আরশোলাদের উৎপত্তি
দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত - এর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। একটি মামলার শুনানি চলাকালীন সংবাদমাধ্যম এবং তথ্য জানার অধিকার তথা আরটিআই কর্মীদের তীব্র আক্রমণ করতে গিয়ে তাঁদের ‘আরশোলা’র সঙ্গে তুলনা করে বসেন তিনি। প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের ঝড় উঠেছে।একটি মামলার এজলাসে বক্তব্য রাখার সময় প্রধান বিচারপতিকে বলতে শোনা যায়, “এমন কিছু যুবক রয়েছে যারা আরশোলার মতো। যারা কোথাও কোনও চাকরি পায় না এবং নিজেদের পেশাতেও কোনও জায়গা তৈরি করতে পারে না। এদের মধ্যে কেউ সাংবাদিক হয়ে যায়, কেউ সোশ্যাল মিডিয়া সামলায়, কেউ আবার আরটিআই কর্মী বা অন্য কোনও ধরনের মানবাধিকার কর্মী সেজে বসে। আর এরা সবাই মিলে তখন সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে।” প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য দেশের আইনি ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
মামলার পরিধি ছাড়িয়ে তরুণ সমাজ, গণমাধ্যম এবং সমাজকর্মীদের প্রতি এমন অবমাননাকর ও অমানবিক শব্দপ্রয়োগের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই সরব হয়েছেন দেশের সাংবাদিক, সমাজকর্মী এবং বিশিষ্ট নাগরিকরা।প্রধান বিচারপতির এই শব্দচয়ন নিয়ে সোশাল মিডিয়া ও আইনি মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠন শীর্ষ আদালতের বিচারপতির এমন ভাষার সমালোচনা করে। এমনকি এই মন্তব্যকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে 'ককরোচ জনতা পার্টি' (CJP) নামে একটি প্যারোডি সংগঠন এবং পরবর্তীতে 'ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট'-এর মতো বিদ্রূপাত্মক প্ল্যাটফর্মও আত্মপ্রকাশ করে।মাত্র তিন চার দিনের মধ্যে ওই প্ল্যাটফর্মের ফলোয়ার সংখ্যা বিজেপির জাতীয় দলের ফলোয়ার সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে।স্বাভাবিক ভাবেই বিজেপি দল অস্বস্তিতে পড়ে এখন নানা রকম বিরূপ প্রচারের রাস্তা ধরেছে। মানুষের জন্য পোকামাকড় বা পরজীবীর মতো শব্দ ব্যবহার করা আসলে অমানবিকীকরণের ভাষা। হিটলারের আমল থেকে ফ্যাসিবাদী ঘৃণার ভাষণে এমনটা দেখা গেছে, যেখানে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা ব্যক্তিদের প্রথমে মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয় এবং তারপর ব্যবস্থার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।এই অসাংবিধানিক ও মর্যাদাহানিকর মন্তব্যের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ক্ষোভ তৈরির পর, প্রধান বিচারপতি দাবি করেছেন যে সংবাদমাধ্যম তার কথার ভুল ব্যাখ্যা করেছে এবং তিনি নাকি কেবল জাল বা ভুয়া ডিগ্রিধারীদের কথা বুঝিয়েছেন।
একদিকে প্রধান বিচারপতি যখন আরশোলা ও পরজীবীর ভাষা ব্যবহার করছেন, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী প্রতিবাদকারীদের "আন্দোলনজীবী" বলছেন। আকাশছোঁয়া বেকারত্বের চাপে পিষ্ট যুবকদের তিনি স্বনির্ভরতার নামে রাস্তায় পকোড়া বিক্রির পরামর্শ দিচ্ছেন, অথচ প্রতিদিন হকাররা বুলডোজারের মুখে উচ্ছেদের শিকার হচ্ছেন।