পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বোবা টানেল

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 205 view(s)
  • লিখেছেন : মৌমন মিত্র
রান্নার গ্যাস পাওয়া যাক বা না-যাক, কলিকাতা কলিকাতাই … সঙ্গে কুয়াশা ঘেরা হাইরাইজের একটা ছবি জুড়ে দিয়েছে। জানে ও, কী পোস্ট অনুগামীরা পছন্দ করবেন।ইন্সটাগ্রামে এরই মধ্যে এত ফলোয়ার! সারাক্ষণ সোশ্যাল মিডিয়া করে চলেছে। কি যে আনন্দ পায় এতে কে জানে ! পাগলী একটা !

কবে এল শহরে? গতকাল? তাই তো কথা ছিল। আমারই মনে নেই। এত ওয়ার্ক প্রেসার চলছে! পাগল পাগল লাগে নিজেকেই ! মানসিক পেশন্ট সামলাব কী! 

ক'টা বাজে? এগারোটা। বেরোতে হবে। তবে আজ খানিকটা লেট হলে ক্ষতি নেই। যা ট্র্যাফিক জ্যাম দেখাচ্ছে ম্যাপে। সমস্ত রাস্তাঘাট লাল। গতকাল গভীর রাতে কাল বৈশাখী হয়ে বেশ কিছু গাছ উপড়ে পড়েছে রাস্তায়। ব্যস। আর কী! পাইকপাড়ার পথঘাট স্বাভাবিক হতে হতে অন্তত দুপুর গড়িয়ে যাবে।

দিঘিকে এই ফাঁকে একটা ফোন করি। আছে কেমন ও? দু-চারবার ক্রিং ক্রিং হতেই ওপারে ওর চাপা স্বর। 

‘ বল…’ ফোন তুলে প্রথমেই দীর্ঘশ্বাস।

‘ কবে এলি?’ 

‘ গতকাল রাতে। কেন, ইন্সটায় দেখিসনি?’ 

‘দেখেই তো কল করলাম। আমাকে আলাদা জানাবি তো। সোশ্যাল মিডিয়া করে করে.....যাক গে। আছিস কেমন?’ 

‘ ভাল না। আমার বোধহয় আর ভাল থাকা হবে না রে।তেত্রিশ হয়ে গেল তবুও জীবনের সমস্যাগুলো একই রকম…’   

‘ এইইইইইই ছেলে … জলখাবার তো পড়ে পড়ে জুড়িয়ে এল।’ ও ঘর থেকে মায়ের গলা। দিঘি শুনতে পেয়ে কথা বলতে থেমে গেল। 

‘ আসছিছিছি…’ গলায় বিরক্তি এনে বললাম। আমার এরকম গলার স্বর শুনলে মা আরও পনেরো মিনিট আমাকে ছাড় দেয়। বোঝে। আমি নিশ্চয়ই কোনও রাজকার্য করছি, ব্যস্ত। চেঁচামেচি ভাল লাগছে না। 

মায়ের মস্তিষ্ক আমি সেভাবেই কন্ডিশন করে ফেলেছি! এই এত বছর ধরে। 

‘আবার কী বাঁধালি?’ দিঘিকে জিজ্ঞেস করে আমি ওর সঙ্গে কথায় ফিরে এলাম। 

‘আমি সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিলাম রে। তোর কথামতো সবই করছিলাম...কিন্তু, তার পরই…’ 

 দিঘির একটি মানসিক সমস্যা রয়েছে। আপনাদের বলি। ও বড় সহজে বন্ধু হয়ে যেতে পারে। শুধু বন্ধু নয়, ভাল বন্ধু হয়ে যায়। এটাকে সমস্যাই বলব। একটি পরিণত বয়সে পৌঁছে সহজে সহজ হওয়া মনস্ত্বত্ত অনুযায়ী ঠিক নয়।

 আমি, ডক্টর দর্শন সরকার। ক্লিনিকাল সাইকলজিস্ট। দিঘি আমার ক্লাস মেট ছিল। স্কুলের পর ও ইঞ্জিনিয়ারিং করে ব্যাঙ্গালুরু চলে গেল। এখন ও একটি বহুজাতিক কম্পানিতে চাকরি করে। আপাতত একা থাকে।এই কয়েক দিন আগেও একটা লিভ-ইন সম্পর্কে মেতে ছিল।

