পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

দন কিহোতের আশ্চর্য জগৎ

  • 07 July, 2019
  • 0 Comment(s)
  • 380 view(s)
  • লিখেছেন : সৌভিক ঘোষাল
দন কিহোতের কাহিনীর সংক্ষিপ্ত কিশোর পাঠ্য সংস্করণগুলি দেশ ভাষা নিরপেক্ষভাবে গত চারশো বছর ধরে কোটি কোটি শিশু কিশোরের মনোরঞ্জন করে আসছে। আমরাও খোঁজার চেষ্টা করবো সেই কাহিনী
সঠিক স্পেনীয় (হিস্পানিক) উচ্চারণটি জানার আগে ইংরাজীর দৌলতে ডন কুইক্সোট বলেই বাল্যকাল থেকে শিশুপাঠ্য গল্পের ভেতর দিয়ে যাকে চিনতাম, সেই দন কিহোতে যখন লিখছেন সার্ভেন্তেস, তখনও উপন্যাস নামের সাহিত্য প্রকরণটি বিশ্বসাহিত্যে জন্ম নেয় নি। কিন্তু বিশ্বের প্রথম উপন্যাস, শুধু এরকম কোনও ঐতিহাসিক কারণই দন কিহোতের খ্যাতির মুখ্য ব্যাপার নয়। বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক হয়ে ওঠা এই বইটির জনপ্রিয়তার নানা কারণ আছে। সে সব কথায় আসার আগে এই উপন্যাস লেখার সময়ে স্পেনের অবস্থাটা কেমন ছিল সে কথা একটু সেরে নেওয়া যাক।
১৪৯২ খ্রীষ্টাব্দে ভারতে আসতে গিয়ে পথ ভুল করে কলম্বাস পৌঁছে গেলেন আমেরিকায়। তারপর থেকেই স্পেনের উপনিবেশ হয়ে দাঁড়াল এই অঞ্চল। সেখান থেকে মানুষজন আর ক্রীতদাস আসতে শুরু করল স্পেনে। শোষণের মধ্যে দিয়ে দ্রুত ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকল স্পেন। এরই উল্টোদিকে তুর্কী মুসলিমদের সাথে তখন স্পেন নিয়মিত যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত। এই দুই বিপরীত পরিস্থিতির টানাপোড়েন চলেছে গোটা ষোড়শ শতক জুড়ে। আর এই শতকের দ্বিতীয় অর্ধে তাকে ঘনিষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন সার্ভেন্তেস। স্পেনের ঔপনিবেশিক লুন্ঠনের প্রসাদ তিনি অবশ্য পান নি, জীবিকার জন্য তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে সব সময়েই। কিন্তু তুর্কীদের সাথে যুদ্ধের বিষময় অভিজ্ঞতা তাঁকে পেতে হয়েছিল যুদ্ধবন্দী হিসেবে। বিদেশে কারাগারে অশেষ কষ্ট ভোগ করেছেন বছরের পর বছর। অর্থের বিনিময়ে সেই বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে ট্যাক্স কালেক্টর হিসেবে বাঁচতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেখানেও আসে ভাগ্য বিড়ম্বনা। আবার তাকে জেলে যেতে হয়। এই দ্বিতীয় কারাবাস পর্বেই তাঁর দন কিহোতে লেখার সূত্রপাত।
সার্ভেন্তেস অল্প বয়স থেকেই খ্যাতিমান লেখক হতে চেয়েছিলেন। একসময় নাটক লিখে জনপ্রিয়তাও পেয়েছিলেন। কিন্তু তারপর প্রতিদ্বন্দ্বী নাট্যকারদের ছায়ায় হারিয়ে যান কিছুটা। বেশ কিছু কবিতাও লিখেছিলেন। কিন্তু শিল্পীর অমরত্ব তিনি পেয়েছেন শেষজীবনে লেখা দন কিহোতের মধ্যে দিয়েই। ১৬০৫ এ এই বইয়ের প্রথম খণ্ড বেরিয়েছিল। আর ১৬১৫ তে বেরোয় এই বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ড। তাঁর মৃত্যুর ঠিক একবছর আগে। মনে করা হয় ১৬১৬ সালে একই দিনে চলে গিয়েছিলেন বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুই নক্ষত্র – শেক্সপীয়র ও সার্ভেন্তেস।