ক্ষমতাসীনদের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের মাঝে লক্ষ লক্ষ তরুণের জীবন তছনছ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের কোনো জবাবদিহি নেই। সাম্প্রতিক নিট- -ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কেবল হাজার হাজার যুবককে হতাশায় ফেলেনি, বরং মোদী সরকারের অধীনে প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে বারবার তরুণদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে তা উন্মোচিত করে দিয়েছে।এটি কোনো একক ঘটনা নয়। গত ১০ বছরে প্রায় ৮৯টি প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। জেইই মেইনস ২০২১ থেকে শুরু করে ২০২৪-এর নিট ও ইউজিসি-নেট পর্যন্ত, মোদী সরকারের বিতর্কিত বেসরকারি সংস্থা এনটিএ তাদের অযোগ্যতা এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষার প্রতি চরম অবহেলা প্রমাণ করেছে। বছরের পর বছর এই ঘটনা চললেও সরকার কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি; উল্টে দুর্নীতিগ্রস্ত এনটিএ-কে রাজনৈতিক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। এই প্রশ্নফাঁসের পর অন্তত চারজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। ২০২৪ সালে রেকর্ড সংখ্যক ১৪,৪৮৮ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, যা আগের বছরের চেয়ে ৪.৩ শতাংশ বেশি। রাজস্থান যখন এই চক্রের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উঠে আসছে, তখন বড় কোচিং সেন্টার এবং বিজেপি নেতা দিনেশ বিওয়ালের নাম একটি বড়সড় চক্রের দিকেই ইঙ্গিত করছে।নিজেদের ভবিষ্যতের ওপর এই আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে দেশের শিক্ষার্থীরা সরাসরি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তারা এনটিএ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন এবং দাবি তুলেছেন কেন্দ্রীয় নিট ব্যবস্থা বন্ধ করার, যা বারবার আমাদের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং চিকিৎসা শিক্ষায় সমান সুযোগ পাওয়ার পথকে বাধাগ্রস্ত করছে।
যুবসমাজ এবং জেন-জেড প্রজন্মের বিরুদ্ধে প্রধান বিচারপতির এই অবমাননাকর মন্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং যারা প্রশ্ন তোলার, লড়াই সংগঠিত করার, অধিকার রক্ষার বা একটি উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন দেখার সাহস দেখায়, তাদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অবজ্ঞার এটি একটি বৃহত্তর অংশ।সম্প্রতি ১১ মে, একটি পরিবেশ সংক্রান্ত মামলায় প্রধান বিচারপতি পরিবেশকর্মীদের সমালোচনা করে বলেন যে, দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই ধরনের মামলাগুলো কেবল উন্নয়ন প্রকল্প থামিয়ে দেওয়ার জন্য করা হয়। এর আগে, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬-এ 'সঙ্গম বনাম ভারত সরকার' মামলায় তিনি বলেছিলেন যে, "ঝাণ্ডা ইউনিয়নগুলো" দেশের শিল্পোন্নয়ন থামিয়ে দেওয়ার জন্য মূলত দায়ী। আমরা এখানে যা দেখছি তা কেবল আদালত থেকে আসা কোনো মন্তব্য নয়, বরং মোদীর ভারতে গণতন্ত্রের প্রতি গড়ে তোলা অবজ্ঞার রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাথে ন্যায়ালয়ের দম্ভের এক মেলবন্ধন।