পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

জলরঙের আলো

  • 21 August, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 426 view(s)
  • লিখেছেন : অনিন্দিতা মিত্র
পড়ার টেবিলের দিকে তাকালেই বুকটা কেঁপে ওঠে লিপিকার। টেবিলে খাতার পাহাড় জমে আছে। কিছুদিনের মধ্যেই প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডাম মীরাদি তাড়া দিলেন বলে। ঘড়ির কাঁটা বলছে নটা, আর কুড়ি মিনিটের মধ্যে স্নানে যেতেই হবে। কয়েকটা খাতা ঝটপট দেখে নিতে পারলেই ভালো হয়। হঠাৎ বেজে উঠলো ফোন।
লিপিকা মনে করলো বেজে যাক ফোন, পরে কথা বলে নেওয়া যাবে। " দিদি তুমি এখনও স্নানে যাওনি। নটা প্রায় বাজতে চললো। মা বললো তোমাকে ডাকতে, উঠে পড়ো।" চিত্রাদির ডাক শুনে ধড়ফড় করে উঠে পড়লো লিপিকা। শীতটা এই বছর বেশ জমিয়ে পড়েছে, একফালি রোদ ঢুকছে জানলা দিয়ে। কোনোরকমে কাক-স্নান সেরে এসেই আলমারি খুললো লিপিকা, লাল ঢাকাই শাড়িটা হাতে তুলতে না তুলতেই ফোনটা আবার ঝনঝন শব্দে বেজে উঠলো। ফোন তুলে হ্যালো বলতেই কানে এলো আবৃত্তির শিক্ষক রাহুল স্যারের গলা। " কেমন আছিস লিপি? কতদিন তোর কোনো খবর পাই না !" "এই চলে যাচ্ছে স্যার। আপনি কেমন আছেন? শরীর ভালো তো?"
ভালো খারাপ মিশিয়ে চলে যাচ্ছে। বয়েস হচ্ছে তো! কাগজপত্রে তোর নানা অনুষ্ঠান আর কর্মকাণ্ডের খবর পাই। মানুষের জন্য কাজ করছিস তুই। জীবনে এতটা পিচ্ছিল পথ পেরিয়ে তুই যে মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছিস তাতেই আমি আনন্দ আর গর্ব অনুভব করি। " " আপনাদের শুভেচ্ছায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। " " যাগগে শোন একটা কথা আছে। আজ আমার বন্ধু উজ্জ্বলের সেতারের স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আছে, দুদিন আগে তোকে বলতে বলেছিল। আমার ফোন করা হয়নি। তুই বিকেলে একবার গড়িয়ার এদিকে আসতে পারবি? এই বছর খুব ঘরোয়া পরিবেশে অনুষ্ঠান হবে। আসতে পারবি? আয় প্লিজ। " " স্যার আসলে এখন খুব খাতা দেখার চাপ চলছে।" " একটু কষ্ট করে আয় প্লিজ। এই বুড়ো স্যারের কথা ফেলিস না। আমি উজ্জ্বলকে বলে দিচ্ছি। রাখি রে, ভালো থাকিস। " স্যারের কথা ফেলতে পারে না লিপিকা। আজ জীবনে একজন আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে যতটা স্বীকৃতি পেয়েছে সবটাই রাহুল স্যারের জন্য। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অ্যাসিডে পোড়া মুখটার দাগছোপের দিকে তাকায় লিপিকা। আজ পোড়ার যন্ত্রণা নেই, মনের যন্ত্রণা রয়েই গেছে। আবার কানে এলো চিত্রাদির গলা। " খেতে এসো, মা ডাকছে।" ঢাকাই শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে একটা ছোট্ট হাতখোঁপা করে নিল লিপিকা, কপালে দিল লাল টিপ। সাজগোজ করে নীচের তলায় নামতে গিয়েই লিপিকা শুনতে পেল পাশের বাড়ির নীলা কাকিমার গলা। " তোমার