জঙ্গল থেকে উৎখাত হয়ে আসা শবররা পারছেন না মানিয়ে নিতে চাষবাসের সঙ্গে, এদিকে জঙ্গলও ক্রমহ্রাসমান। জঙ্গল সব সোনাঝুরির জঙ্গল, ইউক্যালিপ্টাসের জঙ্গল – সেখানে না মেলে গাব, না মেলে পিয়াল, না মেলে ছাতু।
এদিকে সরকারি টেন্ডার মিলে যায় বেসরকারি খনি-বাবুদের - পাথর খাদানের অনুমতি।
অযোধ্যা পাহাড়ের বান্দো নদীর কোলে ১০০০ একর বনভূমি পরিষ্কার করে ৭৩০০০ গাছ কাটার নিদান দিয়েছিল কেন্দ্রীয় বন দপ্তরের বিষেষজ্ঞ কমিটি। জঙ্গলমহলের প্রাণপ্রকৃতি আন্দোলন, ড্যামবিরোধী আন্দোলন তাকে ঠেকিয়ে রেখেছে এতদিন।
পাহাড় ঘিরে ফেলে আড়ালে আড়ালে হাপিশ হয়ে যায় পাহাড়। শুধু একটা ক্ষত রয়ে যায় পুরোনো ব্রণর দাগের মত।
পুরুলিয়ায় ঝাড়ুখামার গ্রামের পাশে স্পঞ্জ আয়রন কারখানা খোলা হয়ে যায়, কাউকে না জানিয়েই চুপিচুপি।
নেই হয়ে যায় পুকুর। শুধু একটু একটু করে প্রোমোটারদের গ্রাসে নয় – আমাদের, পথ চলতি মানুষের এদিক ওদিক তাকিয়ে ছুঁড়ে ফেলা প্লাস্টিকে মোড়া আবর্জনা দিয়েও। সে আবর্জনা বাড়তে বাড়তে আমার আপনার ঘরে – কলকাতা শহরের বর্ষায় ডুবে থাকা বাড়ির একতলার ডাইনিং টেবিলের নীচে। ডিমের ঝোলের সুগন্ধের পাশে। সেই পচা জলের গন্ধ কি আমরা শহরের শিমুলের রঙে রঙে আচ্ছন্ন হয়ে ভুলে গেলাম?
গাড়ি ঘোড়া কল কারখানা ধোঁয়ায় হাওয়াতে বিষ মেশে। সে শুধু এই কলকেতার উপভোক্তাদের হাওয়ায় নয়। পাথর খাদানের ধুলোয় সিলিকোসিস হতে থাকা বীরভূম, বাঁকুড়ার গ্রামেও। নদীর যেটুকু জল বেঁচে আছে তাতে সাদা থকথকে ফেনা। কখনও কখনও হাজার হাজার মরা মাছ ভেসে আসে জলপাইগুড়ির করালা নদীতে। পানীয় জল ঘোলা। আরসেনিক।
বোরো ধানের জন্য একশ মিটার দূরে দূরে মাটির তলার জল তোলার যথেচ্ছ ঢালাও সুবিধা – কয়েকটি ভোটের বিনিময়ে এই পারমিশিন পাওয়া গেছে। এদিকে সুন্দরবনের টিউবকলে কেবল নুন। সুন্দরবনে মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ভেড়ি করার জন্য চাষের জমি লিজ নেওয়া হচ্ছে নামমাত্র ভাড়ায় – আগে তো মুনাফা হোক, পরে ভাবব মাটির নোনতা স্বাদ।
এসআইআর, ধর্ম, যুদ্ধ, পাকিস্তান-বাংলাদেশ, ট্রাম্প-এপ্সটাইন, ফাদারল্যান্ড – এইসব ছেলেভুলানো লজেঞ্চুষ তাই আমাদের অন্য দিকে না তাকানোর ঘুষ। জল-জমি-জঙ্গল-মানুষের কথা কি কোনোদিন আমাদের নির্বাচনের বিষয়বস্তু হয়ে উঠবে? আমরা যারা একটু বিষহীন খাবার, একটু বিশুদ্ধ হাওয়া, একটু নির্মল জলের জন্য বুকের পাঁজার ঠেলে হা হা করছি – সেই আমরা কি কোনোদিন বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে পারব – এই যে লাল, নীল, গেরুরা, সবুজ দল – আমরা নজর