পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ থেকে সমকালীন বাংলার রাষ্ট্র, ইতিহাস ও গণতন্ত্র

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 203 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন্ত গোস্বামী
২০২৬ সালের কলকাতায় একটি রাস্তার নাম পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আপাতদৃষ্টিতে স্থানীয় এবং প্রশাসনিক। একটি রাস্তার পুরোনো নাম মুছে নতুন নাম বসানো হয়েছে। শহরের মানচিত্রে একটি শব্দের জায়গায় আরেকটি শব্দ এসেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি প্রতীকী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মাত্র। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। কয়েক পর্বে লেখক, এই রাস্তার নামবদলের ইতিহাসকে ফিরে দেখার চেষ্টা করলেন।

কারণ খুব কম সময়ের মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত কলকাতার পৌর প্রশাসনের সীমা অতিক্রম করে ইতিহাস, স্মৃতি, জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এবং সমকালীন ভারতীয় রাজনীতির বিতর্কে পরিণত হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ-এর নাম পরিবর্তন করে গোপাল মুখোপাধ্যায় রোড করার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর জনপরিসরে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেল, তা মূলত দুটি বিপরীত স্মৃতির সংঘর্ষ। একদিকে এমন একটি রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা হলো যেখানে এই পরিবর্তনকে ১৯৪৬ সালের কলকাতা হত্যাকাণ্ডের প্রতীকী প্রতিশোধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অন্যদিকে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুললেন যে যে ব্যক্তির নামে রাস্তার নাম ছিল, তিনি আদৌ সেই ব্যক্তি নন, যাঁর বিরুদ্ধে এই প্রতীকী প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে। বিতর্কের প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ-এর নামকরণ হয়েছিল স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে, অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে নয়।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। যদি রাস্তার নাম পরিবর্তনের রাজনৈতিক অর্থ নির্মিত হয় একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক স্মৃতির উপর, কিন্তু সেই স্মৃতির ভিত্তিই যদি তথ্যগতভাবে দুর্বল হয়, তাহলে প্রকৃত সংঘর্ষটি কোথায়? উত্তর হলো—সংঘর্ষটি ইতিহাসে নয়, স্মৃতিতে।

ইতিহাস এবং স্মৃতি এক জিনিস নয়। ইতিহাসের কাজ দলিল, প্রমাণ, নথি এবং প্রেক্ষাপটের সাহায্যে অতীতকে বোঝার চেষ্টা করা। স্মৃতির কাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্মৃতি বেছে নেয়, সরলীকরণ করে, প্রতীক নির্মাণ করে এবং আবেগের ভাষায় অতীতকে বর্তমানের মধ্যে নিয়ে আসে। ইতিহাস জটিলতাকে গ্রহণ করে; স্মৃতি জটিলতাকে সংকুচিত করে। ইতিহাস প্রশ্ন তোলে; স্মৃতি আনুগত্য সৃষ্টি করে।

ফরাসি ইতিহাসবিদ পিয়ের নোরা স্মৃতির স্থান বা lieux de mémoire-এর ধারণা দিয়েছিলেন। তাঁর মতে জাতি কেবল সংবিধান বা ভূখণ্ডের মাধ্যমে নির্মিত হয় না; নির্মিত হয় স্মৃতির স্থানগুলির মাধ্যমে। রাস্তার নাম, স্মৃতিস্তম্ভ, জাতীয় দিবস, শহিদ মিনার, মূর্তি, পাঠ্যপুস্তক—সবকিছুই জাতীয় স্মৃতির অবকাঠামো। এই কারণে কোনো রাষ্ট্র যখন একটি রাস্তার নাম পরিবর্তন করে, তখন সে কেবল একটি সাইনবোর্ড বদলায় না; সে অতীত সম্পর্কে একটি রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান করে।

