পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কাশ্মীরের ঘোর কলি

  • 09 August, 2019
  • 0 Comment(s)
  • 1602 view(s)
  • লিখেছেন : হুতোম প্যাঁচা

কতায় বলে ভাদ্রের কুকুর। কিন্তুক শ্রাবণ মাসেও বিষ্টি না হলে যেমনধারা কুকুর দেকা যায় তাদের কতা বলে না। বাস্তবিক শ্রাবণ মাসে এমনি খটখটে শুকনো মাটি হবে কে বা ভাবতে পেরেচিল? তাই কতাটি তয়ের হয়নি। 


তা শ্রাবণ মাসের কুকুর যেমন জল হচ্চে না বলে গরমে জেরবার হয়ে জিহ্বা একহাত বের করে ঘুরে বেড়ায়, কলকেতার বাবুদেরও সেই হাল হয়েচিল। কাজে গরজ নেই, কোতাও যাবার ইচ্ছে নেই, খাবার ইচ্ছে নেই, শোবারও ইচ্ছে নেই। সে যতই আপিসে ঝিমুনো হোক আর আড় চোকে আধুনিকা দেখে জিব দিয়ে ঠোঁট চাটা হোক। 


তা বাদে জীবনে আমোদ কম পড়ে গিয়েচিল। ভাটপাড়ায় বোমা পড়ার খবরটি একঘেয়ে হয়ে গেচে। টিভির বাবুরা তাই নিয়ে চেল্লাতে আর তেমন তাগদ পাচ্চেন না। সঞ্চালক ইস্টুডিওয় ঠান্ডা, গরম দুরকম বন্দোবস্ত কল্লেন। তবু বাবুদের গলার জোর বাড়ল না। গোদের উপর বিষফোড়া দেখা দিলেন। আজ সাঁঝের বেলা যে বাবু দিদির হয়ে গলা ফাটিয়ে গেলেন, কাল সূয্যি উঠতেই তিনি দেশপ্রেমে চান করে শুদ্ধ হয়ে পাড়াসুদ্ধ লোককে কার কাচে কত কাটমানি আচে সে হিসাব বলে দিচ্চেন। সঞ্চালকের মাতায় হাত। দর্শককে ধুন্ধুমার লড়াইটি বিশ্বাস করাবেন কি উপায়?


আমাদের সম্পাদকও কদিন মিইয়ে ছিল। হটাৎ সেদিন শুনি গুনগুন কচ্ছে। “দিওয়ানা হুয়া বাদল” ইত্যাদি। এদিকে সেদিন সকাল থেকে মোটেও বিষ্টি হয়নি, মেঘের ম নেই আকাশে। শুধোলেম ভায়া, বাদল পেলে কোতায়? 
রহস্য করে বল্লে, আসচে, কিচু একটা নিশ্চয় আসচে। আমার কাগচ ভরানোর আর চিন্তা থাকবে না কদিন। 
তা কিসে বুজলে?
সম্পাদক ভারী ফিচেল হেসে বল্লে, শোনো কতা! পরম হিঁদু সরকার অমরনাথে তীত্থ কত্তে যাওয়া বন্ধ করে দিলে, এ কি বড় কিচু না হয়ে যায়?
আমি বল্লেম গবর্নমেন্টের আবার হিঁদু আর ম্লেচ্ছ। দিল্লীশ্বরের গবর্নমেন্টের কতা বয়োজ্যেষ্ঠদের কাচে শুনেচি, আর ইংলন্ডেশ্বরীর গবর্নমেন্ট স্বচক্ষে দেকেচি। ট্যাকসো নেয়া আর সেপাইদের মাইনে দেয়া ভিন্ন কি বা কাজ আচে? সরকার বাহাদুর কি পুজো করেন, না পাঁচো ওয়াক্ত নমাজ পড়েন যে তিনি হিঁদু না মোছলমান বোজা যাবে?
সম্পাদক বল্লে এ সরকার সেসব পোকায় কাটা সরকারের মতন নয়। এ হচ্চে নতুন দেশের নতুন সরকার। দারুণ নিয়ম মেনে চলেন। এনাদের আমলে বাহ্যে যাওয়া হতে চাঁদে যাওয়া অবধি পাঁজি না দেকে হবার জো নেই। সকলে বলচে কখন কুলগ্ন পড়ে গিয়ে কাজে ব্যাঘাত ঘটে, সেই কারণে নাকি সরকার বাহাদুর দৈনিক চাট্টি ঘন্টার বেশি ঘুমোন না।