লিপিকাকে নিয়ে চিন্তা হওয়াটা স্বাভাবিক, তোমার ছোট মেয়ে পলি নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে। দাদাও নেই, তোমারও বয়েস হচ্ছে। " ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীচে এলো লিপিকা। " কেমন আছিস লিপি?" " চলে যাচ্ছে কাকিমা ।" "এই তোর মায়ের কাছে মাঝে মাঝে গল্প করতে আসি।" "কাকিমা তোমাকে একটা কথা বলি। সবার জীবন এক নিয়মে চলে না। মার সামনে ওই পুরোনো কথা বারবার বলো না। ডাক্তারবাবু মাকে একেবারে টেনশন করতে হবে বারণ করেছেন। মাকে অনেক ওষুধ খেতে হয় গো । মা,এখন খেতে দাও,দেরি হয়ে যাচ্ছে।" বাঁকা হাসি হেসে নীলা বললো," দিদি তোমার মেয়ের বড্ড কথা, ঢোঁড়া সাপও আজকাল ফোঁস করে। কোনো পাড়ার লোকজন তোমার মেয়ের মুখের জন্য এই বাড়িতে আসে না। চললাম গো। তোমার একটু খোঁজখবর নিতে আসি, আত্মীয়স্বজনও তো এই পথ মাড়ায় না।" রাগে গস-গস করতে করতে নীলা চলে গেল। " তুই কেন এমন করিস বল তো লিপি? " " বেশ করি। তোমাকে বারবার বলি মা এইসব মানুষের সঙ্গে অযথা কথা বলে সময় নষ্ট করো না। এই ধরনের মানুষজন আঘাত করতে জানে, পাশে দাঁড়াতে জানে না। " " মায়ের যন্ত্রণা তুই বুঝবি না। ছাড়। খেয়ে নেয়।" " ওহ্ মা তোমাকে একটা কথা বলতে একদম ভুলে গেছি। আজ ফিরতে দেরি হবে। চিন্তা করবে না। রাহুল স্যার ফোন করেছিলেন। একটা অনুষ্ঠান আছে। " নাকে-মুখে দুটো ভাত গুঁজেই উঠে গেল লিপিকা। ব্যাগটা নিয়েই রওনা দিল স্কুলে। লিপিকার বাড়ি থেকে স্কুল যেতে মিনিট কুড়ি লাগে। অপেক্ষা করতে লাগলো অটোর জন্য। লিপিকা যত ভাবে যে অতীত নিয়ে ভাববে না, কিছুজন বারবার বিরক্ত করে ভাবাতে বাধ্য করে। সবাই বোঝে না যে দুর্ঘটনা হঠাৎই মানুষের জীবনে ঘটে যায়। হঠাৎই ঝড়ো হাওয়ার দাপট দীর্ঘদিনের লালিত যত্নের বাগান তছনছ করে দেয়। লিপিকা তখন সদ্য কলেজে ঢুকছে। পাড়ায় রাকেশদের পরিবার সেই সময়ে ভাড়া এসেছে। কিছুদিন পর থেকেই রাস্তায় লিপিকাকে রাকেশ বিরক্ত করতে থাকে। নানারকম কুকথা, কদর্য ইঙ্গিত চলতেই থাকতো। লিপিকা প্রথম প্রথম চুপ করেই থাকতো, এড়িয়ে যেত। একদিন সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়, লিপিকার হাত ধরে টানাটানি করে রাকেশ প্রেম নিবেদন করে। লিপিকা কষিয়ে চড় মেরে প্রত্যাখান করে। সেদিনই রাকেশ জোরে চেঁচিয়ে শাসায়, " দেখে নেব।" প্রত্যাখ্যানের জন্য রাকেশের মধ্যে যে এমন হিংস্র প্রতিশোধ স্পৃহা বাসা বাঁধবে সেটা লিপিকা বোঝেনি। একদিন পড়ে ফিরতে অনেকটাই দেরি হয়ছিল লিপিকার। রাস্তার সব আলো সেদিন জ্বলছিল না, হঠাৎ লিপিকা অনুভব করে যে কেউ তাকে ফলো করছে, জোরে পা চালায় লিপিকা। আচমকা কিছু জলীয় জিনিস এসে মুখে লাগে, তারপর জ্বলতে থাকে সমস্ত শরীর। জ্ঞান ফেরে হসপিটালের বেডে, বাবা তখন বেঁচে ,শুধু বলেছিলেন " নিজের যন্ত্রণাকে অন্যের যন্ত্রণায় মিশিয়ে বাঁচিস লিপি।" নিজের মুখের অবয়ব