পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

‘বাংলায় তোমাদের, মানে মুসলমানেদের তোষণ করা হয়!’

  • 01 August, 2019
  • 0 Comment(s)
  • 745 view(s)
  • লিখেছেন : মুদর পাথেরিয়া
“মুসলিমদের সমান দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা হোক। না তাদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখানো হোক, না কেউ বশ্যতাস্বীকার করুক। এইটা হোক দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলার মুসলিম সমাজ দু-দিক থেকে (অন্যায়ের) শিকার।


 

আমি সেদিন বাংলা, দিদি, মুসলমান আর তোষণনীতি নিয়ে চলতি সন্দেহভাজনদের (বন্ধুদের) সঙ্গে কথা বলছিলাম। নিচে রইল সেই কথোপকথনটির লিপিবদ্ধ রূপ।

 

“টি এম সি মুসলমানেদের এতো তোষণ করছে বলেই, বিজেপিকে লোকে ভোট দিচ্ছে”।

“কিন্তু আমরা মুসলমানেরা কোনভাবেই তোষিত নই”

 

 

“মুসলমান-তোষণের হাজারটা উদাহরণ আছে”

“ আমাদের যতখানি তোষণ করা হয় বলে মনে হয়, ঠিক ততখানি তোষণ শিখেদেরও করা হয় তাঁদের ধর্মীয় মিছিলের জন্যও তো যান-চলাচল ব্যাহত হয়। বা বিহারিদের ছট পূজো উপলক্ষে যখন নিয়ম ভাঙা হয়, তখনও তো একই রকম তোষণ চলে অথবা দুর্গা পুজোর সময় হিন্দুদের ধর্মীয়ভাবাবেগকেও তো তোষণই করা হয়। অথচ এই সব জায়গায় তো ‘তোষণ’ শব্দটি প্রয়োগ হয় না”

 

 

“নীলরতন সরকার হাসপাতালে যারা(মুসলমানেরা)আক্রমণ করল, তারা পার পেয়ে গেল কারন দিদি মুসলমানেদের ছোঁবেই না”

“জানো এ ঘটনার জেরে কারা ভুগল এবং ভুগবে? ডাক্তারেরা (স্বল্পকালীন মেয়াদের জন্য) আর মুসলমানেরা (দীর্ঘকালিন মেয়াদের জন্য)। এর পরে তো ভয় হচ্ছে যে, এরপর কোন মুসলিম রুগিকে ভর্তি করার আগে হাসপাতালগুলি দু-বার ভাববে। ঈশ্বর না করুন, তবে এমনটি যদি আদৌ হয়, তবে সেটা প্রকারান্তরে জাতিগত বর্গীকরণের নামান্তর হবে।

 

 

“মুসলমানেরা হেলমেটের বদলে টুপি পরে ঘুরলেও বা ট্রাফিক সিগনাল ভাঙলেও তাদের সাতখুন মাফ”

“যে মুহূর্তে পুলিশ এ-বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেবে, তৎক্ষণাৎ টুপি প্রস্থান নেবে, আর মাথায় হেলমেট উপস্থিত হবেসমস্যাটা হল,-যখনই তোষণ শব্দটি ব্যবহার করা হয়, মনে হয় যেন মুসলমানেরা কম পয়সায় চাল পাচ্ছে বা শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। অথচ বেশিরভাগ সময় মুসলিম-তোষণের উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয় মুসলিম বাইকচালকদের ট্রাফিক ভাঙার ঘটনা।

 

“দাঁড়াও, দাঁড়াও। আরো আছে। বাংলার রাজ্য সরকার ইমামদের ভাতা দেয়”

 

“ যদি তাঁরা মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের জন্য সদর্থে কিছু করতেই চাইতেন, তাহলে মুসলিম যুব-সমাজকে কাউন্সেলিং করানোর খাতে অর্থ বরাদ্দ করতেন। ইমামদের পৃষ্ঠপোষণ করলে মানে টাকার যোগান দিলে পৃথিবী আরো বেশি বাসযোগ্য হয়ে উঠবে না। কিন্তু মুসলিম যুবকদের পরামর্শ দেওয়ার কার্যক্রম গঠন করলে সেটা হওয়া সম্ভব”