 বয়স তেত্রিশ বছর। তবে ও আমার চোখে এখনও তেরো। কেন জানি না। ওর তন্বী চেহারা, কথা বলার ভঙ্গি, ছেলেমানুষি। একই রয়ে গেল। এই এতগুলো বছর ধরে। সময়ের সঙ্গে মানুষ কতভাবে বদলে যায়। দিঘি, সে-ই দিঘি, আজও। এখনও।  

‘ কী রে? বলছিস না কিছু?’ আমি ভেসে গিয়েছিলাম ওর চোখের গভীরে। কল্পনায়। দিঘির প্রশ্নে ফের কথোপকথনে ফিরলাম। 

‘ দেখা কর। এভাবে ঝাপসা বললে কী বুঝব ! আমার ক্লিনিক থেকে বেরোতে আজ সন্ধে হবে। তার পর? ফ্রি থাকবি?’ 

‘ ক'টা নাগাদ?’

‘ ধর…. সাতটা হবে।’

‘ হিন্দুস্তান পার্ক?’  

‘ হ্যাঁ। আমাদের প্রিয় কেক শপটায়। ও জানিস। দোকানটা দোতলা করেছে। আমি যাইনি, দেখিনি যদিও…’ 

‘ তাই? দারুণ ব্যাপার! কলকাতায় কিছু বেকারি হচ্ছে, বল ! এত রকম কেক শপ শহর সাজিয়ে তুলছে। তা...যাসনি কেন? দোতলাটা দেখিসনি কেন?’

‘ ন্যাকা...জানে না যেন ! তোকে ছাড়া কবে যাই ওখানে আমি। ওই কেক শপটায় শুধু আমরা। নো আমি। বুঝলি?’ খিলখিল করে হেসে ও বলল, ‘ চল, রাখি। দেখা হবে সন্ধেয়। আমি পার্লারে সাজুগুজ করতে যাই এখন।’ 

‘এসেই পার্লার। ওই কর…’ বলে হাসতে হাসতে রেখে তো দিলাম ফোনটা। 

 তবে, দিঘি মস্তিষ্ক জুড়ে রইল সারাটা দিন, বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হতে চলল… তবুও। 

 

  আপনারা এ সব পড়ে আশ্চর্য হবেন না। এরকম হয়। আমি চাই এরকম হোক। প্রেম, দেখা হওয়া ক্ষণিকের। রেশ থেকে যাওয়াটা মূল কথা। মনে থেকে যাওয়াই আদতে যন্ত্রণা।প্রেম-যন্ত্রনা।এই যন্ত্রণা বরণ করতে হয়। বহন করতে হয়। আজকের দিনকালে এভাবে কেউ ভাবে না। দেখি তো পেশন্টদের। সব এক্ষুনি চাই। 

এক্ষুনি হতে হবে। রেশ আবার কী সব? বলুন, কী বলব! 

 

‘সবই মূলধন বুঝলি? আবেগ বলে কিছু থাকবে না…’  কথাটা বলে এই প্রথম মন দিয়ে তাকালাম দিঘির দিকে। যা ভেবেছিলাম। একই রয়েছে। ঘন কালো চুল এক পিঠ। গাঢ় কাজলরেখা। কে জানে এই সাজে ও অফিস যায়? প্রতিদিনই তো পুরুষ কলিগদের হার্ট অ্যাটাক হবে! মরুক মরুক। সব মরুক। তবে যদি আমার পথ ক্লিয়ার হয় ! এ মা ! ছি ছি !

মা না বলে কারও ক্ষতি চিন্তা করতে নেই। ক্ষতি কিসের, আমি তো মা মৃত্যুচিন্তা করে বসলাম। কী যে উন্মাদের মতো ভালবাসতে ইচ্ছে করে দিঘিকে। অন্ধ হয়ে যাই। চারপাশ ঝাপসা হতে থাকে। আমি দিঘির গভীরে ডুবতে চাই তখন! 

‘হাঁ করে সেই থেকে কী দেখছিস আমাকে? চা বা কফি অর্ডার করি? মাথাটা খুব ধরেছে !’ 

আমি চমকে উঠলাম খানিকটা। দিঘি বোঝেনি তো আমি যে, মনে মনে অসাড় হয়ে যাচ্ছি ওকে দেখে? 

‘হ্যাঁ, অর্ডার কর। সঙ্গে ফিশ ফ্রাই নে, আর, ট্রেস লেচ কেক।’ ’ বলে আমি দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে ইশারা করে কাছে ডাকলাম। অর্ডার দিলাম। আমরা এখানে এসে মোটামুটি এ সবই খাই। ও জানে। চেনে আমাদের। অনেক বছর হয়ে গেল। এখানে আসি আমরা। শুধু , এই দোতলটা নতুন। সুন্দর।ছিমছাম।পুরানো সেই দিন কথা। এই থিম অনুসারে ভিতরটার অন্দরসজ্জা। 

 

‘তার পর?’ অর্ডার দিয়ে ঘুরে তাকালাম দিঘির দিকে। প্রশ্ন করলাম। ও বার বার ঘড়ি দেখছে কেন কে জানে ! তাড়া আছে কি ফেরার? সবে তো এল। সন্ধে হল।  

‘কী আর ! আমার জীবনে যা হয়। যা হয়ে চলেছে। একটা লোক। মাঝ বয়সি। বুঝলি। আমার পোস্ট ইত্যাদি দেখে ইন্সটাগ্রামের ইনবক্সে ঠক ঠক করল। লন্ডনের কোন একটা ছোট শহরে থাকে। ডিভোর্সি। মেয়ে সঙ্গে থাকে। মেয়ে স্পেশাল চাইল্ড। অটিজম।’ এই ক'টা কথা বলে দিঘি আমার চোখের দিকে তাকাল। ঘন দৃষ্টি। যেন ওর চোখ জুড়ে  কিছু ভুলের আক্ষেপ। খানিকটা ভাল লাগা। ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য তাগিদ। আমি সব পড়তে পারলাম। তবে না-বোঝার ভান করে আরও জানতে চাইলাম। 

‘কন্টিনিউ…’   

‘দু-একবার ফোনে কথা বলার পরই সেক্সট করতে শুরু করল, জানিস। তোমার শরীরে শাড়ি, ব্লাউজ নেই। শুয়ে আছ আমার পাশে। কপালে ইয়া বড় লাল টিপ ! ভোর বেলা উঠে ‘ এই ’ বলে ডাকলাম তোমাকে।

মাথা গরম হচ্ছে। চা এল। সঙ্গে কেক, মাছ ভাজা। আমি মনটাকে ঘুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম প্লেটের দিকে তাকিয়ে। 

‘আর তুই? কীভাবে রেস্পন্ড করেছিলি তখন?’ 

‘উত্তর দিইনি। কথা ঘুড়িয়ে দিতাম। অন্য কথা বলতাম।’ 

‘কী কথা বলতি তখন?’ 

চায়ে চুমুক দিতে দিতে ও বলল, ‘ এই ধর...ওর অফিসের কথা, এক্স ওয়াইফের কথা, মেয়ের কথা…’  

‘তখন...?’ 

‘ইন্টেরেস্ট দেখাত না সে সব কথাবার্তায়। অনেকক্ষণ পর পর টেক্সট পাঠাত। সেক্সট রিপ্লাই করলেই সঙ্গে সঙ্গে জবাব ঢুকত ইনবক্সে।’ 

‘আর তুই এ সব মেনে নিয়েছিস?’ 

‘কেটে গিয়েছে সম্পর্কটা। …পরে, অবশ্য অনেক পরে লোকটাকে ম্যানিপুলেটিভ, টক্সিক মনে হয়েছিল।’ 

 ‘আর কতবার দিঘি? এক একটা পুরুষ তোকে ঠকাবে। কাঁদুনি গাইতে তিন মাস পর পর কলকাতায় এসে তুই আমাকে বিরক্ত করবি।’ 

দিঘি মাথা নিচু করে কেকে কামড় দিয়েছিল। বকলে ওর মুখ লাল হয়ে যায়। একটা আভা ঠিকরে বেরোয় ওর শরীর থেকে। আরও যন্ত্রণা দিতে হবে ওকে আজ।