আয়নায় দেখে প্রচণ্ড চিৎকার করেছিল লিপিকা। কাঁটাছেঁড়া হয়েছে বহুবার, অসহনীয় যন্ত্রণাকাল পোহানোর পর জীবনে ফিরেছে লিপিকা। পড়াশোনা শেষ করে স্কুলে ঢুকেছে, আবৃত্তির সাধনাও চালিয়ে গেছে। অ্যাসিডে ঝলসানো মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়েছে সে, খোলা বাজারে যাতে অ্যাসিড না পাওয়া যায় সেই কারণে গলাও ফাটিয়েছে। রাকেশ শাস্তি পায়নি, টাকা আর ক্ষমতার জোরে রাকেশ মুক্তি পেয়েছে। " দিদি ,নামবে না? গোল্ড লাইট স্কুল তো এসে গেল, নেমে যাও।" " ওহ্। একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম ভাই।" " সাবধানে যান দিদি। " ভাড়া দিয়ে নেমে গেল লিপিকা। স্কুলে ঢুকলে মনটা ভালো হয়ে যায় , শান্ত পরিবেশটার এমন একটা ক্যারিশমা আছে যে অচিরেই মনটা পাল্টে যায়। লনে ফুটেছে শীতের মরসুমি ফুল, লাল, বেগুনি জিনিয়ার রঙবাহারি রূপে সেজে আছে চারপাশ। টিচারস রুমে ঢুকতে গিয়েই কানে এলো সহকর্মী রুমনার কটাক্ষ- " অয় এসেছে? আজ এত সেজে এসেছে কেন বল তো! " মুখের ডগায় জবাব এসেছিল লিপিকার," অ্যাসিড সারভাইভারদের বুঝি সাজতে নেই রুমনাদি।" মুখ খুলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল লিপিকা। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে সহকর্মী জবা উত্তর দিল " তাই তো দেখছি।" তখনই ঝড়ের বেগে ঘরে এলেন প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডাম মীরাদি। " ফাইনাল বেল বেজে গেছে, সবাই এখন ক্লাসে যান। লিপিকা, তুমি একবার আমার ঘরে এসো। " মীরাদি লিপিকাকে খুব ভালোবাসেন। লিপিকার কাজের খবর নেন। ব্যাগটা রেখে লিপিকা গেল ম্যাডামের ঘরে। "আসবো ম্যাডাম। " " ওহ্ এসো। বসো লিপিকা। " " তোমাকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে।" " হুম, বলুন ম্যাডাম। " " তুমি সৃজন নামের কোনো এনজিও-র নাম জানো?" " শুনেছি ম্যাডাম। " ওই সংস্থার লোকজন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সৃজন আমাদের স্কুলে সেমিনার করতে চায়। আমি ম্যানেজমেন্টকে বলেছি। যৌন-হিংসার বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্যই এই সেমিনার করা হবে। লিপিকা তুমি দায়িত্ব নাও। সোশ্যাল সার্ভিসে এখানকার অনেকের থেকে তোমার অভিজ্ঞতা বেশি। আমি সব ঠিকঠাক হলে বলবো।" " ম্যাডাম আমি?" " হুম, তুমি। আসলে….." " না তুমিই রেসপনসিবিলিটি নাও। ক্লাস আছে এখন? " " না ম্যাডাম, এখন ক্লাস নেই। খাতা দেখতে হবে। আমি যাই ম্যাডাম?" " এসো লিপিকা। " স্টাফরুম প্রায় ফাঁকা, অতনু স্যার শুধু বসে খাতা দেখছেন।" " ম্যাডাম ক্লাস নেই আপনার ?" " এখন নেই স্যার। খানিক পরে ল্যাব আছে। খাতা নিয়ে বসি।" দুটো খাতা দেখতে না দেখতেই আবার রাহুল স্যারের ফোন। " আসবি তো লিপিকা? তুই আর ফোন করলি না তাই আমিই করলাম। আজ তো শনিবার, স্কুল থেকে এখানে চলে আয়, চারটে নাগাদ অনুষ্ঠান শুরু হবে।" "স্যার যাবো আপনি চিন্তা করবেন না। " " রাখলাম, আসিস। " ফোন রেখে লিপিকা ডুবে গেল খাতা দেখায়।
