পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মিথ্যা অনুপ্রেরণা এবং চাষীর ঋণের বোঝা

  • 18 May, 2019
  • 0 Comment(s)
  • 127 view(s)
  • লিখেছেন : অমিত দাশগুপ্ত
হোর্ডিংয়ে টিভিটে সংবাদপত্রে চাষীর আয় তিন গুণ করে দেওয়ার ঝলমলে রঙিন বিজ্ঞাপনেও ঢাকা পড়েনি ধান ও আলুর দাম না পাওয়া চাষীর আর্তনাদ। তিন পর্বের এই নিবন্ধে রাজ্য সরকারের এই দাবির যাথার্থ্য খুঁজেছেন অমিত দাশগুপ্ত।

এধরনের আলোচনার ক্ষেত্রে সরকারের বিবিধ বিভাগ প্রদত্ত পরিসংখ্যানকেই সূচনা বিন্দু হিসেবে গণ্য করেই আলোচনা শুরু করা হয়ে থাকে। গত কয়েক বছরে সেই পরিসংখ্যান প্রকাশ বা তা জনসাধারণের কাছে উপস্থাপিত করার ক্ষেত্রে অনীহা এধরণের আলোচনার ক্ষেত্রে তীব্র জটিলতা সৃষ্টি করেছে। তাছাড়া সরকারি পরিসংখ্যানগুলিই প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। তা নিয়ে ১০৮ জন প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতিবিদ শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। ফলে অর্থনীতি সংক্রান্ত আলোচনা বস্তুনিষ্ঠ হতে পারছে না।

বর্তমান মাপকাঠিতে মোট আভ্যন্তরীণ উৎপন্নের (জিএসডিপি) পরিমাপ শুরু হয়েছে ২০১১-১২ সাল থেকে। কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থা (সিএসও) পশ্চিমবঙ্গের পরিসংখ্যানকে ঘসে মেজে নিয়েছে। ফলে রাজ্য সরকারের প্রদত্ত জিএসডিপি তথা জিএসডিপি বৃদ্ধির হার সিএসও দ্বারা ঘোষিত হারের সাথে মেলে নি। একটি ছাড়া প্রতি বছরেই রাজ্য সরকারের প্রদত্ত হার সিএসওর হারের থেকে কম হয়েছে।  ২০১১-১২ সাল থেকে ২০১৭১-১৮ সাল পর্যন্ত মোট আভ্যন্তরীণ উৎপন্নের হিসেবে দেখা যাচ্ছে যে,  ওই ৬ বছরের রাজ্যের সামগ্রিক বৃদ্ধির হার সিএসও হিসেবে বার্ষিক ৫.৫%, যেখানে সারা ভারতে তা ৬.৯%। এ রাজ্য সরকারের দেওয়া তথ্য অনুসারেও ওই বার্ষিক বৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৫.৯%। যেহেতু দেশের সামগ্রিক বৃদ্ধির হারের তুলনায় রাজ্যের বৃদ্ধির হার অনেকটাই কম তাই ২০১১-১২ সালে দেশের আভ্যন্তরীণ উৎপাদনে রাজ্যের যে অংশ ছিল, ৬% তা ২০১৭-১৮ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৫.৫%।

রাজ্য সরকারের দাবি, এরাজ্যের জিএসডিপি দেশের মধ্যে সব থেকে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু ২০১৭-১৮ সালের বৃদ্ধির হারকে বিবেচনা করলে দেখা যাচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গ ৯ টি রাজ্যের পিছনে রয়েছে— দশম স্থানে। ২০১৮-১৯ সালের বাজেট বক্তৃতায় দাবি করা হযেছে যে, পশ্চিমবঙ্গ সামগ্রিক আভ্যন্তরীণ উৎপন্নের নিরিখে ভারতে চতুর্থ। কিন্তু ২০১৭-১৮ সালের হিসেব অনুযায়ী এ রাজ্যের স্থান ষষ্ঠ। তাছাড়া, পশ্চিমবঙ্গ মাথাপিছু জিএসডিপি-র নিরিখেও ১৯তম স্থানে রয়েছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির অতি দ্রুত হারে বৃদ্ধি একটি কল্পকথা।

অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন যে, এরাজ্যের কৃষকের আয় ২০১০-১১ সালে ছিল ৯১০০০ টাকা ২০১৭-১৮ সালে তা ৩ গুণের বেশী বেড়ে হয়েছে ২৯১০০০ টাকা। এই হিসেবের ভিত্তি বোঝাও যাচ্ছে না, জানাও যায় নি। সিএসওর তথ্য অনুসারে ২০১৭-১৮ সালে এরাজ্যের জনসাধারণের মাথাপিছু আয় (এনএসডিপি)  ছিল  চলতি মূল্যে ৯৫৫৬২ টাকা, ২০১১-১২ সালে তা ছিল ৫১৫৪৩ টাকা। ফলে চলতি মূল্যে রাজ্যবাসীর মাথা পিছু আয় বেড়েছে সাকুল্যে ৮৫%, যা আদতে স্থির মূল্যে ৫১৫৪৩ থেকে ৬৫৯৭৮ টাকা হয়েছে; অর্থাৎ সাকুল্যে ২৮% বেড়েছে। যেহেতু কৃষি ক্ষেত্রে মাথা পিছু আয় অন্য ক্ষেত্র গুলি থেকে কম, তাই ধরাই যায়, কৃষকের আয় গত ৭ বছরে ২৮%র থেকে কম বেড়েছে।