 এভাবে হয় না। আমারও ধৈর্য হারিয়ে গেছে। আমার সঙ্গে মেলামেশা করে এত বছরে দিঘির অনেক বেশি মানসিক স্টেবিলিটি এসে যাওয়ার কথা ছিল। অকারণ একজনের সঙ্গে লিভ-ইন করল। তাও পাঁচ মাস। এর আগে পরে অন্তত তিনটে না-টেকা সম্পর্ক। এই ভার আমার বইবার কথা নয়। একেবারেই নয়।  

 

আমি ব্যাগের ভিতর থেকে একটা খাম বের করে ওকে দিলাম। উঠে যাব এর পরই। মনে মনে ঠিক করেছি। আর নয়। আর বসলে জীবন থেমে যাবে।

 

‘তুই বিয়ে করছিস?’ খামের ভিতর থেকে বিয়ের কার্ড বের করে দিঘি কেমন একটা অবাক চোখে আমার দিকে তাকাল। এই দৃষ্টিটা ! দিঘির এই দৃষ্টিটায় আমার সর্বনাশ। আমার স্বপ্ন ! আমার বাঁচার উৎস। 

 

                                              ২ 

একটা সময় পর আমি স্বাধীন হয়েছিলাম ঠিকই। তবে অসম্ভব একা লাগত। বিশেষত দিনের শেষে। সারাদিন অফিস। অফিসের পর একটু ঘর সাজানো, গোছানো। ডিনার রেঁধে খাওয়া। নেটফ্লিক্স। ত্বক চর্চা। খানিকক্ষণ মোম জ্বালিয়ে জার্নাল লেখা। 

  কিন্তু, তার পর? ঘুমোতে গিয়ে? অত বড় একটা কিং সাইজ বিছানায় একা গড়াগড়ি খেতাম। ভাল লাগে?  মাঝে মধ্যে বুকে কুশন জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। মনে হত দিনের শেষটায় কেউ যদি একবার ছুঁত। মাথায় হাত বুলিয়ে দিত! 

  

  তুমুল যে আমাকে জড়িয়ে-মরিয়ে জীবন কাটাত, এমন নয়। তবে যতদিনে ও আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, আমার ভিতরটা খুবলে খুবলে খাওয়া হয়ে গিয়েছে, মনে হত। তবুও তমুলের মুখ মনে পড়ত। কীভাবে ও আমাকে মদ খেয়ে আদর করত। কীভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বুক চুষতে চুষতে ঘুমতো। কেমন একটা নেশা। পাঁচ মাসের সম্পর্ক। তবে, পাঁচ বছরের বিনিদ্র নেশা মনে হত ! যা হয় আজকাল। টেক্সট, ফোন, স্বাধীন ভাবে ভাবে শরীর চেনা— সব  মিলিয়ে অতি দ্রুত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অতি দ্রুত। তা কি সহজে কেটে যায়? 

  প্রতিদিন এ সবের সঙ্গে লড়ছি আর মনে মনে ভেবেছি, আর না। আর কোনও সম্পর্ক হতে দেব না।কেবল ক্যারিয়ার, পেন্টিং। আপাতত এই জীবনই বেছে নিয়েছিলাম।কে জানবে ওভাবে ও এসে যাবে? হঠাৎ ইনবক্স। হঠাৎ ভাল লাগা। প্রথমে আমি পাত্তাও দিইনি। বার বার টেক্সট। বিরক্ত লাগত।তার পর দেখালাম বেশ কিছু কমন ফ্রেন্ড। 

   আমার এক্স-বস, যার বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার কেস ঠুকেছিল ইরা। আমার এক কলিগ। দেখলাম, সে লোকটার বেশ ভাল বন্ধু। শুধু তাই নয়, ওই এক্স-বসের সাম্প্রতিক প্রেমিকাও ওর বান্ধবী। সেইদিনই সম্পর্ক কেটে যেত। কিন্তু না। আমার কপালে ঘ্যানঘ্যানে বাংলা সিরিয়ালের মতন দুঃখ কষ্টের স্থিতিস্থাপকতা রয়েছে। আজ যা হওয়ার, হয় না। হয়ে ওঠে পনেরোটা পর্বের পর।

  