যে সরকার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার দায় নেয় না, তারাই আবার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলা তরুণ ও কর্মীদের জেলে পাঠাতে দ্বিধা করে না। উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের মতো কর্মীরা কেবল ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার অপরাধে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে কঠোর ইউএপিএ আইনে বন্দী আছেন।সম্প্রতি মানেসর ও নয়ডায় শ্রমিকরা যখন ন্যূনতম মজুরি ও অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করেছেন, তখন তাদের গ্রেফতার করে কারারুদ্ধ করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি যখন আন্দোলনকারী তরুণদের তিরস্কার করছেন, তখন রাষ্ট্রের এই দমন-পীড়নের বিষয়ে তিনি নিরব।বিজেপি সরকার কঠোর আইনগুলোকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি পরিষ্কার যে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এখন ফ্যাসিবাদী বয়ান ঢুকে পড়ছে। মনে হচ্ছে, যারা সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ায় না বা গরিবদের ওপর হামলা চালায় না, তারা এই ব্যবস্থার কাছে যেন ঠিক 'নিজেদের যুবক' নয়,তারা আরশোলা এবং পরজীবী। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত তাই বেকার যুবকদের লক্ষ্য করে এই শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন। যারা "মিডিয়া", "সোশ্যাল মিডিয়া", "আরটিআই কর্মী" বা "অ্যাক্টিভিস্ট" হয়ে "সিস্টেম বা ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ" করার সাহস দেখায় তারা এই ব্যবস্থায় আরশোলা।
নিট ও সিবিএসসি কেলেঙ্কারি এবং শিক্ষামন্ত্রী
সাম্প্রতিক অতীতে মেডিক্যাল নিট পরীক্ষা থেকে শুরু করে সিবিএসই দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় ফলপ্রকাশের চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার ঘটনা দেশের লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া ও অভিভাবকের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস থেকে শুরু করে পরীক্ষার ফলপ্রকাশ, একের পর এক বিড়ম্বনা দেশ জুড়ে শিক্ষার মূল্যায়নের মানদণ্ড নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সিবিএসই বোর্ডের দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় এই বছর থেকে শুরু হয়েছিল কম্পিউটার-নির্ভর অনস্ক্রিন মূল্যায়ন ব্যবস্থা (ওএসএম)। সন্দেহ নেই, আজকের ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে পড়ুয়ার পরীক্ষার খাতা শিক্ষক, দেশের যে কোনও প্রান্তে ঘরে বসেই কম্পিউটার কিংবা মোবাইল খুলে দেখে তার মূল্যায়ন করতে পারলে দ্রুত নির্ভুল ভাবে সেই পরীক্ষার ফলপ্রকাশ সম্ভব। এমনকি, ফলপ্রকাশের পর পড়ুয়ার নিজের উত্তরপত্র দেখার সুযোগের পাশাপাশি উত্তরপত্রের পুনর্মূল্যায়ন করাও দ্রুত সম্ভব এমন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায়। কিন্তু কথায় আছে ‘যার শেষ ভাল তার সব ভাল’। ফলে এমন ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দ্রুত ফলপ্রকাশ করতে গিয়ে প্রথম বছরেই হোঁচট খেল ওই নতুন ‘ওএসএম’ ব্যবস্থা। মনে রাখতে হবে, এ দেশের কেন্দ্রীয় বোর্ড সিবিএসই পড়ুয়ার সংখ্যার নিরিখে পৃথিবীর অন্যতম বড় স্কুল বোর্ড। এ দেশের মাটিতে ২৭০০০ স্কুল এবং বিদেশের ২৬টি দেশে ২৪০টি স্কুলে অনুমোদিত এই বোর্ডের শিক্ষার মানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এ দেশের সার্বিক স্কুলশিক্ষার গুণমানের প্রশ্নটিও।