 

“বেশিরভাগ লোকের ধারণা যে, বাংলার সরকার মাদ্রাসাগুলোকে (বেশি,বেশি)অর্থ-সাহায্য করছে”

“ মিথ্যে। এর প্রেক্ষিতে জিজ্ঞেস করি, মশায়ের শেষ কবে কোনো সরকার-পরিচালিত উর্দু মিডিয়াম স্কুলে যাওয়া হয়েছিল?একটা স্কুলে একটি শ্রেণিতে নশো জন পড়ুয়া আছে (রেকর্ড সংখ্যক হলেও হতে পারে)বেশিরভাগ শিক্ষকের পদ শূণ্য। বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো তলানিতে। আর তোমরা বলছ আমাদের তোষণ করা হয়”?

 

“গেল বছর মহরমের জন্যই তো বিসর্জন পিছনো হল”

 

“মুসলিমরা বিসর্জনের তারিখ পেছোতে বলেনি।তাছাড়া, যদি মুসলিমদের(তারা মুসলমান সমাজের একটি অংশমাত্র ছিল, পুরো সম্পপ্রদায় নয়) ওই দিন চৌরঙ্গীর বদলে অন্য কোন রাস্তা দিয়ে যাওয়ারঅনুরোধ করা হত, তাহলে তাঁরা সেটা মেনেও নিতেন। সমালোচনার তীর যদি ছুঁড়তেই হয়, তবে সেটা মুখ্যমন্ত্রীর দিকে তাক করা উচিত। তার বদলে দোষী হল কারা?মুসলমানেরা”!

 

“বাংলায় মুসলমানেরা যা ইচ্ছে তাই করলেও রেহাই পেয়ে যায়”

 

“তাই যদি সত্য হয়, তাহলে বাংলার মুসলমানেরা অ্যাদ্দিনে বড়লোক, বিখ্যাত ও চরম সমৃদ্ধ হয়ে যেত”

 

 

“এই তো সবেবরাতের সময় মুসলিম ছেলেরাতাদের বাইক মা উড়ালপুলের ওপরদাঁড় করিয়ে রাখল। তার জন্য তো তাদের ধর-পাকড় করা হল না”

 

“কে এম ডি এ রবীন্দ্র সরোবরের ভেতরে থাকা প্রতিটা ধাতব আলোকস্তম্ভের ওপর যে ‘ওম’-শব্দটি খোদাই করল, তার জন্যেও তো কাউকে ধরা হয়নি”

 

“ভোর চারটের সময় যখন লোকে ঘুমোয়, সেই সময় তারস্বরে লাউড-স্পিকারে আজানের ডাক দেওয়া হয়, সরকার তখন অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকে কেন”?

“দুর্গাপুজোর সময় কলকাতা এমন অবসবাসযোগ্য হয়ে ওঠে, যে লোকে এই শহর ছেড়ে পালায়। মজার ব্যাপার মুসলমানেরা কিন্তু কখনই বলে নি যে, হিন্দুরা ‘জিনা হারাম কর দিয়া’। আরো মজার কথা হল, এই চারটের আজান অ-মুসলমানেদের মতো মুসলমানেদেরও ঘুমের বারোটা বাজায়।

আর আমার মতে, মুসলমানেরা যদি দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়ে স্বতস্ফূর্তভাবে মাইক্রোফোনের ব্যবহারটি বন্ধ রাখত, তবে তাঁদের নৈতিক জয় হত। একই সঙ্গে তারা অর্জন করত সাম্প্রদায়িক মঙ্গলরক্ষার সুনামটি। কিন্তু তারা শুধু এটাই ভেবে গেল যে, যদি এ বিষয়ে সমঝোতা করি, তাহলে অন্য বিষয়গুলিতেও আমরা পিছু হঠতে বাধ্য হব। তারা এটা বুঝল না যে বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই মাইক্রোফোনের ব্যবহারটাই জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