  এক রাতে টেলিফোন এল লোকটার। প্রথম কল। মিষ্টি মিষ্টি কথা কত! স্ত্রী কষ্ট দেয়। মেয়ে আরও বেশি কষ্ট দেয়। আমার ভিতরটা মায়ায় ভরে গেল লোকটার জন্য। একটা অদ্ভুত কথা বলেছিল লোকটা। মনে পড়ছে। 

‘ আমি আর কিছু চাই না। শুধু তোমার ঘরের আসবাবগুলো সরিয়ে আমাকে একটু জায়গা করে দাও। এই তো। এই তো চাইছি সোনা…’   

   এ সব শুনতে শুনতে তখনও তুমুলের সঙ্গে আলাপ, বন্ধুত্বের দিনগুলো মনে পড়ত না। মনে পড়ত না কীভাবে ও আমার মনে নিজের সম্পর্কে দুঃখ কষ্টের কথাগুলি বলে একটা জায়গা করে নিত। লোকটাও একই পথে হাঁটছিল। আমি লক্ষ করিনি। 

  ধরন এক। প্রেমে ভেজা কথা। সেক্স চ্যাট। তার বাইরে আমি ভুল। ও ঠিক। ওকে ক্রমশ বুঝতে হবে। ওর কোনও কথা খারাপ লাগলে সেটা মজা করে বলেছে। আমি মজা করতে পারব না। 

 ও যা-খুশি বলে যাবে। তাতে ভুল নেই।কেন আমাকে ভালবাসে বা ভালবাসতে চায়, বলবে না। আমাকে বলতে হবে। ওকে কেন আমার ভাল লাগে।অদ্ভুত! 

সবচেয়ে মারাত্মক একটা সিন্ড্রোম। একবার কাছে টেনে দ্রুত দূরে সরিয়ে দেওয়া।মনস্তত্ত্বের ভাষায় যাকে বলে পুশ-পুল।দর্শন শিখিয়েছিল। ঠিক সেই সময় তুমুলও ভীষণ বিরক্ত করছিল। রোজ। ওর চাকরি নেই। আমার কম্পানিতে ঢুকতে চায়। সম্পর্কে ফিরতে চায়। ইত্যাদি। 

  সব মিলিয়ে আমি কেমন দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। তার পর হঠাৎই কোন একটা সপ্তাহান্তে আমাকে একটা ছবি পাঠাল লোকটা। আমার সেই এক্স বস ও তার সঙ্গিনী। ও জানে আমি দু’জনকেই অপছন্দ করি।বসের অপরাধের ঝুলি ভরা। যৌন হেনস্থা। ওয়াইফ বিটার! দিনরাত এই মেয়ে সেই মেয়ে ! জেনেবুঝে কেন পাঠাল বসের ছবি? কষ্ট দিতে? দড়াম করে মাথা গেল গরম হয়ে। পর দিন ভয়েস টেক্সট করলাম। যা যা বলেছিলাম তা হল এই। 

‘তোমার স্ত্রীয়ের আনন্দ মুহূর্তের কোনও একটি ছবি তোমাকে পাঠালে ভাল লাগবে? কেন এরকম বিষাক্ত আচরণ করলে?’ সরি বলল প্রতিত্তরে। 

  ছোট শব্দ। সরি। আকছার ব্যবহার করি আমরা। কখনও অতিরিক্ত ব্যবহার হয়ে যায়।শব্দটার মূল্য বোঝা যায় এখন। কে কীভাবে সরি বলছে। আদৌ মন থেকে বলছে কিনা। সব স্পষ্ট বোঝা যায় তার পরবর্তী আচরণে।লোকটা মন থেকে সরি আমাকে বলেনি। আমি টের পেয়েছি। প্রতিনিয়ত।সেই ছবি নাকি মজা করেই পাঠিয়েছিল। সবই মজা?  

 

লোকটা হাওয়া বুঝে গান গাওয়া পাবলিক। কমপ্লেক্স রয়েছে মনে। জটিল কমপ্লেক্স। প্রথম দিনই এক্স-বসের সঙ্গে ওর একটি ছবি দেখে বলেছিলাম, আমাদের বন্ধুত্ব হওয়ার কথা নয়।’ মিলে গেল অক্ষরে অক্ষরে। দুম করে ছেড়ে দিলাম ওকে। দ্রুত সম্পর্কের এ এক সুবিধে। দুম করে ছেড়ে দেওয়া যায়।মন বা শরীরে তেমন কষ্ট হয় না। কষ্ট হলেও তা অতি দ্রুত কমে যায়।  

 

কিন্তু খেয়াল করেছিলাম, অফিসে মন বসছিল না। তখনই কলকাতা ছুটে গেলাম। তোর কাছে। সেই তুই-ও এমন করলি? 