বলতে কি, গবর্নমেন্ট এত কাজ করেন শুনে বেজায় রাগ হল। আমাদের সময় তো এমনি ছিল না! শুধোলেম তীত্থ বন্ধ করে কী এমন রাজকায্যি হচ্চে? সম্পাদক তো রেগে কাঁই। বলে কি আস্পদ্দা! গবর্নমেন্টকে প্রশ্ন কচ্ছেন? আপনি তো মহা অ্যান্টিনেশনাল! দেব পাকিস্তানে পাঠিয়ে…
ব্যাটা গায়ের গরমে ভুলে গিয়েচিল কার সাথে কতা বলচে। আমি যেমনি চোক পাকিয়ে বলেচি, তবে রে আঁটকুড়ির ব্যাটা? আমায় পাকিস্তানে পাটাবি? আয় তোকে আগে গোরস্তানটা দেকিয়ে দি। অমনই তার মুকটি শুকিয়ে আমসত্ত্ব হয়ে গেচে। মিনমিন করে বল্লে, আহা রেগে যাচ্চেন কেন? আমি কি মোছলমান না কেরেস্তান যে গোরস্তানে পাঠাবেন? বলেই কাজের দোহাই দিয়ে দে চম্পট। তবে পরদিন দেকলুম ছোকরা ঠিক কতাই বলেচিল।


সকাল থেকে ট্রেনে বাসে আপিস কাছারিতে যে আড্ডাতেই আড়ি পাতচি, সকলেই বলচে কিচু একটা হবে, কিচু একটা হবে। শেষ মেশ শুনতে পেলেম হয়েচে। কী হয়েচে? না কাশ্মীরকে তিন টুকরো করে দিয়েচেন গবর্নমেন্ট।


টিভিতে দেকলেম দেশসুদ্ধ লোকের ভারী উল্লাস হয়েচে, কলকেতার বাবু বিবিরাও বাদ নেই। কোতাও শুনচি নাকে চশমা আঁটা হাতে মোবাইল হালফেসানের কালেজের বাবু বান্ধবীকে বলচেন ঠিক হয়েচে। কাশ্মীরিগুলোর কিঞ্চিৎ শিক্ষে হওয়া আবশ্যক। কোতাও আবার রাশভারী বাবু বলচেন অ্যাদ্দিন কাশ্মীরে চাকুরির বড্ড অভাব ছিল, একন দুবেলা চাকুরি হবে। মানষের তো হবেই, নাকি গেরস্তের পোষ্য কুকুর বিড়ালেরও হবে। পোষ্যটি গোরু হলে নাকি সরকার পেনসানও দেবেন।


তবে বাবুর জাত চেনা যায় তেনার শখে। এ লগ্নেও খানদানি বাবুরা সবচে খুশি হলেন ভূস্বর্গে জমিন খরিদ কত্তে পারবেন বলে। দু কামরার গবর্নমেন্ট ফ্ল্যাটে এ যুগেও একশত ষাট টাকা মাহিনায় থাকা যে বাবু ইতোমধ্যে উপরির কল্যাণে কলকেতায় তিনটি বাড়ি হাঁকিয়েচেন, কেবল তিনি নয়। যে বাবুর সাধের থ্রি বি এইচ কে বানাবার হৌস বিল্ডিং লোন একনো শোধ হয়নি, তিনিও শ্রীনগরে বাংলো তয়ের করবেন বলে সঙ্কল্প কচ্ছেন। গিন্নী আপিস ফেরতা ওয়েলিংটন স্কোয়্যারে শোবার ঘরের ওয়ালপেপার পচন্দ করে এসেচেন, আসচে রোববার কত্তা গিন্নী যুগলে যাবেন চানঘরের টাইলস পচন্দ কত্তে।