এই ব্যবস্থায় প্রাথমিক প্রয়োজন স্ক্যান করা উত্তরপত্রের প্রতিলিপির স্বচ্ছতা ও পাঠযোগ্যতা। কিন্তু এ বারের পরীক্ষায় পড়ুয়াদের স্ক্যান করা বেশ কিছু উত্তরপত্রে ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চড়ার তথ্য মিলেছে। প্রমাণিত হয়েছে পরীক্ষকের দেওয়া নম্বরের অস্বচ্ছতা। ফলে ওই প্রযুক্তি নিবিড় ওএসএম পদ্ধতিতে ফলপ্রকাশের পর রাতারাতি ফেলের শতাংশ ৩.১৯% বেড়ে ফেল করা পড়ুয়ার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২.৬ লক্ষ। এমনকি ওই ব্যবস্থায় উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের অভিযোগ নথিভুক্ত করার জন্য যে পোর্টালের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সেটিও ফলপ্রকাশের পর থেকে বিকল হয়ে যাওয়ায় ফল বিভ্রাটের আগুনে ঘি পড়ার মতোই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল।
ফলে বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়েছে গোটা দেশ জুড়ে।এই আবহে বেদান্ত শ্রীবাস্তব নামে এক ছাত্র অভিযোগ করেন, তাঁর আবেদনের ভিত্তিতে সিবিএসই যে উত্তরপত্র দিয়েছে, সেই উত্তরপত্র তাঁর নয়। তার পরেই ওই পড়ুয়াকে ‘পাকিস্তানি’ বলে দাগিয়ে দেন বিজেপি-ঘনিষ্ঠরা সহ ডিডি নিউজ চ্যানেলের বরিষ্ট সাংবাদিক। বেদান্ত এবং তাঁদের মতো অভিযোগ তোলা পড়ুয়াদের সঙ্গে আলাপচারিতার একটি ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নেন রাহুল গান্ধী। তিনি বলেন, ‘‘আমার সহকর্মী, দেশবিরোধী সোরোস (আমেরিকান ধনকুবের জর্জ সোরোস, যাঁকে রাহুল-ঘনিষ্ঠ ও দেশবিরোধী, ডিপ স্টেট বলে এক উদ্ভট ইউটোপিয়ার কারিগর বলে অভিযোগ বিজেপির) এজেন্টদের সঙ্গে খুব ভাল আলোচনা হল। বেদান্ত ও তাঁর বন্ধুরা মেধাবী ও সাহসী তরুণ ভারতীয় নাগরিক, যাঁরা সিবিএসই এবং মোদী সরকারের সামনে প্রশ্ন রেখেছিল। কিন্তু উত্তরের পরিবর্তে তাঁরা অপমান ও কটূক্তির শিকার হন।’’ এরই মধ্যে সিবিএসই-র ডিজিটাল মূল্যায়ন পোর্টাল অনায়াসে ‘হ্যাক’ করা সম্ভব বলে দাবি করেছেন ১৯ বছরের ছাত্র নিসর্গ অধিকারী। ওই দাবি ওঠার পরে ব্যবস্থায় যে গলদ রয়েছে, তা স্বীকার করে নিয়েছে সিবিএসই। সংস্থা জানিয়েছে, ওএসএম পোর্টালে যে নিরাপত্তা সংক্রান্ত ত্রুটি রয়েছে, তা চিহ্নিত করা হয়েছে।
তার পর থেকেই ডিজিটাল পরিকাঠামোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হচ্ছে। সিবিএসই জানিয়েছে, আইআইটি-র সাইবার বিশেষজ্ঞ ও সরকারি এজেন্সির সাইবার নিরাপত্তা আধিকারিকেরা ওই কাজ করছেন। সিবিএসই-র দাবি, প্রাথমিক ভাবে যে গলদগুলি চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া আর কোনও গাফিলতি রয়েছে কি না, তা খুঁজে বার করে দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সিবিএসই জানিয়েছে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা থেকে অনলাইনে খাতা দেখার পোর্টালটি এখন নতুন সার্ভারে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। যা অনেক বেশি নিরাপদ ও সুরক্ষিত বলে দাবি সিবিএসই-র। সিবিএসসি ' র দরপত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ছাত্র মহল। তাঁদের পার্লামেন্টারি কমিটির সামনে এসে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে সরকার ক্ষোভের আগুন খানিকটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।এই লেখা যখন লিখছি তখন সংবাদে প্রকাশ যে রি - নিটের প্রশ্নপত্রও আগাম পাওয়া যাচ্ছে টেলিগ্রাম চ্যানেলে।এর পরেও সরকার কি করে শিক্ষা মন্ত্রীকে পদে বসিয়ে রেখেছেন তা এক বিরাট প্রশ্ন।
শোনা যাচ্ছে শিক্ষামন্ত্রী খোদ আরএসএসের লোক, ওনার বাপ ঠাকুরদা ছিলেন হাফ প্যান্ট পরা, লাঠি ঘোরানো আরএসএস। এদিকে সরকার খুব শীঘ্র সারা দেশ জুড়ে আনতে চলেছে সনাতনী জাগরণ ও শিক্ষা ব্যবস্থা। এনসিইআরটি সমস্ত বই নতুন করে লেখা হচ্ছে।সনাতনী ইতিহাস,ভূগোল, অঙ্ক ,বিজ্ঞান সব প্রকাশের পথে। বোঝাই যাচ্ছে সরকার মাদ্রাসার পাল্টা একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে চাইছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই সনাতনী গ্রাজুয়েটদের কে চাকরি দেবে? উত্তর হল কেউ দেবে না, এরা প্রধানমন্ত্রীর পকোড়া ভাজার দল,যারা দলের ঝান্ডা নাড়াবেন। এরই সমান্তরালে চলবে আর একটা শিক্ষা ব্যবস্থা যেটার ভিত্তি পাশ্চাত্য শিক্ষার মান, সেখানে পুরোটাই বেসরকারিকরণ হবে, বিড়লা, খৈতান, লোধা, আম্বানি,আদানীরা সেখানে আরও বেশি করে লগ্নি করবেন, সেই শিক্ষায় মিলবে বিদেশি ডিগ্রি, সবই বিপুল অর্থের বিনিময়ে। সুতরাং সরকারি সনাতনী বনাম বেসরকারি বিদেশি ডিগ্রিধারি। এই পরিবর্তনটির জন্যই শিক্ষা মন্ত্রীর পদে বসা। ফলে নিট, সিবিএসসি তে কি হল তাতে ওনাদের কিছুই আসবে যাবে না।
আরশোলাদের উদযাপন
প্রধান বিচারপতির ওই মন্তব্যের পর গত ১৬ মে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির পথচলা শুরু। ‘অনলাইন স্যাটায়ার মুভমেন্ট’ (ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন) হিসাবে পথ চলা শুরু করার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সমাজমাধ্যমে জনপ্রিয় হয় সিজেপি। নিটের প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদে শামিল হয় যুবসমাজ। সমর্থন জানান প্রবাসী প্রযুক্তিবিদ অভিজিৎ দীপকেও। এ-ও জানান, নিট-আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের পাশে থাকতে দেশে ফিরবেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও জোরালো করে তোলেন। এক্স হ্যান্ডলে এক ভিডিয়োবার্তায় অভিজিৎ বলেন, ‘‘এখন সময় এসেছে আমাদের সকলকে ভারতের সংবিধানের পথ অনুসরণ করে একত্রিত হওয়ার। শান্তিপূর্ণ ভাবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আওয়াজ তুলতে হবে।’’ তিনি নিজের গ্রেফতারির আশঙ্কাও প্রকাশ করেন। তবে এ-ও বলেন, ‘‘আমরা আর কত দিন ভয়ে থাকব? এই দেশ কোনও এক দলের নয়। দেশ আমাদের সকলের।’’ অবশেষে যন্তরমন্তরে ‘ককরোচ’ দলের কর্মসূচি করার অনুমতি দেয় পুলিশ। নিট কেলেঙ্কারিতে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে সেখানে প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন সমর্থকেরা। যদিও সিজেপি জানিয়েছিল যে অনুমতি না মিললেও শান্তিপূর্ণ ভাবে জমায়েত করবেন তাঁরা। সে জন্য সমর্থকদের জাতীয় পতাকা এবং বই হাতে সেখানে পৌঁছোনোর ডাকও দেয় সংগঠন।কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিতে শুক্রবার রাতে দিল্লি বিমানবন্দরে নামেন দীপকে।
সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা করেন দিল্লি পুলিশের আধিকারিকেরা। তাঁকে যন্তরমন্তরে কর্মসূচি করার অনুমতি দেয় দিল্লি পুলিশ। শনিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কর্মসূচি চলে।প্রাথমিক একটা শঙ্কা ছিল, এই সমাবেশ আদৌ করতে দেওয়া হবে কিনা।কারণ এই যন্তর মন্তরে সভা করার অনুমতি পায়নি আন্দোলকারী কৃষকরা বা কুস্তিগিররা। দেখা গেল, দিল্লি বিমানবন্দরে সকালে অভিজিৎ নামতেই পুলিশ তাঁকে জানিয়ে দেয়, যন্তর মন্তরে তাঁরা সভা করতে পারবেন। ছাত্র-যুব সমাজের মধ্যে এক চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ যে বিদ্যমান, তার খোঁজ গোয়েন্দা দফতরের কাছে ছিল; উপরন্তু, এই সমাবেশকে ঘিরে যুব সমাজের অভ্যন্তরে যে তুমুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে, সে খবরও তারা জানত। ফলে, একপ্রকার জনজোয়ারের চাপে সভাটিকে তারা হতে দিল, পাশাপাশি, বাজিয়েও দেখতে চাইল, সোশ্যাল মিডিয়ার কলরব কতটা বাস্তবে আছড়ে পড়ে।সেই ছবি প্রত্যক্ষ করে তাঁদের যে কপালে ভাঁজ পড়বে তাতে সন্দেহ নেই। যন্তর মন্তর শেষ কবে এমন বিপুল জনসমাগম দেখেছে তা বলা মুশকিল। এই জনসমর্থন মঞ্চে দেখা গেছে লাদাখের পরিবেশ কর্মী সোনাম ওয়াংচুককে , দেখা গেছে দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের মত মানুষদের। ককরোচ জনতা পার্টি আগেই জানিয়ে দিয়েছে, এই শাসকের হিন্দু-মুসলমানের দ্বৈরথের গল্প শুনে শুনে তারা ক্লান্ত, দেশের অগ্রগতির গুজবেও তারা পরিশ্রান্ত, নির্বাচন কমিশন সহ সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে কব্জা করে দেশে একনায়কতন্ত্রের আস্ফালনও তারা দেখছে, একের পর এক ক্ষমতার দুর্নীতির চরম ও সর্বগ্রাসী ব্যবস্থাকেও তারা জীবন দিয়ে প্রত্যক্ষ করছে, অতএব, দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে গেছে তখন পথে নামা ছাড়া আর উপায় কী! গত দু-এক বছরে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপালের আন্দোলনের টাটকা স্মৃতিও তো শাসককুলকে তাড়া করছে যাতে এমনতর পুনরাবৃত্তি এখানেও না হয়,সেই ভয়ও আছে।পুলিশ সেই অনুমতি দেওয়ার পরে সমর্থকদের সরাসরি যন্তরমন্তরে হাজির হতে বলেন দীপকে। আগে যদিও অনুমতি আদায়ের জন্য সমর্থকদের পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় জড়ো হতে বলেছিলেন তিনি। বিমানবন্দর থেকে সংবিধান প্রণেতা বিআর অম্বেডকরের আত্মজীবনী হাতে বেরিয়ে আসতে দেখা যায় দীপকেকে।যন্তরমন্তরে ‘ককরোচ' দলের হয়ে প্রচুর সমর্থক নিট কেলেঙ্কারিতে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন। সিজেপি আগেই জানিয়েছিল, অনুমতি না মিললেও শান্তিপূর্ণ ভাবে জমায়েত করবেন তাঁরা। সে জন্য সমর্থকদের জাতীয় পতাকা এবং বই হাতে সেখানে পৌঁছোনোর ডাকও দেয় সংগঠন।‘ককরোচ’ পার্টির কর্মসূচির জন্য যন্তরমন্তরে কড়া নিরাপত্তা মোতায়েন করেছিল পুলিশ। অন্তত দু’হাজার পুলিশকর্মী সেখানে ছিল। সংগঠনের তরফে সমর্থকদের বলা হয়, কর্মসূচিস্থলে সমস্ত পদক্ষেপের ভিডিয়ো করতে হবে। পুলিশের কোনও সন্দেহজনক গতিবিধি দেখলেই ভিডিয়ো করতে হবে। সকলের শিক্ষার দাবিতে সেই বই হাতে রাখতে বলা হয়। সংগঠনের তরফে এ-ও জানানো হয়, কর্মসূচি হবে শান্তিপূর্ণ। একা না এসে বন্ধু, পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে আসতে বলা হয় যন্তরমন্তরে। কোনও ট্রোল বা প্ররোচনায় পা না দিয়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রতিবাদ করতে হবে, এটাই বার্তা ছিল দীপকেদের।কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে পদ ছাড়তেই হবে, দিল্লির যন্তরমন্তরে শনিবার দাঁড়িয়ে এমনই দাবি তুলেছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং তাঁর সহকর্মীরা। তিনি সগর্বে জানিয়েছেন আরশোলারা ভয় পায় না। তারা মরেও না। তাই লড়াই চলবে। তিনি বলেন, ‘‘আমি এখানে এসেছি সেই সব ভাই-বোনদের জন্য, যারা এখনও স্কুলে পড়ে।"
গোদি মিডিয়া আতঙ্কিত
দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির আহ্বানে সুবিপুল জনসমাবেশকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করল আদানি আম্বানি ও অন্যান্য পুঁজিপতিদের মালিকাধীন সংবাদ চ্যানেলগুলো যাদের এক কথায় পরিচয় গোদি মিডিয়া।প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যে, আজ মুঠোফোনের যুগে ছাত্র যুবদের সম্পূর্ণ রকম ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলো কি এইভাবে জনমানস থেকে আড়াল করা যাবে? এত ভয় জেন জেন জেড কে? আজ চ্যানেলগুলোর সরকারভক্তির কারণেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নিরিখে ভারতবর্ষের স্থান ১৮০ টা দেশের মধ্যে ১৫৭ তম। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক অমর্ত্য সেন অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত ভারতীয় মননের বিশ্লেষণ করে ভারতীয় জনসাধারণকে আখ্যায়িত করেছেন তর্কপ্রিয় ভারতীয় বিশেষণে। আজ যখন দেখতে পাই যে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মাপকাঠিতে আমার প্রিয় দেশের স্থান প্রতিবেশী বাংলাদেশ এমনকি পাকিস্তানেরও পরে তখন মাথাটা নিচু হয়ে যায় বৈকি ।
গণতন্ত্রে প্রশ্ন করা বা সরকারের কাছে জবাবদিহি চাওয়া বা তথ্যের অনুসন্ধান করে সত্য মিথ্যা যাচাই করতে চাওয়া কি অপরাধ? যুব জীবন থেকে বেকারত্ব দূর করার দায় কার ? কর্মক্ষম যুবক-যুবতীদের কাছে বেকারত্বই তো সব থেকে বেশি লজ্জাজনক । বেকার যুবক যুবতীদেরকে ক্ষমতাসীন উচ্চ পদাধিকারীদের কি যে যার খুশি মতো বিশেষণে দাগিয়ে দেওয়ার অধিকার আছে ? অথচ প্রাচীন ভারতের লিচ্ছবি সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন প্রজাতন্ত্র, যেখানে জনপ্রতিনিধিরা (যাদের রাজা বলা হত) সকলে মিলিতভাবে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন, যা ছিল জনসাধারণের সভার মাধ্যমে দেশ শাসন; যেখানে কোন নীতি বা সিদ্ধান্তের উপরে আলোচনা, তর্ক ও প্রশ্ন তোলার সকলের সমান অধিকার ছিল। গণতন্ত্র হল ভারতের সুপ্রাচীন উত্তরাধিকার।সরকারের বিরুদ্ধে বা কোন সরকারী নীতির বিরুদ্ধে কোন দেশবাসী কোন প্রশ্ন তুললে তাকে দেশদ্রোহী বা দেশবিরোধী বলে কেন দাগিয়ে দেওয়া হবে এই বা কেমন রীতি। গণতন্ত্রের মূল কথাই হল সরকারের প্রথম ও প্রধান দায়বদ্ধতা জনগণের প্রতি। প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকার হবে আব্রাহাম লিংকন যেমন বলেছিলেন জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য জনগণের সরকার। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার প্রকৃত উৎস হলো দেশের সাধারণ মানুষ। ক্ষমতার দম্ভে সে কথা ভুলে গেলে চলবে কেন? দমন পীড়ন চালিয়ে বা এড়িয়ে গিয়ে জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলিকে ধামাচাপা দেওয়া যাবে না, উল্টে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভবিষ্যতে থিক থিক করবে আরও আরশোলা। পরমাণু বোমা যাদের শেষ করতে পারে না, ডাইনোসরের থেকেও যারা বয়সে বেশি।