খাতা দেখতে দেখতে চলে গেছে অনেকটা সময়, টের পায়নি লিপিকা। স্টাফরুমের টুকটাক গুঞ্জন কানে এলেও লিপিকার নিমগ্নতায় ফাটল ধরেনি। "ম্যাডাম আমাদের ল্যাব ক্লাসটা হবে তো?" " ওহ্ ওহ্ তোমাদের ক্লাস আছে না?" " হুম ম্যাডাম। " " যাও ,যাচ্ছি।" খাতার গোছা গুছিয়ে রেখে লিপিকা চললো ক্লাসে। এখন স্কুল বেশ ফাঁকা, টেন আর টুয়েলভ ক্লাসের ছাত্রীরা এখন পরীক্ষার জন্য আসছে না। "তুই আজ এসেছিস? হোয়াটসঅ্যাপ করেছি, যথারীতি দেখিসনি। " " মহুয়া তুই? তোকেই খুঁজছিলাম। ক্লাস করে আসি।" মহুয়া এই স্কুলে একমাত্র বন্ধু যেই বন্ধুকে মন খুব সবটা উগরানো যায়, প্রাণ খুলে হাসা কথা বলা যায়। " হুম, ক্লাস নিয়ে আয়। আমি স্টাফরুমে আছি। " ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থাকতে খুব পছন্দ করে লিপিকা। লিপিকা যখন প্রথম এই স্কুলে আসে তখন অনেক ছাত্রী বিস্ময়ের চোখে তাকিয়ে ছিল লিপিকার দিকে। কেউ কেউ আড়ালে আবডালে ফিসফিস, হাসাহাসিও করেছিল। লিপিকার ভালোবাসা আর পড়ানোর কাছে ছাত্রীকুল বশ মেনেছে। হাতেকলমে ছাত্রীদের বেশ কিছু কেমিক্যাল রিয়্যাকশন বোঝানোর পর লিপিকা ঘড়ি দেখলো। ছাত্রীরা উশখুশ করছে। ছাত্রী অম্বালিকা বললো," ম্যাডাম ছুটির ঘন্টা অনেকক্ষণ বেজে গেছে।" " তোমাদের একটু তর সইছে না, ওকে, আজ এই অব্দি থাক।" " থ্যাংক ইউ ম্যাডাম।"
ক্লাসের শেষে হাত ধুয়ে লিপিকা যখন স্টাফরুমে গেল তখন ঘর পুরো খালি, সবাই চলে গেছে। শূন্য ঘরের কোণে বসে মোবাইল নিয়ে খুটখুট করছে মহুয়া। " উফ্ তুই বটে পারিস? কটা বাজে খেয়াল আছে?" " তুই বসে আছিস কেন? " " এই ভাবলাম দেখা করে যাই। " " আমাকে একটু গড়িয়াতে যেতে হবে রে, স্যার বলেছেন, অনুষ্ঠান আছে।" " আজ তোকে খুব সুন্দর লাগছে, মন থেকেই বললাম। " ফিকে হাসি হাসলো লিপিকা, মুখটা ঝলসে যাওয়ার পর থেকে কেউ বলে না। সবাই বাহ্যিক রূপটা দেখে, অন্তরের রূপের দিকে মহুয়ার মতো কতিপয় মানুষ ছাড়া কেউ তাকায় না। " চল বেরিয়ে যাই।" চুলে চিরুনি বোলাতে বোলাতে বললো লিপিকা। " অনুষ্ঠানের ছবি, ভিডিও পাঠাস।" " আচ্ছা দেবো রে।" " অনেক কাল তোর অনুষ্ঠানে যাইনি। যাওয়ার ইচ্ছে হয়, মহুল খুব দুষ্ট হচ্ছে, মা একা পারে না। স্কুল করেই বাড়ি ছুটতে হয়। তবে একদিন যাবো।" " অবশ্যই আসবি।" দুজনে স্কুল থেকে বেরিয়ে দুপথে চলে গেল।
গড়িয়ার এই দিকটায় আগে আসেনি লিপিকা। দুপুর প্রায় গড়িয়ে গেছে। শীতের আদর গলানো রোদ্দুর ভিজিয়ে দিচ্ছে পথঘাট, প্রান্তর। অনেকেই ছাদে বসে রোদ পোহাচ্ছে। পথটা বেশ নির্জন, গাছগাছালির ঝরে পড়া পাতারা স্মৃতিবার্ষিকী পালন করছে সর্বত্র। কাছের কোনো গির্জায় ঢং ঢং ঘন্টা বাজছে। বাড়ির তলাতেই স্যার দাঁড়িয়ে আছেন। লিপিকাকে দেখেই বললেন, " এদিকে আয় লিপি। এটাই উজ্বলের