এই ঘটনা ভারতবর্ষে নতুন নয়। ঔপনিবেশিক যুগের রাস্তার নাম পরিবর্তন হয়েছে স্বাধীনতার পর। কিংসওয়ে হয়েছে রাজপথ, পরে কর্তব্য পথ। বোম্বে হয়েছে মুম্বই। মাদ্রাজ হয়েছে চেন্নাই। এলাহাবাদ হয়েছে প্রয়াগরাজ। প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক যুক্তি যুক্ত ছিল। কোথাও উপনিবেশমুক্তির ভাষা, কোথাও ভাষাগত জাতীয়তাবাদ, কোথাও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পুনরুদ্ধারের দাবি। অর্থাৎ নাম পরিবর্তন কখনও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি সবসময় ক্ষমতা ও পরিচয়ের প্রশ্ন।

সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ-এর বিতর্কও সেই বৃহত্তর ধারার অংশ। কিন্তু এই বিতর্ককে বোঝার জন্য ২০২৬ সাল যথেষ্ট নয়। আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৪০-এর দশকের বাংলায়। কারণ গোপাল পাঁঠা, সোহরাওয়ার্দী, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, মুসলিম লীগ, হিন্দু মহাসভা, দেশভাগ এবং কলকাতার সাম্প্রদায়িক স্মৃতি—সবকিছু সেই সময়ের মধ্যে গাঁথা।

তবে অতীতে যাওয়ার আগে বর্তমানকে বুঝতে হবে।

আজকের ভারতে ইতিহাস ক্রমশ রাজনৈতিক সংঘর্ষের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, মজুরি, শিল্পনীতি বা আঞ্চলিক বৈষম্যের মতো প্রশ্নগুলি জনপরিসরে অবশ্যই আছে, কিন্তু সেগুলির পাশাপাশি আরেকটি ক্ষেত্র দ্রুত গুরুত্ব পেয়েছে—অতীতের ব্যাখ্যা। কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে সম্মান দেওয়া হবে, কাকে পাঠ্যপুস্তকে রাখা হবে, কোন শাসককে জাতীয় বীর বলা হবে, কোন নাম জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে—এই প্রশ্নগুলি ক্রমশ রাজনৈতিক সংগ্রামের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

এটি কেবল ভারতের ঘটনা নয়। বিশ্বজুড়েই দেখা যাচ্ছে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার সময়ে রাজনীতি প্রায়শই অতীতের দিকে ফিরে যায়। কারণ অতীতকে পুনর্নির্মাণ করা বর্তমানকে রূপান্তর করার তুলনায় সহজ। একটি রাস্তার নাম পরিবর্তন করা তুলনামূলকভাবে সহজ; কিন্তু একটি স্কুলব্যবস্থা সংস্কার করা কঠিন। একটি মূর্তি স্থাপন করা সহজ; কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা কঠিন। একটি ঐতিহাসিক প্রতীককে পুনর্নির্মাণ করা সহজ; কিন্তু সামাজিক বৈষম্য হ্রাস করা কঠিন।

এই পর্যবেক্ষণ থেকে অবশ্য এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে ইতিহাস বা স্মৃতি অপ্রয়োজনীয়। বরং উল্টো। ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ বলেই তার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। একটি সমাজ নিজের অতীতকে কীভাবে স্মরণ করে, তা তার বর্তমান রাজনৈতিক চরিত্র সম্পর্কে অনেক কিছু বলে। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন ইতিহাস অনুসন্ধানের বিষয় না হয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়।

সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ-এর বিতর্ক সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে আমরা একটি রাস্তার নামের প্রশ্নে একসঙ্গে দেখতে পাচ্ছি তথ্যগত বিভ্রান্তি, ঐতিহাসিক স্মৃতি, দেশভাগের উত্তরাধিকার, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং সমকালীন রাষ্ট্রের প্রতীকী ক্ষমতা। এই বিতর্কের মধ্যে একটি বৃহত্তর ভারতীয় প্রশ্ন লুকিয়ে আছে—আমরা কি ইতিহাসকে বুঝতে চাই, নাকি ইতিহাসকে ব্যবহার করতে চাই?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের এখন ফিরে যেতে হবে সেই দুই সোহরাওয়ার্দীর কাছে, যাঁদের নিয়ে জনপরিসরের বিতর্ক শুরু হয়েছে। একজন চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদ। অন্যজন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী। একজনের নাম রাস্তার সাইনবোর্ডে ছিল। অন্যজনের নাম রাজনৈতিক স্মৃতিতে। আর এই দুই নামকে এক করে দেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ইতিহাস ও স্মৃতির সংঘর্ষের প্রথম সূত্র।