রাখছি। দেখছি তোমাদের নির্বাচনী ইস্তেহার। দেখছি শবরদের জঙ্গলের অধিকার আছে কিনা। একটি আট বছরের বালিকা বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে কিনা। ঝর্ণা থেকে এক আঁজলা জল তুলে তেষ্টা মেটাতে পারছে কি না রাখাল বালক। ভরা মে মাসেও আমার বীরভূমের বাড়িতে কুয়োর জল কি থাকছে? বেআইনি ভাবে জঙ্গল-জমি-গাছ হাসিলের কী সুরাহা তোমরা রাখছ? যে রাখাছ – আমাদের ভোট যাবে তার দিকে।
তবে দিন আনি দিন খাইয়ের যুগে – অথবা নিছক ধর্মের কারণে দিন দেখতে না পাওয়ার যুগে- এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্য পালিয়ে বেড়ানোর যুগে – বিশুদ্ধ জল, খাবার, হাওয়া… সর্বোপরি পরিবেশচিন্তা আমাদের অধিকাংশ মানুষের কাছে এক ধরণের বিলাসিতা। যে আদতে পেট পুরে খেতেই পায় না – তার আবার কোন কোম্পানির ঘি ভালো সেই নিয়ে চিন্তা করার মত। কিন্তু যদি না ভাবি, তাহলে যে জমানো টাকায় খাওয়ার মত অবস্থা – একদিন টাকা ফুরিয়ে আসবে – তখন? এই, জল-জঙ্গল-পাহাড় যে সেই তিনশো কোটি বছরের জমানো সম্পদ। সরকারি মদতে কর্পোরেট যে তা লুঠে নিয়ে গেল! আমাদের ভবিষ্যৎ কী?
যেমন খাবারের অধিকার, শিক্ষার অধিকার – তেমনি সুস্থ প্রকৃতি পাওয়ার অধিকারও কি আমার নেই? রাইট টু নেচার? এই দাবী কেন উঠবে না?
আবার অন্যদিকে, এই এত গাছপালা, পশুপাখি, পোকামাকড়, নদী, জঙ্গল, পুকুর – এরাও তো এই নীল গ্রহের সমান দাবীদার। আমাদের এক অর্থে গ্রহতুত আত্মীয়। তাদেরও তো অধিকার আছে। নদীর অধিকার, নদীর ধর্ম ছুটে চলা, চলতে চলতে জল কুড়ানো। তার চলনে বাধা, তার জল কেড়ে নেওয়া – তো তার অধিকারের উপরে হস্তক্ষেপ! এই যে গাছ – বাতাসকে, সূর্যের আলোকে ধরে রাখছে খাবারে – মাটিকে আটকে রাখছে, জলের সঙ্গে তার সখ্যতা – তার হাত পা কেটে নেওয়া – তাকে উপড়ে ফেলা কি তার অধিকারেও হস্তক্ষেপ নয়? এই যে এত মৌমাছি, ভ্রমর কীটনাশকের ভয়াবহ প্রকোপে মাটিতে ঢলে পড়ছে – তাদের কি কোনও অধিকার নেই? রাইট অফ দি নেচার? প্রকৃতির অধিকার? আছে কিন্তু – আছে ইকুয়েডরে, বলিভিয়ায়, চিলিতে। পেরু সদ্য স্বীকৃতি দিল হুলবিহীন মৌমাছিদের – তাদের বেঁচে থাকার অধিকারে হস্তক্ষেপ করলে তাদের হয়ে মামলা করতে পারেন স্থানীয় আদিবাসীরা।
প্রকৃতি যদি নিজেই তাঁর এই অধিকারের জন্য পথে নামেন, ভোটে দাঁড়ান – আমরা কি তখনও বানিয়ে তোলা জাত, ধর্ম, রাজ্য, দেশের সীমানা নিয়ে অর্থহীন ঝাগড়ার ফাঁদে পা দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব – না একদিন আমরা সব কিছুর উপরে গিয়ে সত্যিকারের বিষয় নিয়ে নির্বাচন লড়ব, ভোট দেব, পথে নামব?