অবিশ্যি গিন্নী চাকুরি আর সংসার সামলে ফেসবুক খোলার ফুরসত পান না বলে তেনার কাচে খবর নেই যে সোয়ামীর ভেতরটা কত কাঁদচে। আইবুড়ো তুতো ভায়ের পোস্টে কমেন্ট করেচেন, তোর কপালের জোর আচে রে, কাশ্মীরি কনে পাবি। আমাদের তো জীবন দীর্ঘশ্বাস ফেলেই কাটবে।
তুতোভাই বাবুটি সমন্ধে কিচু বলা আবশ্যক। তিনি সাড়ে তিন বচ্ছরে সাড়ে তিন হাজার টাকার পপকর্ন ও সাড়ে সতেরো হাজারের উপঢৌকন বিলিয়েও একটি গালফ্রেন্ড যোগাড় কত্তে পারেননি। তাই তেনার ধারণা হয়েচিল তিনি শাহরুখ খান। তুমি হ্যাঁ বলো আর না-ই বলো, তুমি আমারই। এমনধারা সঙ্কল্প নিয়ে কিরণ নামের কোন একটি ভদ্রলোকের মেয়ের পেচনে এঁটুলির মতন লেগে থাকলেই কন্যাটি বিগলিত হয়ে বাবুর গলায় মালা দেবেন বলে পেত্যয় ছিল। কিন্তুক কার্যক্ষেত্রে দেকলেন কলকেতার রমণীরা আর সীতা সাবিত্রীর মতন নেই। গাঁয়ে মানে না আপনি রোমিওদের মোটে আমল দিচ্চেন না। এই সঙ্কটে আমাদের বাবুটিকে উদ্ধার কল্লেন ভারত সরকার। কাশ্মীরের হুরীদের পেলে কলকেতার দজ্জাল ছুঁড়িদের দিকে ফিরে তাকাবেন কোন বাবু? সে তিনি নিজে যতই হাবশি ক্রীতদাসের মতন ভীষণদর্শন হোন না কেন। মেয়েছেলের লাগে রূপ আর ব্যাটাছেলের লাগে পুরুষকার (যেটির সুইচ বাপ মায়ের হাতে থাকে, পুত্রের পচন্দের পাত্রী তেনাদের পচন্দ না হলেই সুইচটি অফ করে দেন)।


বাবু বিবিদের এমনি হাবভাব দেকে সম্পাদককে বল্লেম কাশ্মীরটা তবে তোমাদের জমি কিনতে আর বে কত্তে লাগবে বলো? কাগচে তবে উন্নয়ন, গণতন্ত্র --- এসব কপচাচ্ছ কোন লজ্জায়? সত্য কতাটা লিকলেই তো পারো। ছোঃ!
ব্যাটা বলে কি, আহা গণতন্ত্র তো সকলেরই চাই। চাই না?


তোমাদের তো চাই বুজলেম। কাশ্মীরিদের চাই কিনা জানব কেমনে? তাদের কেউ শুধিয়েচে?
বেহায়া সিগ্রেটের ধুয়ো উড়িয়ে বিজ্ঞের মত জবাব দিলে, আরে শালওয়ালার জাত গণতন্ত্র কোত্থেকে বুজবে? বুজতে গেলে পড়াশুনো কত্তে লাগে। আমাদেরই তো দায়িত্ব… আর মেয়েগুলো এদিকে বে হলে তো ভালই। ডবকা হবার আগেই তো ছিবড়ে করে ফ্যালে সব, বুজলেন কিনা? শান্তি ফিরলে তবু ভদ্দরলোকেদের সাথে বিয়ে হবে।
সম্পাদকের ভাবনা শুনে আমার পেটের ভেতর কেমন ঘুলিয়ে উটল। হাসি বেরুবে কি বমি বেরুবে ঠিক ঠাহর কত্তে পাল্লেম না। খোলা হাওয়ায় বসতে পাল্লে এট্টু সুস্থ লাগবে বোধ হওয়ায় ফট্টি টুর ছাদে গিয়ে বসলেম। সম্পাদক পই পই করে বলে দিলে এই জায়গাটিতে বসলেই সবচে মিষ্টি বাতাস পাওয়া যায়।


পা দোলাতে দোলাতে আপন মনে বাবুদের বাপ বাপান্ত কচ্ছি, দেকি দূরে ধর্মতলার দিকে লাল পিপড়ার লাইনের মতন কী যেন চলেচে, আবার কি একটা আওয়াজও আসচে ওকান থেকে। ভাবলেম ঘোর কলি। বাবু বিবিদের মলের ম্যানিকুইনের মতন লাল পিপড়াও মানষের আকারের হচ্চে নাকি রে বাপ! ভাল করে ঠাহর করব বলে জলদি উড়ে গিয়ে বসলেম এল আই সি বিল্ডিংয়ের ছাতে।
বাপ! এ তো লাল পিপড়া নয়! এ যে দেকি লাল ঝান্ডা হাতে মানুষ! সবাই যেদিক পানে চলেচে, এরা চলেচে তার উলটোমুখো। বাবু, বিবিরো ফুটপাতে দাঁড়িয়ে গাল দিচ্চেন বা ঠাট্টা কচ্ছেন। লোকগুলোর ভ্রূক্ষেপ নেই গা! কেবল ক্ষ্যাপার মতন কাশ্মীরের লোকের পক্ষ নিয়ে স্লোগান দিচ্চে! এই হাভাতে আইবুড়ো, আধবুড়ো জমিন মাফিয়ার দেশে এ কারা রে বাপু! ঘোর কলি গো, ঘোর কলি।
0 Comments

Post Comment