অতএব আজ যদি মাইক্রোফোন নিজে থেকেই বন্ধ করি, আগামীদিনে কেউ চাপ দিয়ে বন্ধ করতে বাধ্য করতে পারবে না”

 

 

“শুক্রবারের নামাজের সময় তোমরা মসজিদ উপছে রাস্তায় চলে আসো”

 

“আচ্ছা পুজো-কমিটিগুলি যে পুজোর তিন মাস আগে থেকে মানে এই জুলাই মাস থেকেই প্যান্ডেল বানাতে গিয়ে অর্ধেক রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে অসুবিধে তৈরি করে, তার জবাব কী? তাহলে, আমরাইবা সব দোষের ভাগী হই কেন”?

 

 

“কসাইখানাগুলোতে যে গরুর মাংস ঝোলে, সেগুলো যাতে ওরকম ভাবে প্রকাশ্যে না থাকে, সেটা তো তোমরা দেখতে পারো”?

 

“এ বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ একমত। কে এম সি কাটা মাংস চোখের সামনে ঝুলিয়ে রাখার উপরে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করুক।  যেমন তোমাদের নাকে গন্ধ লাগে, তেমনি আমাদের নাকেও গন্ধ লাগে। কিন্তু মনে রেখো, কসাই মুসলমান হোক বা অ-মুসলমান, তারা সব্বাই কাটা মাংস সামনে ঝুলিয়ে রাখে।তাছাড়া, খরিদ্দারেরা যদি সামনে মাংস ঝোলানো নিয়ে আপত্তি জানায়, তাহলে এই ব্যবস্থা সপ্তাখানেকের মধ্যেই বন্ধ হবে”

 

 

“তোমরা যদি মাংস খাওয়া বন্ধ করো, তবে এই জগৎটা আরো বাসোপযোগী হয়ে উঠত”

 

 

“অ-মুসলমানেরাও যদি গরুর মাংস, মুরগির মাংস, সসেজ-এসব খাওয়া বন্ধ করে, তাহলেও ওই একই ফল হবে”

 

 

“ঈদের সময় তোমাদের ঐ ময়দান দখল করে নামাজ পড়াটা কিন্তু ভারি বাজে ব্যাপার। নিজেদের মসজিদে বা বাড়িতে প্রার্থনা করো না বাপু”

 

“একই কথা তো ছট পুজোর ক্ষেত্রেও বলা যায়। আদালতের রায়কে তোয়াক্কা না করে হাজারে হাজারে লোক সর্বজনীন জলাশয় ও তার চারপাশগুলিকে নোংরা করে।রেড রোডের ওপর যখন ঈদের নামাজ পড়া হয়, তার জন্য অনুমতি নেওয়া থাকে। আর কোন রকম ভাবে তা আদালতের রায়কে অমান্য করে না”

 

 

“বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিম অনুপ্রবেশকারীর দল এই বাংলার মুসলিম জনসংখ্যার হার ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছে”

 

“এ বিষয়ে আমাদের দু’টি বক্তব্য আছে।বিএসএফ-কে এ ব্যাপারে কেউ দায়ী করে না কেন? তাছাড়া, বাংলাদেশি মুসলমানদের অনুপ্রবেশ কোন ভাবেই এখানকার মুসলমানেদের জন্য ভাল খবর নয়। কারণ, সেক্ষেত্রে একই কাজের জন্য তাদের আরো বেশি জনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে”

 

“উনি মুসলিম-তোষণ করেন বলেই, মুসলমানেরা ওনাকে ভোট দেয়”

 

“মুসলিম ভোটাররা অ্যাতোটা বোকা নয় যে কিছু বাইকবাজেরা ট্রাফিক ভাঙার সুবিধে পায় বলে, ওনাকে তারা ভোট দেয়। মুসলিম-তোষণের যে ধারণা সমাজে চালু আছে, তার থেকে মুসলমান সমাজ না অর্থনৈতিক সুবিধে পায়, না সামাজিক। তাছাড়া, বহু অমুসলমান ভোটার থাকা সত্বেও টিএমসি লোকসভা নির্বাচনে কলকাতার সবকটি আসন রেখে দিতে পেরেছে। উল্টোদিকে গোটা উত্তরবাংলা জুড়ে মুসলমান ভোটারদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকলেও টিএমসি সেখানে হেরেছে। মুসলমানেরা কাকে ভোট দিয়েছে তা খোদায় মালুম!আবার এও হতে পারে যে, মুসলমানেরা ওনাকে ভোট দিচ্ছেন, উনি তোষণ করেন বলে নয়; বরং অন্যান্যদের থেকে ওনাকে কম ক্ষতিকর বলে মুসলমানেরা মনে করেন”

