পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সাদত হাসান মান্টো

  • 11 May, 2023
  • 0 Comment(s)
  • 741 view(s)
  • লিখেছেন : অমিতাভ সরকার
আজকের সময়ে সাদাত হাসান মান্টোর লেখা আমাদের প্রত্যেকের পড়া উচিৎ। একজন ঘাতকের মনের ভিতরটা পড়ে ফেলে, তাঁর স্বরূপকে কি প্রক্রিয়ায় পাঠকের সামনে নিয়ে আসা যায়, সেই চেষ্টাই করে গেছেন সাদাত হাসান মান্টো।

সাদত হাসান মান্টো (১৯১২-১৯৫৫) উর্দু সাহিত্যের একজন জনপ্রিয় ছোট গল্পকার। ১৯১২ সালে ১১ই মে পাঞ্জাব লুধিয়ানায় জন্ম। মান্টোর পিতা ছিলেন আদালতের বিচারক। কঠোর শাসনেও মান্টো ছোটবেলা থেকেই ছিলেন বোহেমিয়ান। পাঞ্জাবের অমৃতসরে মুসলিম হাই স্কুলে তাঁর লেখাপড়া শুরু হয়। স্কুলের গন্ডি তাঁর কাছে বিষময় হয়ে ওঠে। প্রচলিত লেখাপড়ায় তাঁর মন বসে না। তাঁর যত আগ্রহ স্কুলের পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত গল্প-উপন্যাসে। ফলে দু- দুবার এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হন। একসময় গল্প-উপন্যাসের আগ্রহ তাঁকে অমৃতসর রেল স্টেশনের হুইলার বুকস্টল থেকে বই চুরিতে প্রলুব্ধ করেছিল।

১৯৩১ সালে কলেজে পাঠকালীন অবিভক্ত ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামের অশান্ত পরিবেশে মান্টোর লেখাপড়ার ব্যাঘাত ঘটে। ১৯৩২ সালে পিতার মৃত্যুর পর মান্টো আরো অসহায় হয়ে পড়েন। পরিবারের অর্থ কষ্ট লাঘবের জন্যে তখন থেকেই তিনি উপার্জনের পথ খুঁজতে থাকেন। সে সময় তার্কিক লেখক আবদুল বারি আলিগের সঙ্গে মান্টোর সাক্ষাৎ ঘটে। আবদুল বারি আলিগ মান্টোকে রাশিয়ান এবং ফরাসি ভাষা শিখতে উদ্বুদ্ধ করেন। কয়েক মাসের মধ্যেই মান্টো, ভিক্টর হুগোর “The last Day of a Condemned Man” এর উর্দু অনুবাদ করেন। যা পরবর্তীকালে ‘সারগুজাস্‌ত-ই-আসির’( এক বন্দীর গল্প) নামে উর্দুতে প্রকাশিত হয়। তারপরেই মান্টো রাশিয়ান গল্পের উর্দু অনুবাদ করেন, রাশি আফসানে’ নামে। বিদেশী  সাহিত্য উর্দু ভাষায়  অনুবাদ করতে গিয়ে মান্টো অন্য জগতের সন্ধান পান। কিংবদন্তি লেখক ভিক্টর হুগো, অস্কার ওয়াইল্ড, রাশিয়ান লেখক আন্তন চেখভ, মাক্সিম গোর্কি প্রমুখের সাহিত্য কীর্তির সাথে পরিচিত হন। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন যুক্ত হন ইন্ডিয়ান প্রগ্রেসিভ রাইটার্স এসোসিয়েশনে। ক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন উর্দু সাহিত্যের একজন জনপ্রিয় ছোটগল্পকার। তাঁর গল্প নানান দেশে অনুবাদ হওয়ায় পৃথিবীর সাহিত্য জগতে পরিচিত হয়ে ওঠেন।  তাঁর প্রায় প্রতিটি রচনায় রয়েছে দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা, দাঙ্গা, মানব চরিত্রের বীভৎসতা। অসাম্প্রদায়িক চিন্তার এই উর্দু গল্পকারকে তাঁর মুক্তচিন্তার কারণে অপমানিত, লাঞ্ছিত হতে হয়েছে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশেই।  

একটি লেখার উদাহরণ দিয়ে এই লেখক ও গল্পকার সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরী করা যাক।

“আমি লোকটার গলায় ছুরি ধরলাম, ধীরে ধীরে পোচ দিয়ে জবাই করলাম।”
-“এ তুই কী করলি!”
“ কেন?”
-“জবাই করলি কেন?”
-“এভাবেই তো মজা!”
-“মজার বাচ্চা, তুই কোপ দিয়ে মারলি না কেন? এইভাবে …”
আর জবাই করনেওয়ালার গলা এক কোপে আলাদা হয়ে গেল।

উপরের লেখাটি একটি উর্দু গল্পের অনুবাদ। এই অনুবাদ পুরোটা পড়ে শেষ করার পর আপনার মাথার ভেতর কেমন দৃশ্য ভাসছে? চোখের সামনে কি দেখতে পাচ্ছেন ধারালো তলোয়ার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিকৃত মস্তিস্কের একজন মানুষকে? তার তলোয়ার দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা গাঢ় লাল রক্ত। তার চেহারাটা হয়তো দেখা যাচ্ছে না, শুধু বোঝা যাচ্ছে, মানুষটা এইমাত্র একজনকে হত্যা করেছে বিকৃত আনন্দ সাথে নিয়ে।

‘মান্টোর গল্প মূলত মধ্যবিত্ত মানুষের অন্তঃস্থলে লুকিয়ে থাকা অপরাধীদের কথা বলে। বলেছেন প্রখ্যাত উর্দু লেখক আলি সর্দার জাফরি। সালমান রুশদি তাঁর সম্পর্কে বলেছেন “Undisputed master of modern Indian story” দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে সপরিবারে তিনি লাহোর চলে যান। সেখানে পাকিস্তানের কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, নাসির কাজমি, আহমেফ রহি প্রমুখের সংস্পর্শে আসেন। তাঁদের সংস্পর্শে এসে তাঁর রচনা আরো বিস্তৃতি লাভ করে।   

ক্রমাগত নিম্নমানের মদ খাওয়ার কারণে মান্টো ‘লিভার সিরোসিস’-এ আক্রান্ত হন। তার জীবনযাত্রাও ছিল চূড়ান্ত বাউণ্ডুলে এবং বেপরোয়া। শরীরের প্রতি অযত্ন, অপ্রতুল চিকিৎসা, আর্থিক অনটন ইত্যাদিতে জর্জরিত মান্টোর বেঁচে থাকার প্রবল আগ্রহ ব্যাধির কাছে আত্মসমর্পণ করে। ১৯৫৫ সালের ১৮ জানুয়ারি তার অকাল প্রয়াণ ঘটে।

0 Comments

Post Comment