সেতার শেখানোর একাডেমী ,এখানেই হবে। মানিক, ও মানিক আমার ছাত্রী এসেছে, একটু জলখাবার দাও। স্কুল থেকে সোজা চলে এসেছে। " " স্যার আপনি ব্যস্ত হবেন না। আমি খেয়েছি।" " খেয়ে নেয়। অনুষ্ঠান শুরু হবে।" একাডেমীর চারপাশ ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে, শিল্পীরা ধীরে ধীরে ভিড় করছেন স্টেজের কাছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও গানের পর স্টেজে উঠলো লিপিকা। " আমি একজন অ্যাসিড সারভাইভার, এখানে আমাকে আবৃত্তি পরিবেশনার আগে কিছু বলতে বলা হয়েছে। আমি একটাই কথা বলতে চাই যে যাঁকে অ্যাসিডে ক্ষতবিক্ষত করা হয় তাঁকে দয়া করে দূরে ঠেলে দেবেন না, তিনি সমাজের একজন। অ্যাসিড আক্রান্ত মানুষদের পাশে থাকুন, তাঁদের মাথা উঁচু করে বাঁচতে সাহায্য করুন। এই বর্বরতার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে এগিয়ে আসুন। আর কিছু বলবো না। এখন আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা "ভালো করে বলে যাও "-কবিতাটি আবৃত্তি করবো। " " ওগো, ভালো করে বলে যাও/ বাঁশরি বাজায়ে যে কথা জানাতে সে কথা বুঝায়ে দাও।" লিপিকার মায়াময় কণ্ঠস্বরে বিস্মিত মানুষজন, উচ্ছ্বাসে অনেকেই হাততালি দিলেন। কবিতার পর্ব মিটতেই একগাল হাসি হেসে এগিয়ে এলেন রাহুল স্যার। " অসাধারণ লাগলো লিপিকা, আবার তোকে ডাকবো। উজ্বল এদিকে আয় একবার।" লিপিকা দেখলো যে উজ্জ্বলবাবুর পাশে চশমা পরে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। লিপিকা বললো, " আরে সমুদ্রদা যে!" উজ্জ্বলবাবু বললেন " তুমি আমার ছাত্র সমুদ্রকে চেনো লিপিকা? খুব ভালো সেতার বাজায়, আজ কিছু করেনি!" " আসলে উজ্জ্বল স্যার আমি আর লিপিকা এক স্যারের কাছে কেমিস্ট্রি পড়তাম, অনেক বছর আগের কথা। " " চলি রে লিপিকা। " " হুম স্যার, আসুন।" রাহুল স্যার উজ্জ্বলবাবুকে নিয়ে চলে গেলেন স্টেজের দিকে। " লিপিকা কেমন আছিস?" " এই …...তোমার খবর বলো।" " চলছে। তাড়া নেই তো? চল, তানপুরা ক্যাফেতে একটু আড্ডা মারি।" " চলো, তবে খুব দেরি করতে পারবো না। মা চিন্তা করবে।" শীতের আলো ঝলমলে সন্ধে, রঙবেরঙের আলোয় সেজে ঝলমলিয়ে উঠেছে ক্যাফেটা। সামনেই একতারা বাজিয়ে গান ধরেছে কয়েকটা ছেলেমেয়ে। " এখানে বসা যাক লিপিকা, আমার সব চেনা ছেলেপুলে, আয়না নামের লোকগানের দল তৈরি করেছে। " " তোমরা এখন কোথায় থাকো সমুদ্রদা? বিজয়গড়ে তো আর নেই? " " উচ্চমাধ্যমিকের পর বাবার জামশেদপুরে ট্রান্সফার হয়ে যায়, আমরাও চলে যাই। এই কয়েক বছর আগে বাবার রিটায়ারমেন্টের পর আবার কলকাতায় ফিরে আসি, এখন কুঁদঘাটে থাকি।" ঝিমঝিম নিয়ন আলোটা পড়েছে দুজনের চোখে, কোচিং ক্লাসে পড়ার সময় দুজনে অপলকে তাকিয়ে থাকতো, কিছু প্রেম থেকে যায় চোখের ভাষায়। " চুপ করে আছিস যে? " " তুই খুব ভালো ছাত্রী ছিলি।" " আর ছাত্রী! কলেজে পড়তে পড়তেই এমন