আরেক দিক দিয়ে হিসেব করা যাক। ২০১১-১২ সালে এবং ২০১৬-১৭ সালের পশ্চিমবঙ্গের চলতি মূল্যে নীট আভ্যন্তরীণ উৎপন্ন ও মাথা পিছু আভ্যন্তরীণ উৎপন্ন থেকে আমরা অনুমিত জন সংখ্যার পরিমাপ পেতে পারি। নাবার্ডের ২০১৬-১৭ সালের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সমীক্ষা থেকে অনুমান করা যেতে পারে রাজ্যের ২৭ শতাংশ মানুষ মূলত কৃষক থেকে আয় করে। ফলে ওই অনুমিত জনসংখ্যার ২৭% কে কৃষি নির্ভর হিসেবে গণ্য করে কৃষিতে মোট আভ্যন্তরীণ উৎপন্নের মূল্য থেকে মাথা পিছু মোট আভ্যন্তরীণ কৃষি উৎপন্ন নির্ধারণ করা যায়। স্থির মূল্যের ওই আয়কে চলতি মূল্যের আয়ে রূপান্তরিত করলে তা আনুমানিক ৪৬,০৮০ টাকাতে পরিণত হয়।

জাতীয় নমুনা সমীক্ষা দফতর (এনএসএসও)র ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে (৭০ তম দফা)  প্রকাশিত  গ্রামীণ পরিবার সমূহের পরিস্থিতি মূল্যায়ন সমীক্ষা অনুসারে জুলাই, ২০১২-জুন, ২০১৩ কৃষি বৎসরে পশ্চিমবঙ্গে কৃষক পরিবারের গড় বার্ষিক আয় ছিল ৪৭,৭৬০ টাকা, অর্থাৎ পরিবার পিছু সদস্য সংখ্যার গড় নাবার্ডএর পূর্বে উল্লেখিত সমীক্ষা অনুযায়ী ৪.২ ধরলে, মাথা পিছু বার্ষিক আয় ১১৩৭১ টাকা। এনএসএসও-র উপরোক্ত সমীক্ষা অনুযায়ী, কৃষি থেকে পরিবার পিছু মাসিক নীট আয় ৯৭৯ টাকা, অর্থাৎ বার্ষিক ১১৭৪৮ টাকা বা মাথা পিছু বার্ষিক ২৭৯৭ টাকা। পরবর্তীতে নাবার্ডের ২০১৬-১৭ সালের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সমীক্ষা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের কৃষক পরিবারের মাসিক সামগ্রিক গড় আয় দাঁড়িয়েছে ৭৭৫৬ টাকা বা বার্ষিক ৯৩,০৭২ টাকা। মাথাপিছু হিসেবে বার্ষিক ২২১৬০ টাকা।

কোন হিসেবই ২০১৬-১৭ সালের ২ লক্ষ ৩৯ হাজার টাকা বার্ষিক বা ২০১৭-১৮ সালের ২ লক্ষ ৯১ হাজার টাকার ধারে কাছে পৌছচ্ছে না। আয়ের ক্ষেত্রে যখন রাজ্য সরকারের তরফ থেকে ধারাবাহিক অনৃত ভাষণ চলছে, ঠিক তখনই রাজ্যের কৃষক পরিবারগুলি ঋণ ভারে ন্যুব্জ হচ্ছে। নাবার্ডের পূর্বোক্ত সমীক্ষা অনুসারে ২০১৬-১৭ কৃষি বৎসরে ৩২% পরিবার ঋন নিয়েছে নুতন করে। অপরদিকে সামগ্রিকে ৩৭% পরিবার ঋণগ্রস্ত রয়েছে। এরাজ্যের প্রায় ৯০% র বেশি কৃষক ছোট ও প্রান্তিক চাষী, ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না,  ঘাড়ে ঋণের বোঝার জন্য কমবেশি ২০০ কৃষক ইতিমধ্যেই আত্মহত্যা করেছে (যা রাজ্য সরকার স্বীকার করতেও নারাজ) তখন সেই সমস্যাগুলিকে এড়িয়ে গিয়ে কৃষকদের আয় ৩ গুণ করার অনুপ্রেরণা যোগান দেওযা হচ্ছে।

  সুতরাং ২০১৬-১৭ সালে কৃষকদের বার্ষিক মাথা পিছু আয় ২ লক্ষ ৩৯ হাজার টাকা হওয়ার যে ঘোষণা অর্থমন্ত্রী গত বছরে বাজেট বক্তৃতায় করেছিলেন বা এ বছর কৃষকদের মাথা পিছু বার্ষিক ২ লক্ষ ৯১ হাজার টাকার যে উল্লেখ তিনি গত ৪ ফেব্রুয়ারির বাজেট বক্তৃতায় করেছেন তার কোন ভিত্তি তো নেইই, উপরন্তু তিনি তাদের আয় নিয়ে নির্মম রসিকতা করছেন। 

তথ্যসূত্র:

১. পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ইকনমিক রিভিউ, ২০১৬-১৭

২. ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল ব্যাঙ্ক ফর রুরাল ডেভেলপমেন্টএর ২০১৬-১৭ সালের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সমীক্ষা 

৩.জাতীয় নমুনা সমীক্ষা দফতর (এনএসএসও) কর্তৃক ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে (৭০ তম দফা)  প্রকাশিত  গ্রামীণ পরিবার সমূহের পরিস্থিতি মূল্যায়ন সমীক্ষা

৪. সিএসও-র রাজ্যভিত্তিক আভ্যন্তরীণ উৎপাদন প্রতিবেদন, আগস্ট ২০১৮

ঋণ স্বীকার: প্রসেনজিৎ বসু, স্টেট অফ দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইকনমি, ইপিডব্লু, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৯

0 Comments

Post Comment