স্মৃতির রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার সরলীকরণের ক্ষমতা। ইতিহাস যেখানে জটিলতা সৃষ্টি করে, স্মৃতি সেখানে প্রতীক সৃষ্টি করে। ইতিহাস একজন মানুষকে তার সময়, অবস্থান, কাজ এবং সীমাবদ্ধতার মধ্যে বিচার করে। স্মৃতি তাকে একটি নাম, একটি চিহ্ন, একটি আবেগে পরিণত করে। সোহরাওয়ার্দী নামটিকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক সম্ভবত এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।

কারণ জনপরিসরের বিতর্কে "সোহরাওয়ার্দী" নামটি প্রায়শই একজন ব্যক্তিকে নির্দেশ করে না। এটি একটি রাজনৈতিক স্মৃতিকে নির্দেশ করে। আর সেই স্মৃতির কেন্দ্রে রয়েছেন হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কিন্তু যে রাস্তার নাম পরিবর্তন নিয়ে এত বিতর্ক, সেই রাস্তার নাম ছিল তাঁর নয়। ছিল তাঁর মামা স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে।

এই তথ্যটি শুধু একটি তথ্য নয়; এটি একটি পদ্ধতিগত সমস্যা নির্দেশ করে। কারণ যখন একটি রাজনৈতিক সমাজ কোনো ব্যক্তির পরিবর্তে একটি পদবি বা একটি পরিচয়কে স্মরণ করতে শুরু করে, তখন ইতিহাসের জায়গায় স্মৃতি এসে বসে।

স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর জীবনকে যদি তার নিজস্ব প্রেক্ষাপটে দেখা হয়, তাহলে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চরিত্রের মুখোমুখি হই। তিনি ছিলেন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রশাসক এবং শিক্ষাবিদ। ঔপনিবেশিক ভারতের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাঠামোর মধ্যে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসে নথিভুক্ত। তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে একাধিক সম্মান লাভ করেছিলেন। তাঁর জীবনের এই অংশটি অস্বীকার করার উপায় নেই।

কিন্তু এখানেই প্রশ্ন আসে—ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি কি একজন ব্যক্তির ঐতিহাসিক মূল্যায়নের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে?

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই প্রশ্ন নতুন নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে নাইটহুড গ্রহণ করেছিলেন। পরে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তা ত্যাগ করেন। বহু ভারতীয় বিচারপতি, অধ্যাপক, চিকিৎসক এবং প্রশাসক ব্রিটিশ আমলে সাম্রাজ্যিক সম্মান গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ জাতীয়তাবাদী ছিলেন, কেউ ছিলেন না; কেউ ঔপনিবেশিক শাসনের সমর্থক ছিলেন, কেউ ছিলেন সংস্কারক। ফলে ব্রিটিশ সম্মান গ্রহণের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা এককভাবে রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করে না।

হাসান সোহরাওয়ার্দীকে ঘিরে সমকালীন বিতর্কের দ্বিতীয় উৎস বীণা দাসের ঘটনা। ১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বীণা দাস বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনের উপর গুলি চালান। ঘটনাটি ভারতীয় বিপ্লবী ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়, হামলার পর উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি বীণা দাসকে নিরস্ত্র করতে সাহায্য করেছিলেন; তাঁদের মধ্যে হাসান সোহরাওয়ার্দীও ছিলেন।

এই ঘটনাটির পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বর্তমান সময়ে প্রায়শই দাবি করা হয় যে তিনি বীণা দাসকে "ধরিয়ে দিয়েছিলেন"। কিন্তু এখানে ভাষার ব্যবহারের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটে। একটি জনসমক্ষে সংঘটিত ঘটনার সময় উপস্থিত থেকে কাউকে নিরস্ত্র করা এবং পূর্বপরিকল্পিতভাবে কাউকে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া এক বিষয় নয়। ইতিহাসের ভাষায় এই দুটি ঘটনার মধ্যে পার্থক্য আছে। রাজনৈতিক স্মৃতির ভাষায় সেই পার্থক্য প্রায়শই বিলুপ্ত হয়ে যায়।

কিন্তু যদি হাসান সোহরাওয়ার্দী বিতর্কের কেন্দ্রীয় চরিত্র না হন, তাহলে কে?