আমি বলছি না। বিয়ে করছিস তুই, সেটা ভুল। তবে...সেইদিনই কেক সঁপে ডেকে বলতে হল? তা ছাড়া, তুই যে লোকটার কথা শুনে জ্বলে পুড়ে উঠে বিয়ের কার্ড দিলি, তা আমি বুঝি না? বুঝেই-বা কী করব? 

স্কুল জীবন থেকে শুরু করে আজ অব্দি, ভালবাসার জন্য একবারও ডেস্পারেট হতে পেরেছিস তুই? না, বোবা হয়ে গিয়েছিস! কোনও প্রকাশ নেই। আর প্রকাশ করতে পারবি-ও না কখনও। যদি পারতিস, এত বছরে আমাদের একটা মিষ্টি সংসার গড়ে উঠত। ছেলেপুলে হয়ে যেত। আমি বার বার, একাধিকবার প্রেমে পড়তাম না, শুধুমাত্র তোকে ভুলে থাকার জন্য।

 তুমুলের সঙ্গে শখের লিভ-ইন করে আলাদা হতে হত না। তুই এ সব বুঝবি না… আজ বিয়ে। আমি চলে যাব। অনেক দূর। আর কখনও কোনও দিন আমাকে দেখতে পাবি না তুই। সুখী হ….’ 

 

টিং টং! কে? বাইরে জোরে বৃষ্টি পড়ছে। অনেকক্ষণ হল। তার উপর লোড শেডিং। এত রাতে বৃষ্টির মধ্যে কে? দূর বাবা ! ভয় করছে একা ঘরে। যাব? দরজা খুলে একবার দেখব? আই হলে দেখে নেব? 

 

গুটি গুটি পায়ে দরজার কাছে গেলাম। আই হোলে চোখ রেখে দেখি, ও মা ! এ তো দর্শন ! বরের সাজে ! কী ব্যাপার? দরজা খুলে দেখি চুপচুপে ভিজে গিয়েছে। 

দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ তুই? এখন এইসময় এখানে? এত রাতে এই পাড়ায় কী করছিস?’ 

‘এক এক করে বলি? তার আগে ভদ্র মানুষের মতো ঢুকতে বলবি ঘরে? এক গ্লাস জল দিবি? বসতে বলবি?’ উফ ! আমিও যে কী না! ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দর্শনকে ঘরেও ডাকিনি। প্রশ্ন করে চলেছি শুধু। নিজের মাথায় নিজেই একটা গাট্টা মেরে বললাম, ‘ আমিও যে কী না ! আয় আয় বস। আমি জল আনছি।’ 

বসার ঘরে দুটো মোম জ্বলছে। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার।আর, ল্যাপটপের টিমটিমে আলো। দর্শন এতেই স্বচ্ছন্দ মনে হল। ঠিক সোফায় গিয়ে বসে পড়ল। মা বলত, কেউ এলে, সে যে-ই হোক না কেন, শুধু জল দেবে না। মিষ্টি, মুড়ি, মুড়কি, যা ঘরে থাকে তাই জলের সঙ্গে দিও। অতিথি নারায়ণ। মিষ্টি না থাক, সালসা চিপস, পেস্ট্রি, ফল কিছু- না-কিছু সব সময় থাকে আমার ফ্রিজে।অর্ধেক সময় রাঁধতে ইচ্ছে করে না। তখন এই স্ন্যাক্সই ভরসা। 

প্লেটে কফি কেক, একটু আখরোট আর জল ট্রে-তে সাজিয়ে এনে দেখি, দর্শন ছটফট করছে। একবার ঘরের এ মাথা থেকে ও মাথা হাঁটছে। একবার বসছে। ডাইনিং টেবিলের জিনিসপত্র তুলে তুলে এদিক ওদিক রাখছে। 

