পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

নতুন নাগরিক আইন হিন্দুবিরোধী, নরেন্দ্র মোদি হিন্দুবিরোধী এবং বেলুড় মঠের ঘরের ছেলে

  • 14 January, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 37 view(s)
  • লিখেছেন : সৌরাংশু চট্টোপাধ্যায়
নাগরিক আইন শুধু মুসলমান বিরোধী নয়, তা হিন্দু বিরোধীও। তার প্রচার কেন্দ্র হল বেলুড় মঠ। করলেন ঘরের ছেলে নরেন্দ্র।.....লিখছেন সৌরাংশু চট্টোপাধ্যায়।

নাগরিক আইন সংশোধন হয় সাধারণত উদ্বাস্তুদের কথা মাথায় রেখে। শ্রীলঙ্কা থেকে আসা তামিল শরণার্থীদের নাগরিকত্বের সমস্যা ভয়াবহ। তাঁরা মূলত হিন্দু।

২০১৯-এর নাগরিক আইনে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, জরাথ্রুস্টবাদী ও খ্রিস্টানদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ওই তিনটি দেশের ছয় ধর্মের মানুষ। খেয়াল করে দেখুন, মোদি দেখাতে চাইছেন যে তিনি মুসলমানদের বাদ দিয়েছেন। হ্যাঁ, দিয়েছেন তো বটেই; মুসলমানদের শত্রু প্রতিপন্ন করা বিজেপির রাজনীতির চিরাচরিত অঙ্গ।

এখন অন্য কথা ভাবুন। ওই তিনটি দেশ থেকে ধর্মীয় নির্যাতনের জন্য মুসলমানরা কেন ভারতে আসবেন? ভারত মোটেও সংখ্যালঘুদের জন্য নিরাপদ নয়। এমনকি খ্রিস্টানরাও আসবেন না কারণ খ্রিস্টান নির্যাতনের দেশ হিসাবে ভারত তালিকার উপরের দিকে জ্বলজ্বল করছে-- সেই প্রমাণ গুগল করলেই পাওয়া যায়। ওই তিনটি দেশ থেকে আসা উল্লিখিত ছয় ধর্মের যে সব মানুষ নাগরিকত্ব এখনও পাননি তাঁদের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা ২৫, ৪৪৪ জন মাত্র।

তার চেয়ে ঢের বেশি হিন্দু শরণার্থী নাগরিকত্ব পাবেন না।

কেন?

শ্রীলঙ্কা তালিকাভুক্ত নয়। সেখান থেকে আসা তামিল হিন্দু শরণার্থীদের সংখ্যা কত জানেন? নতুন নাগরিক আইনে তাঁদের বঞ্চিত করা হয়েছে। ১৯৪৮ সালে শ্রীলঙ্কা স্বাধীন হলে সেই দেশ ৭ লক্ষ তামিলদের রাষ্ট্রহীন করে দেয়। তার পর ১৯৬৪ সালে বন্দরনায়েকের সঙ্গে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর চুক্তিতেও সমস্যা মেটে না। ১৯৮০ সালে আবার জটিলতা বাড়ে। এই মুহূর্তে ৫৯ হাজার তামিল শরণার্থী ১০০-র বেশি ক্যাম্পে অমানুষিক কষ্টে থাকেন, ক্যাম্পের বাইরে আছেন ৩০ হাজার মানুষ।

মোদিজি কি জানেন সেই সব শরণার্থীদের ধর্ম কী? তাঁরা হিন্দু।

রামকৃষ্ণ মিশনের ঘরের ছেলে নরেন্দ্র মোদি। খুব ভাল। তামিল হিন্দুরা কি ঘরের ছেলে নয়? তিব্বতি বৌদ্ধরা কি পরের ছেলে? বর্মার রোহিঙ্গারা তো শত্রুর ছেলে, জানি। বিবেকানন্দ যতই অরণ্যে রোদন করে থাকুন না যে ইসলামি দেহ ও বৈদান্তিক মস্তিষ্ক, এখনকার রামকৃষ্ণ মিশন জাগতিক বিষয় নিয়ে কথা বলেন না, ফলে সে এখন রাহু। দেহহীন মস্তিষ্ক তাঁর। মঠ কিন্তু বোঝে কে ঘরের ছেলে, কে সেরা প্রধানমন্ত্রী। রামকৃষ্ণ মিশনের সাধুদের দুটি লবি আছে—একটি বেঙ্গল লবি ও অন্যটি সাউথ লবি। তামিল হিন্দুদের বঞ্চিত করার জন্য সাউথ লবি কেন প্রতিবাদ করছে না? তিব্বতি বৌদ্ধ জাগতিক হতে পারে কিন্তু তামিল হিন্দু কী করে মিথ্যে হয়? এই প্রশ্নের জবাব মঠকে দিতে হবে। আপনারা ইসলামবিরোধী, ফলে মুসলমানদের কেন বাদ দেওয়া হল সেই জবাব চাওয়ার মতো মুর্খ আমরা নই।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে (মিশনের সন্ন্যাসের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর কিন্তু বাধ্য হয়ে ১৬ বছর বলা হয়েছে কারণ ১৮ বছরে মোদি বিবাহ করেন এবং মঠের নিয়মানুযায়ী বিবাহিত সন্ন্যাসের অনুপযুক্ত) নাকি মোদি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পঞ্চদশ অধ্যক্ষ স্বামী আত্মস্থানন্দের কাছে সন্ন্যাস নিতে যান। স্বামী আত্মস্থানন্দ তাঁকে সংঘের সন্ন্যাসী হিসাবে উপযুক্ত মনে করেননি, তাই ‘দেশসেবা’-র কাজে ব্রতী হতে বলেন। রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী হলে কি দেশসেবা করা যেত না নাকি মিশনের সন্ন্যাসীরা দেশসেবা করেন না! যাই হোক, স্বামী আত্মস্থানন্দের সেই অনুপযুক্ত ছেলে দেশের কর্তা হয়ে সুবীরানন্দের ‘ঘরের ছেলে’ হয়ে গেলেন।