উত্তরটি আমাদের নিয়ে যায় হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে।

হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন আইনজীবী, মুসলিম লীগ নেতা, অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তাঁর ঐতিহাসিক পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ গঠিত হয়েছে ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসকে ঘিরে।

১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগের ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-র আহ্বানের পর কলকাতায় যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়, তা ইতিহাসে "গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং" নামে পরিচিত। কয়েক দিনের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। শহর কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই দাঙ্গা শুধু কলকাতাকে ধ্বংস করেনি; দেশভাগের মনস্তত্ত্বকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

এই সময় বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ফলে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার চিরকাল এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন যে প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। কেউ কেউ আরও কঠোর অভিযোগ আনেন। অন্যদিকে কিছু গবেষক যুক্তি দেন যে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক স্মৃতি প্রায়শই ঘটনাকে অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলেছে।

কিন্তু এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়। ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও জনস্মৃতিতে সেই বিতর্কের অস্তিত্ব প্রায় নেই। জনস্মৃতিতে হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রায়শই একটি একমাত্রিক চরিত্র। তিনি একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার স্মৃতি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এবং এখানেই দুই সোহরাওয়ার্দীর ইতিহাস পরস্পরের উপর আরোপিত হতে শুরু করে।

হাসান সোহরাওয়ার্দীকে স্মরণ করার জন্য যে রাস্তার নামকরণ হয়েছিল, সেটি ধীরে ধীরে হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে স্মরণ করার রাস্তা হিসেবে কল্পিত হতে শুরু করে। বাস্তব ইতিহাসের জায়গায় প্রতীকী ইতিহাস এসে বসে। একজন চিকিৎসকের উত্তরাধিকার মুছে গিয়ে তার জায়গায় বসে যায় দেশভাগ-পূর্ব বাংলার সাম্প্রদায়িক স্মৃতি।

এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে যে ব্যক্তির বাস্তব জীবন ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতীকের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না; তারা স্মৃতির ধারক হয়ে ওঠে।

সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ-এর বিতর্ক সেই কারণেই কেবল একটি রাস্তার নামের বিতর্ক নয়। এটি দেখায় কীভাবে ইতিহাসের মানুষ ধীরে ধীরে স্মৃতির প্রতীকে পরিণত হন। এবং একবার সেই রূপান্তর সম্পূর্ণ হয়ে গেলে তথ্যগত সংশোধনও রাজনৈতিক আবেগকে খুব বেশি পরিবর্তন করতে পারে না।

কারণ তখন বিতর্কের বিষয় আর হাসান সোহরাওয়ার্দী নন। বিতর্কের বিষয় ১৯৪৬। বিতর্কের বিষয় দেশভাগ। বিতর্কের বিষয় সাম্প্রদায়িক স্মৃতি। এবং সেই স্মৃতির অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন আরেকজন মানুষ—গোপাল মুখোপাধ্যায়, যিনি ইতিহাসে যেমন একটি চরিত্র, স্মৃতিতে তার চেয়ে অনেক বড় একটি প্রতীক।

পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা সেই প্রতীকের নির্মাণের ইতিহাসে প্রবেশ করব। কারণ গোপাল পাঁঠাকে বোঝা ছাড়া ১৯৪৬ সালের স্মৃতি, বাংলা বিভাজনের মনস্তত্ত্ব এবং বর্তমান নাম-পরিবর্তন রাজনীতির প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা সম্ভব নয়।

0 Comments

Post Comment