দন কিহোতে কেন অনন্য নানাজনে নানাভাবে তাঁর উত্তর দিয়েছেন। সমালোচক বা সাহিত্যের অধ্যাপকরা এই বই নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করে গেছেন স্বাভাবিকভাবেই, কিন্তু তাঁর এই লেখা সৃজন জগতের মানুষজনকেও বারবার কলম ধরতে বাধ্য করেছে। বিশিষ্ট ঔপন্যাসিকদের অনেকেই দন কিহোতেকে আধুনিক আখ্যানের জনক বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন, সার্ভেন্তেসকে লেখকদের লেখক বলে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
সার্ভেন্তেস বিদগ্ধ পাঠক মহলে যেমন জনপ্রিয়, তেমনি আম জনতারও প্রিয় লেখক। দন কিহোতের কাহিনীর সংক্ষিপ্ত কিশোর পাঠ্য সংস্করণগুলি দেশ ভাষা নিরপেক্ষভাবে গত চারশো বছর ধরে কোটি কোটি শিশু কিশোরের মনোরঞ্জন করে আসছে। তারা সেখানে গল্পের আশ্চর্য জগৎকে খুঁজে পেয়ে আকৃষ্ট হয়েছে। আবার সেই কিশোর পাঠকই পরবর্তীকালে মূল উপন্যাসের মধ্যে জগৎ ও জীবনের কিছু মৌলিক দিককে আবিস্কার করেছে পরম মুগ্ধতায়।
দন কিহোতে উপন্যাসের পাঠকেরা জানেন এই উপন্যাসের টেক্সট এর মধ্যে আরো নানা টেক্সট প্রায়শই ঢুকে পড়ে। দন কিহোতে চরিত্রটিই তো নাইটদের বীরত্বপূর্ণ নানা কল্প কাহিনীর এক নতুন জীবন্ত সংস্করণ হয়ে উঠতে চায়। অজস্র শিভালরিক রোমান্স দন কিহোতে পড়েছেন। কিন্তু অন্য সকলে সেই কাহিনীর জগৎ থেকে যখন শুধু গল্পরসটুকু খুঁজে নেন, দন কিহোতে হয়ে ওঠেন সেই টেক্সটগুলির নায়কদের অদ্ভুত প্রতিরূপ। কল্পনার আশ্চর্য রঙ মিশিয়ে এই হয়ে ওঠা নাইটটি চারপাশের বাস্তব জগতের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বারবার উপহাস্যস্পদ, বিড়ম্বিত, লাঞ্ছিত হতে থাকেন, তবু দ্বিতীয় খণ্ডের অন্তিম অধ্যায়ে পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত নিজের বানিয়ে তোলা জগৎ থেকে একবিন্দু সরতে রাজী হন না। উইন্ড মিলকে দৈত্যভেবে এগিয়ে গিয়ে নাস্তানাবুদ হওয়া থেকে শুরু করে সরাইখানাকে দুর্গ ভাবা বা একপাল মেষশাবককে শত্রুসৈন্য ভেবে ফেলা – দন কিহোতের নিজস্ব কল্পনার জগৎ বাস্তব দুনিয়ার সঙ্গে বারবার সংঘাতে আসে। তার বিশ্বস্ত অনুচর সাঙ্কো পাঞ্জা বারবার তাকে বোঝাতে যায় ভুলের কথা, তিনি নিজে বারবার মারাত্মকভাবে প্রহৃত ও আহত হন – তবু কল্পভুবনকে কিছুতেই কল্পজগৎ বলে বিশ্বাস করেন না।
এই চরিত্র সৃজনের আশ্চর্য রসায়ন এখানেই যে এতকিছুর পরেও দন কিহোতে আমাদের চোখে ক্লাউন হয়ে ওঠেন না, ভিলেন তো নয় ই, খুব আশ্চর্য ধরনের এক নায়কই থেকে যান। তাঁর আশ্চর্য কাণ্ডকারখানা দেখে পাঠক মজা পান আবার তাঁকে নিয়ে কৌতূহলীও হয়ে ওঠেন। কৌতূহলের চেয়েও বড় কথা দন কিহোতের জন্য আমাদের এক ধরনের বেদনাবোধ ও ভালোবাসা মিশে থাকে। এই ভালোবাসা কি এই কারণে, যে দন কিহোতে এক উচ্চ আদর্শ তৈরি করে নিয়েছিলেন তার ভ্রাম্যমাণ নাইট জীবনে, যেখানে তিনি সব অন্যায় অবিচারের প্রতিরোধে ছুটে যান ? নাকি আমরা যে কল্পজগতে কখনো বেশিক্ষণ বিচরণের সাহসই দেখাতে পারি না, এক আশ্চর্য জগতের বাসিন্দা হয়ে সেখানেই তাঁর থেকে যাবার অবিশ্বাস্য এক কাহিনীর জন্য ?
0 Comments

Post Comment