দুর্ঘটনা ঘটে গেল আমার জীবনে যে কলেজের পর্ব মিটিয়ে চাকরি করতে বাধ্য হলাম, হায়ার স্টাডিজে যাওয়া হলো না। চিকিৎসার খরচ যোগানো ফ্যামিলির পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাড়াতাড়ি রোজগার শুরু করতেই হলো। " হুম ,আমি খবর পেয়েছিলাম। " " ছাড়ো, তুমি এখন কোন প্রফেশনে আছো?" " সেতার বাজাই, শেখাই, আর নিজস্ব বুটিক চালাই। " " তুমি তো খুব সুন্দর আঁকতে। " " ওই আঁকা আর সেতার নিয়েই বেঁচে আছি রে। কফি খেয়ে নেয়। " " সমুদ্রদা আজ উঠতে হবে গো, ওই ঘটনার পর আমার একটু দেরি হলেই মা হাঁকপাঁক করে। রাস্তার মোড়েও চলে যায়।" " হুম, তুই এগো, তবে একটা কথা বলবো। " " বলো।" " ফোন নাম্বারটা দিবি। " " হুম নাও। " " আর একটা কথা বলি?" " বলো।" " তোর আবৃত্তি খুব ভালো লাগলো, মনে হলো মুহূর্তে ফাগুনের নরম আলো ছড়িয়ে দিলি। ওয়েল ডান ।" ফিকে হাসি দেখা দিল লিপিকার ঠোঁটে। " চললাম!" " আয় লিপিকা।"
অনেক রাতেই আজকাল ঘুম আসে না লিপিকার, মাঝখানে ঘুমের ওষুধ খেত লুকিয়ে লুকিয়ে। মা পাশে ঘুমোচ্ছে, শ্বাস প্রশ্বাসের সুস্পষ্ট শব্দ শোনা যাচ্ছে। বারান্দায় গেল লিপিকা, চারদিক নিস্তব্ধ। এই সময়টা খুব একা লাগে লিপিকার, মাকে টের পেতে দেয় না। জীবনের অনেকটা সময় রক্তাক্ত পথ একা একা হাঁটলেও সে রক্তমাংসের মানুষ, ব্যথা, যন্ত্রণা, একাকীত্ব তারও অনুভূত হয়। মাঝে মাঝে মনে কোনো হাতে যদি হাত রাখা যেত, পৃথিবীতে কেউ কেউ দোষ না করেও দোষী হয়। একটা কোকিল অনবরত ডেকে যাচ্ছে পাশের নিম গাছের ডাল থেকে। " কোন্ রাতের পাখি গায় একাকী সঙ্গীবিহীন অন্ধকারে বারে বারে।। " ফোনটা মনে হচ্ছে বাজছে পাশের ঘরে। " এত রাতে কে করলো? " অচেনা নাম্বার, ফোন ধরলো লিপিকা। " হ্যালো। " " সমুদ্র বলছিলাম রে, ঘুমোচ্ছিস?" " নাহ্ বলো। এমনি করলাম, তখন কথাই হলো না, কতদিন পর দেখা হলো! " সেই সমুদ্রদা।" " সমুদ্র বল, আমরা তো প্রায় সমবয়সী, আমি হন্যে হয়ে তোর নাম্বার যোগাড় করার চেষ্টা করেছি। কেউ দিতে পারেনি।" " আমি জীবনযুদ্ধে লড়তে গিয়ে এতটাই আটকে পড়েছিলাম যে কোনো কিছু ভাবতেই পারিনি।" " আমরা যখন পড়তাম তখন তেমন কথা হত না। সেই সময়ে তোকে বলতে পারেনি, দেখা যখন হয়েছে তখন তোকে বলতে চাই, তুই যা উত্তর দিবি সেটাই মেনে নেব।" অদ্ভুত শিহরন ছুঁয়ে গেল লিপিকাকে। " বলো।" " বাকি জীবনের পথটাতে একসঙ্গে হাঁটা যায় না?" " তুমি তো সব জানো? কোনো একটা সময়ে তোমার মনে হবে না তো যে তুমি ভুল করেছো ? আমার ঝলসানো মুখ ….." কথা আর বলতে পারলো না লিপিকা। " তোর মুখের দাগের ভাঁজে ভাঁজে যে লড়াই লুকিয়ে আছে সেই লড়াটাকে আমি শ্রদ্ধা করি লিপিকা, আমার মনের মন্দিরে তুই ছিলি, আছিস, তুই-ই থাকবি।" " সমুদ্রদা ……."
আকাশে উঠেছে মাঘী পূর্ণিমার চাঁদ, চাঁদের জলরঙা আলোর বানে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ।
0 Comments

Post Comment