিকিৎসা করাবেন, তার নিশ্চয়তা নেই। সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গিয়ে, প্রায় পুরোটাই বেসরকারি ব্যবস্থার আওতাধীন হয়ে যাওয়ার মুখে। একজন মানুষ, অবসর নেওয়ার পরে, সন্তানদের কৃপা এবং করুণার ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছেন, সেখানে এই ধরনের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সঞ্চয় করা কি অনুচিত? ২০১৪ সালের আগে অবধি যা তথ্য পাওয়া যায়, তা থেকে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়, একজন মানুষ যেহেতু জানতেন না, ভবিষ্যতে তাঁর জন্য কী অপেক্ষা করে আছে, তাই তিনি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই চাইতেন কিছু অর্থ সঞ্চয় করা থাক, কিন্তু ২০১৪ পরবর্তীতে তাঁর জীবনটা অনিশ্চয়তায় ভরে গিয়েছে, ফলে এখন একজন মানুষ সঞ্চয় করতেও সাহস পাচ্ছেন না। ২০১১-১২ সালে ভারতের সঞ্চয় ছিল জিডিপির ৭.২ শতাংশ তা, ২০১৭-১৮ সালে কমে ৬.৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ২০১৭ সালে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে, তাতে দেখা যাচ্ছে, মাত্র ২৩ শতাংশ মানুষ অবসর জীবনের কথা ভেবে সঞ্চয় করে থাকেন। ৩০ শতাংশেরও কম মানুষ, কোনও একটি বীমা পরপর ছয় বছর চালিয়ে যেতে সক্ষম। ঐ রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০৩১ সালে, সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রতি একশো জনে পঞ্চাশ ছুঁয়ে ফেলবে, তার মানে আর ৭ থে ৮ বছরের মধ্যে, কোনও ভবিষ্যৎ সঞ্চয়হীন মানুষের সংখ্যা হবে দেশের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ। আরও একটি তথ্য দেখলে আরও অবাক হতে হবে। যে নিম্ন আয়ের মানুষজনের কথা ভেবে, জাতীয় পেনশন প্রকল্পের সূচনা হয়েছিল, যাতে মাসিক ১০০০ টাকা জমা দেওয়ার কথা, সেখানেও দেখা গেছে, ৫০ শতাংশ মানুষ ঐ ১০০০ টাকাও জমা দিতে পারছেন না। 

 

আরও দেখা গেছে, মানুষজন নিজেদের জীবনযাপনের জন্য বেশী বেশী ঋণ করছেন। অনেক সময়ে ঋণের পরিমাণ, রোজগারের থেকেও বেশী হয়ে যাচ্ছে, এমতাবস্থায় সরকারের যখন আরও বেশী বেশী নাগরিকদের আরও সঞ্চয় করানোর বিষয়ে উৎসাহিত করা উচিৎ, দেখা যাচ্ছে ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের বিষয়ে মানুষজনকে নিরুৎসাহ করছেন। ভারতের ক্ষেত্রে বেশীরভাগ মানুষেরই স্বাস্থ্য বীমা নেই, যাঁদের আছে, তা অপর্যাপ্ত, কিন্তু তাও বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, আয়কর ছাড়ের সুবিধা পেতেই বহু মানুষ স্বাস্থ্য বীমা করান। সামাজিক সুরক্ষা না থাকার ফলে, একজন আয়করদাতার নিজস্ব দায়িত্বও হয়ে দাঁড়ায় এই বিষয়গুলো। সুতরাং সরকারের কখনোই কি এই স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্প, বা, গৃহ নির্মাণের ঋণের সুদে ছাড় বা স্বাস্থ্য বীমাতে আয়কার ছাড়ের সুযোগ থেকে নাগরিকদের বঞ্চিত করা উচিৎ ? অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতা রাখার সময়ে বলেছেন, যাঁরা আয়কর ছাড় নিতে চান না, তাঁদের জন্য এই সাত লক্ষ টাকার আয়কর ছাড়ের বিষয়টি লোভনীয়। তিনি আরও বলেছেন, একজন আয়করদাতা যথেষ্ট বুদ্ধিমান, তাই তাঁরা এই সিদ্ধান্তে সহজেই নিতে পারবেন, কিন্তু তাই যদি হতো, তাহলে কি এই বিতর্কটা উঠতো? আসলে বিতর্কটা শুধু পাঁচ লক্ষ থেকে সাত লক্ষের আয়কর ছাড় নিয়ে নয়, বিতর্কটা সরকার আদৌ চাইছে কি, তাঁর দেশের আয়করদাতারা ভবিষ্যতের কথা ভেবে কিছু সঞ্চয় করুক?  যদি তাই হয়, তাহলে অর্থমন্ত্রী তা সরাসরি বলছেন না কেন? কেন পাঁচ লক্ষ থেকে সাত লক্ষ করা হয়েছে, আয়কর ছাড়ের সীমা, এই ভাঁঅতা দেওয়া হলো চাকুরীজীবি মানুষকে? এই কি তবে অমৃত কালের বাজেট? আর যাঁদের আয় বাড়েইনি, তাঁদের কি হবে?

0 Comments

Post Comment