 

“তাহলে তোমরা গিয়ে ওনাকে বোঝাও না কেন যে উনি তোমাদের ছদ্ম-রক্ষক সেজে বিজেপির হাতে তুরুপের তাস তুলে দিচ্ছেন?”

 

“মুখ্যমন্ত্রী শেষ কবে তাঁর পারিষদ-মণ্ডলীর বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন?কে ওনাকে বলবে? কখনই বা বলবে? আর তিনি কার কথা শুনবেন? ভোট-ব্যাঙ্ক দখল করার কৌশল-নির্ণায়ককারী পরামর্শদাতাদের না সেই সব মুসলিম জনগনের-যারা ওনার তথাকথিত তোষণের শিকার”?

 

“কিন্তু নির্বাচনের পরে তো উনি জনসমক্ষে বলেছেন যে উনি মুসলিম-তোষণ চালিয়ে যাবেন”

দয়া করে এই ঘটনার ব্যাখ্যা এই ভাবে করো,-উনি মুসলমানদের বিশ্বাস করাতে চাইছেন যে উনি মুসলমানেদের একমাত্র রক্ষাকারী। অথচ সাধারণ মুসলিম সমাজ প্রশ্ন তুলছে, ‘আপনি আমাদের জন্য ঠিক কী কী করেছেন’?”

 

 

“কোন আশা দেখতে পাচ্ছ”?

 

“যদ্দিন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বাস করে যাবেন যে মুসলিম ভোট এককাট্টা আর উনি মাথায় দুপাট্টা জড়িয়ে ইফতার পার্টিতে অংশগ্রহণ করলে, বা ওদের সঙ্গে ওনার নামাজ পড়ার ছবি প্রচারে থাকলে সেই সম্মিলিত ভোট ওনার দিকে যাবে, তদ্দিনকোন আশা নেই”

 

“তাহলে ভবিষ্যৎ”?

“মুসলিমদের সমান দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা হোক। না তাদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখানো হোক, না কেউ বশ্যতাস্বীকার করুকবেঁচেবর্তে থাকার জন্য মুসলিমবাইকারদের ট্রাফিক আইন ভাঙাটা আবশ্যিক শর্ত নয় (সত্যি কথা বলতে কী, এদের সংশোধানাগারে পাঠানো দরকার)। ইমামদের ভাতা না দিলে মসজিদ নামাজি-শূণ্য হবে না। মাদ্রাসাগুলোকে আর্থিক সাহায্য না করলে মুসলিম সমাজের শিশুরা শিক্ষিত হতে পারবে না,-এমনটাও নয়।

সমস্যা তখনই হয়, যখন কোন রাজনৈতিক নেত্রী বা নেতা মুসলমান সমাজকে তাঁর রাজনৈতিক মুনাফার যন্ত্র হিসেবে দেখেন(স্বাভাবিকভাবে এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম জনগণের মতামত নেওয়াই হয় না)অপরদিকে সেই একই কারণকে তোষণের আওতায় ফেলে অ-মুসলিম জনতা, তাদের প্রতি বিদ্বেষ-পোষণ করেঅর্থাৎ বাংলার মুসলিম সমাজ দু-দিক থেকে (অন্যায়ের) শিকার। এ এক দুষ্ট-চক্র। কবির ভাষায় বলা যায়ঃ ‘মুঝে তুমসে কুছ ভি না চাহিয়ে। মুঝে মেরে হাল পে ছোড় দো’(চাই না আমি তোমার কাছে আর কিছু  /আমায় এবার আমার এ-হালে ছেড়ে দাও)।

 

 

 

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment