পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ফ্যাসিজম বিরোধী - নারীবাদী ‘অ্যান্থেম'

  • 10 January, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 822 view(s)
  • লিখেছেন : ঈপ্সিতা সেনগুপ্ত
প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন নানা বয়সি মহিলা তালে তালে পা মিলিয়ে ভরা মার্কেট চত্বরে উচ্চারণ করলেন সেই অ্যান্থেম যার পরতে পরতে জমা পিতৃতন্ত্রের বিরোধিতা। এই জমায়েতে সারা পৃথিবী জুড়ে বাণিজ্যিক ও নানা স্বার্থে নারীদেহকে ব্যবহারের প্রতিবাদে তারা নিজেদের শরীরকেই স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করে।

সময়টা ঠিক দুপুর আর বিকেলের মাঝামাঝি--- ভরা মার্কেট চত্বরের মাঝে দাঁড়িয়ে এক ৬০ কিম্বা ৬৫ বছরের পক্বকেশ মহিলা পুরুষতন্ত্রের চোখে আঙুল তুলে চিৎকার করে বলে উঠলেন- “তুমিই ধর্ষক”। জনবহুল রাস্তায় পা মেলালেন ১৯-৩০-৪০ এক সাথে এক সারিতে। হ্যাঁ ঠিক এরকমই অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করলো শহর কলকাতা গত ৪ জানুয়ারি নিউ মার্কেট চত্বরে।

'ফ্ল্যাশ মব' এই শব্দটির সঙ্গে খুব সম্প্রতি আমাদের মোলাকাত চিলির হাত ধরে। ছোট্ট দেশ চিলি, ১.৮১ কোটি মাত্র জনসংখ্যার দেশ চিলি ( ২০১৭-র আদমসুমারি অনুযায়ী)। আর সেই চিলিতেই চিলিয়ান নারীবাদী সংগঠন লাস তেসিস এর ডাকে ২০১৯ এর ২০ নভেম্বর শহরের রাস্তায় শোনা গিয়েছিল শত শত নারীকন্ঠের গর্জন- আঙুল তুলে তারা বলেছিল –"এল ভিওলাদর এরেস তু- তুমিই ধর্ষক।" কাঠগড়ায় তুলেছিল এই সমাজকে- তাদের সরকারকে। লাসতেসিসের পক্ষ থেকে সারা পৃথিবীর নারীবাদী কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয় যে তাদের নিজ নিজ শহরে এই ফ্ল্যাশ মব ‘পারফরম্যান্সটি’ সংগঠিত করার। মুহূর্তেই সেই প্রতিবাদের ঢেউ ছড়িয়ে পরেছিল সারা পৃথিবী জুড়ে। সান্তিয়াগো- মেক্সিকো পার হয়ে ভারতে ঢুকে পড়েছিল চেন্নাই আর দিল্লি শহরের হাত ধরে। আর সেদিন ফ্যাসিজম বিরোধী এই নারীবাদী ‘অ্যান্থেম’ অবশেষে ধ্বনিত হল কলকাতার রাজপথে বাংলা ভাষায়।

প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন নানা বয়সী মহিলা তালে তালে পা মিলিয়ে ভরা মার্কেট চত্বরে উচ্চারণ করলেন সেই অ্যান্থেম যার পরতে পরতে জমা পিতৃতন্ত্রের বিরোধিতা। এই জমায়েতে সারা পৃথিবী জুড়ে বাণিজ্যিক ও নানা স্বার্থে নারীদেহকে ব্যবহারের প্রতিবাদে মহিলারা নিজেদের শরীরকেই স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করে। মূলত চিলিতে উচ্চারিত স্প্যানিশ কবিতাটির বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে “ আমি জন্মেছি সেটাই আমার দোষ, সে দোষের সাজা হল হিংসা , যা তোমরা দেখেও দেখোনা”- বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এর থেকে ক্রূর বাস্তব বোধহয় আর কিছুই নেই। এ প্রতিবাদ মহিলাদের- নারী ও নারীদেহধারী মানুষের ,যেকোনো হিংসাত্বক ঘটনায় যাদের প্রধানত ‘ সফট টার্গেট’ হিসেবে ভাবা হয়- নারী ও নারীদেহধারী মানুষের; সঙ্গে হয়ে চলা হিংসার রাজনীতি সামাজিক ও রাজনৈতিক ভগ্নদশার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। বলা হয়েছে, ‘লিঙ্গ –জাতি- ধর্ম আর সম্মানের’ যূপকাষ্ঠে মহিলাদের হারিয়ে যাওয়ার কথা , যুদ্ধ আর রাজনীতিতে ধর্ষণের প্রয়োগের কথা। নস্যাৎ করা হয়েছে ভিক্টিম ব্লেমিং কেও- “ আমি কী পরেছি কোথায় গিয়েছি দোষটা আমার নয়।”। ধর্ষক হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করান হয়েছে – হোমোফোবিক- ট্রান্সফোবিক- ব্রাহ্মন্যবাদ, ধর্মান্ধ ও মৌলবাদকে, কোণঠাসা করা হয়েছে ফ্যাসিবাদকে- হ্যাঁ এবং সোচ্চারে ধর্ষক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মোদী সরকারকেও। ফ্যাসিজমের আঁতুড়ঘরে যা লালন পালন করা হয়- মহিলারা সেগুলিকে চিহ্নিত করতে আজ সমর্থ।


ফ্লাশ মব

না কোন সংগঠনের ডাকে নয়- স্রেফ হিউম্যান নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আয়োজিত এই আন্দোলন। আর হ্যাঁ এটা কোনো “পারফরম্যান্স” নয়- উদ্যোক্তরা একে চিলির ধাঁচে পারফরমেন্স বলতে একেবারেই রাজী নয়। আর তা হবেই বা কেন? “পারফরম্যান্স” শব্দটি অনেককেই ত্রস্ত করে তোলে , কারণ পারফরমেন্সের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দক্ষতা শব্দটিও- যা এখানে নিষ্প্রয়োজন। এ তো সম্মিলিত রাগের সমাহার-উদযাপনও বটে। তাই এই আন্দোলনে সহজেই সামিল হতে পারে এমন  অনেকেই, যারা একদিনের জন্যেও রিহার্সালে যেতে পারেনি। যারা বাংলা ভাষাটা পড়তেও পারেনা। এ আন্দোলনে মেয়ের হাত ধরে রাস্তায় এসে দাঁড়ায় মা। উচ্চারণ করেন বহুদিনের না বলতে পা্রা সেই কথা । ভীড়ের মধ্যে নিজের ধর্ষককে দেখতে পেয়ে আঙুল তুলে চিহ্নিত করতে পারে মেয়েটি। বহুদিনের সংযোগহীন মানুষ পরস্পরকে খুঁজে নেয় মিছিলে- কাঁধ ছুঁয়ে বলে- “জানতাম তোকে এখানে পাবো”। বাকিদের সঙ্গে পায়ে পা মেলান সেই মহিলাও যিনি কয়েকদিন আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় মেয়েদের ছোট জামা কাপড় পরা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তার মুখ থেকেও উচ্চারিত হয় সেই অমোঘ সত্যি - " আমি কী পরেছি - কোথায় গিয়েছি - দোষটা আমার নয়।" এইটাই এই আন্দোলনের চাবিকাঠি – সতস্ফূর্ততায় যার ব্যপ্তি ছড়িয়ে পড়ে আরও অন্য এক দিকে সেই সামনে ঝোলানো প্ল্যাকার্ডে- যাতে লেখা- “শাড়ি কাপড় খুলবোনা- ডকুমেন্টস দেবোনা’। আন্দোলনের শেষে তাই ওড়ে বর্ণময় রামধনু পতাকা- ধ্বনিত হয় আজাদি স্লোগান- জনতার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে “ ও ম্যাহেকি ম্যাহেকি আজাদি” র খুশবু। পিতৃতন্ত্রের বিরোধিতা করা মুখগুলি যে আসলে আদতেই প্রতিবাদের – নয়া নাগরিকত্ব বিরোধী আইন- নতুন ট্রান্সজেন্ডার বিল এই সমস্তর বিরোধিতা করতে গিয়েই সে মুখগুলো একসঙ্গে বলে ওঠে “Women will Destroy Hindu Rashtra”। এই ডাক ভারতের জনতার- এই ডাক দায়বদ্ধতার। - পুঞ্জিভুত বারুদের সমাহার এই ডাক- আর তাতে সাড়া না দিলে সারা দেশ জুড়ে বেড়ে ওঠা এই ফ্যাসিজমের অবসান সম্ভব নয়, সম্ভব না, সেই ফ্যাসিজমে পুষ্ট হওয়া এই ধর্ষণ সংস্কৃতির কবর খোঁড়া । আমরা জানি গল্পের শেষে ফ্যাসিজমের হার হয়- নইলে যে গল্পটাই শেষ হয়না। এদেশের গল্পটা খানিক শেষের দিকেই। এটাই এই সময়ের রাজনীতি- আসুন রাস্তায় নামি- আর রাস্তায় এসে না দাঁড়ালে এই সাড়া শহর উথাল পাথাল করা রাগের যুদ্ধটা থেকে আপনিই বঞ্চিতই থেকে যাবেন।

0 Comments

Post Comment