এই যে অনুপযুক্ত থেকে ঘরের ছেলেতে বিবর্তন, ভবিষ্যতে নিশ্চয় এ নিয়ে সন্দর্ভ লেখা হবে। মোদিকে নিয়ে মঠের কর্তার কতটা গর্বিত সে নিয়ে মিশনের বিশ্ববিদ্যালয়ে নন্দনতত্ত্বের পিএইচডি হবে। মঠের রাজনীতিবিদ্যায় গবেষণা হবে মোদি কেন দেশের অন্যতম সেরা প্রধানমন্ত্রী। স্বামীজি তাঁর ভবিষ্যতবাণীতে যে প্রজন্মের সন্ন্যাসীদের সবচেয়ে অধঃপতনের কথা বলেছিলেন, সেই প্রজন্ম এখন চলছে তাও আমরা জানি। সে নিয়ে আমরা অচিরেই সন্দর্ভ লিখব।

প্রশ্ন তুলব, নরেন্দ্র মোদি অসাংবিধানিক ও হিন্দুবিরোধী নাগরিক আইন-প্রচারের প্ল্যাটফর্ম হিসাবে কেন ব্যবহার করলেন বেলুড় মঠকে। কেন তাঁকে তা করতে দেওয়া হল, তা জানতে গেলে রকেট সায়েন্স বোঝার প্রয়োজন নেই।

অর্থ।

বেলুড় মঠের ওই সন্ন্যাসীরা ধর্ম ও মোক্ষ বাদ দিয়ে অর্থকে এখন পরম পুরুষার্থ মনে করেন। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনকে অনৈতিক ও হিন্দুবিরোধী রাজনীতির আখড়া করে দিলেন নরেন্দ্র মোদি। অর্থ দিয়ে কেড়ে নিলেন সন্ন্যাসীদের ধর্ম-নৈতিকতা। মঠের কর্মাধ্যক্ষকে এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, তিনি জানান যে এই সব জাগতিক বিষয়ে তাঁরা থাকেন না। বিবেকানন্দ কিন্তু থাকতেন। নইলে প্র্যাকটিক্যাল বেদান্তের জন্ম দিতেন না। এই জগত সত্য, নীতিশাস্ত্রও সত্য। সিএএ অনৈতিক, তাই ঘরের ছেলে মোদি অনৈতিক এবং তাঁর মঞ্চ বেলুড় মঠ অপবিত্র। ওই সাধুরা ভণ্ড এবং ইতিহাস তাঁদের ক্ষমা করবে না।

মঠের কর্মাধ্যক্ষ কাষ্ঠ মুখে যতই সমন্বয়ের কথা বলুন, বেলুড় মঠ মোটেও সমন্বয়ের জায়গা নয়। মঠে বুদ্ধ পূর্ণিমা ও বড়দিন পালিত হলেও নবি দিবস পালিত হয় না। সে না হয় মানা গেল যে আপনারা আপনাদের ঘরের মতো (ঘরের ছেলের মতো) মুসলমানবিদ্বেষী কিন্তু নাগরিক আইন যে তিব্বতি বৌদ্ধবিরোধী এবং তামিল হিন্দুবিরোধীও। সেই নাগরিক আইনের প্রচার মঠকে মঞ্চ করে ছড়িয়ে দিলেন মোদি আর গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীরা গদগদ ভক্তিতে হাততালি দিয়ে গেলেন! সেলফি তুললেন পরমব্রহ্মের সঙ্গে!

ছি!

একদা আপনারাই না আদালতে হলফনামা দিয়েছিলেন, আপনারা হিন্দু নন! আজ তার শোধ তুললেন? নাকি প্রায়শ্চিত্ত করলেন??

0 Comments

Post Comment