‘এ আবার কী নাটক?’ আমি ভুরু কুঁচকে জানতে চাইলাম। 

‘নাটক? তাই না?’ আমার হাত ধরে ল্যাপটপের সামনে নিয়ে গেল ও আমাকে। 

‘এ সব কী? কী লিখেছিস? আমি ডেসপারেট নই? আমি বোবা হয়ে যাই? তুই চলে যাবি অনেক দূরে?’ দর্শন জোরে চেপে ধরল আমার কবজি। 

আমি মনে মনে শান্ত হলাম। নির্বিকার গলায় বললাম, ‘ হাত ছাড়। ট্রে-টা রাখতে দে।’ 

ও ট্রে আমার হাত থেকে নিয়ে সেন্টার টেবিলের অপর রেখে কাতর হয়ে জানতে চাইল, ‘তুমুল, দু’দিনের অপরিচিত অদেখা ওই লোকটাই সব? আমি কেউ নই তোর জীবনে, না? এত আপন সবাই তোর? লিভ-ইন করতি। বুক চুষত?’ 

‘ওই লাইনটাই চোখে পড়ল,না?’ আমি গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম ওকে।  

‘আর নয়তো কী? আমি যে ক্যাবলার মতো বিয়ের মণ্ডপ ছেড়ে তোর কাছে ছুঁটে এলাম, সেটা কিছু না? এই অন্ধকার, বৃষ্টি, লোক চোখের ভয়। কিছু পাত্তা দিইনি। মনে হয়েছে, আজ এস্পার ওস্পার কিছু একটা করতেই হবে। এ সব কিছু না?’ আমি স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছি দর্শনের পাশে। 

‘ কী রে? বলললল......’ আমাকে ঝাঁকিয়ে দর্শন চিৎকার করে জানতে চাইল। 

‘এত বছর লেগে গেল এরকম সহজ হতে?’ এই প্রথম ওর দিকে তাকালাম অন্য ভাবে। আমার অকপট দৃষ্টিতে আদর মাখা। উচ্ছ্বাস। অসাড় ভালবাসা। 

ও আমাকে বুকে টেনে বলল, ‘ সহজে সহজ হলে দ্রুত সেক্স টেক্সট শুরু করে মানুষ। সেটা ইমোশনাল কানেকশন নয়। বুঝলি পাগলি? বোবা আমি? হ্যাঁ, হয়তো। তবে বোবা হয়ে একটা ঘন অন্ধকার টানেলের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হয়। সেই পথ সহজ নয়। দুটো মনের আবেগ, টান, স্পর্শ, রহস্য তোদের  ইন্সটাগ্রাম গড়ে তুলতে পারে না। কখনও পারবেও না। ভালবাসলে আত্ম-পক্ষসমর্থন অর্থাৎ তোরা যেটা বলিস, সেলফ অ্যাডভোকেসির প্রয়োজন হয় না। বোবা হয়েও অনুভূতির নীরব প্রকাশ থাকে। তার জন্য সময় লাগে। জীবনের এই সূক্ষ্ম দর্শনগুলো কবে যে বুঝবি তুই !’ 

‘আর বোঝার দরকার নেই। এখন তুই আছিস। থাকবি তো? তুই থাকলে আর কাউকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে না। ন্যাকা...এ সব জানিস না যেন…’ 

‘ তাই? প্রমিস?’ দর্শনের দুই ঠোঁটে সামান্য ফাঁক। উত্তেজনায়? কী মিষ্টি দেখাচ্ছে ওকে। প্রমিস করে দেব? 

 

দরজাটা ভেজিয়ে আসেনি ও। হঠাৎ এক পাল...ছেলেপিলে, সব ক'টা আমাদের ক্লাসের। কী জোরে চেঁচিয়ে উঠল! 

‘গুরু...ডুবে ডুবে এত? লাইভ, অ্যাকশন ক্যামেরা…একটু এ দিকে ঘুরে তাকাও তো তোমরা দু'জন। 

 

দর্শন ওদের দিকে মুখ ফিরিয়ে এতক্ষণে  প্রাণ খুলে হাসল ! এই প্রথম সহজ হল ও। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। 

 

দিঘির জলে ডুবে। বহু বছর সাঁতরে…

   

0 Comments

Post Comment